লেখক লাল মিয়ার পেছনের গল্প

=পলক রায়=

শহর থেকে অনেক দূরে সবুজে ঢাকা একটি ছোট্ট নদীর পাশে অচিনপুর একটি ছোট্ট গ্রাম। বেশ মনোরম পরিবেশ গ্রামের। বিভিন্ন ধরনের গাছাপালা আর গ্রামের মাঝখান দিয়ে আঁকা বাকা একটি সরু রাস্তা। রাস্তার দুপাশে তাল সুপারির গাছ। যা দেখলে মন ভরে যায়। এই সুন্দর গ্রামে বেড়ে ওঠেন অপরিচিত এক দারিদ্র্য লেখক লাল মিয়া। সাদা মনের মানুষ তিনি। অল্পতেই মানুষকে ভালবেসে ফেলেন। অর্ধপাকা লম্বাগোফ ওয়ালা এক ভদ্র মানুষ তিনি। দেখতে কবি কবি লাগে। ঈদের ছুটি শেষে ট্রেন এ করে ইউনিভার্সিটি যাচ্ছিলাম। আমার পাশে বসা এই ভদ্র লোকটিই হলো লেখক লাল মিয়া। তখন থেকেই তিনি আমার ভালোবন্ধু। এখন রোজ সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফোনে কথা বলি। কারণ আমিও একটু সাহিত্য প্রেমিক। এরপর তাঁর গ্রাম ঘুরে আসা হয়। আমি ট্রেনে বসে ট্রেন নিয়ে একটি ছড়া লেখার চিন্তা করছি ঠিক তখনই লম্বা গোফওয়ালা লোকটি বলল বাবু তুমি কি কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করছো? হুম আংকেন। বিনয়ে উত্তর দিলাম। কি? বলবে আমাকে। ছড়া আংকেল। উত্তর দিলাম। সাহিত্যিক মানুষ নাকি? তিনি আমাকে বললেন। না আংকেল। তবে একটু একটু লেখি। এরপর তিনি ব্যাগ থেকে তাঁর লেখা একটি বই আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি অবাক চোখে এক পলক তাকিয়ে থাকলাম। আমি যেন অনেক নার্ভাস হয়ে গেলাম। এমন গুণী ব্যক্তি আমার পাশে প্রায় দশ থেকে পনেরোটি বই প্রকাশ হয়েছে তার। একেবারে সাধারণ একজন মানুষ। তিনি আমার পরিচয় নিলেন। আমি বিনয়সহিত পরিচয় দিলাম। তিনি আমাকে তখন বন্ধুর মতো কথা বলতে বললেন। শুরু হলো আমাদের দুজনের সাহিত্য আড্ডা। তিনি বললেন শুনো পলক বর্তমানে ফেবুতে অনেকে লেখালেখি করেন। কেউ বুঝে লেখেন আর কেউ যা খুশি তাই লেখেন। শিরোনাম দেন ছড়া, কবিতা, গল্প কিংবা উপন্যাস। কেউ ছন্দ জানেন কেউ অন্ত্যমিলকে ছন্দ বলে বড়াই করেন। কেই তাল লয় ঠিক রাখেন কেউ আবার গাছের তাল ভেবে তালপিঠা বানিয়ে মজা করে খান। এই হলো ফেসবুকের যুগ। আমি মনোযোগ দিয়ে লেখক লাল মিয়ার কথাগুলো শুনতে লাগলাম। খোলা জানালার মৃদু বাতাসে আমাদের সাহিত্য আড্ডা বেশ জমে ওঠল। প্রথম বই প্রকাশ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি লেখক হওয়ার পেছনের গল্প খুলে বললেন। তিনি বললেন পলক আমিও ফেবুতে দুই একটা দৈনিক বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা পোস্ট করতাম। লাইক কমেন্ট অনেক ভালো পেতাম। আমার খুব ভালো লাগতো ফেবু বন্ধুদের ভালো সাড়া পেয়ে। এরই মাঝে কয়েকজন ম্যাগাজিন, যৌথগ্রন্থের সম্পাদকের সাথে পরিচয় হলো। তাঁদের টাইমলাইন গুলোতে দেখতে পেলাম বিভিন্ন ধরনের লেখা আহবান করেছেন। কেই ছড়া, কেই কবিতা, কেউ গল্প আবার কেউ পান্ডুলিপি। খুব কষ্ট করে লেখা জমা দেওয়ার পর ফিরতি মেসেজ আসে টাকা দেওয়া মাত্রই আপনার লেখা প্রকাশ করা হবে। তখন একটু ঘামে গিয়ে সম্পাদক সাহেবকে ফোন করি। ফোনে তিনি রবী ঠাকুর ও নজরুল এর সাথে তুলনা করে গালি দেন। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। তিনি আরো বললেন জানো পলক এই মার্ক জুকারবার্গ এর ফেবুতে অনেক প্রকাশের সাথে যোগাযোগ হলেও বই প্রকাশের জন্য অঢেল অর্থের দাবিদাওয়ার জন্য বই প্রকাশের আগেই বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। এখন সবকিছুই যেন ব্যবসা পলক। তবে হাই নামে এক প্রকাশনীর সাথে আবার পরিচয় হয়। তিনি ফেবুর মেসেজের মাধ্যমে তাঁর প্রকাশনীতে চায়ের দাওয়াত দিলেন। আমিও বুক ভরা আশা নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাই প্রকাশনীতে গেলাম । দেখা হলো প্রকাশক মুকুল মিয়ার। তিনি তাঁর প্রকাশনীতে বসতে দিলেন আর দোকানের ছেলেটাকে দুটো গরম চা আনতে বললেন। চা’য়ে ফু দিতে দিতে শুরু হলো দামদর। তিনি বিভিন্ন মডেল এর বই বের করে বলেতেছেন দাদা এই ধরনের নিলে ৬০ হাজার লাগবে আর এটা ওটা। নরমাল দামেও করা যাবে তবে মান খারাপ হবে। সর্বনিম্ন কত লাগবে দাদা? তিনি বললেন দাদা আমরা ৪০ হাজারের নিচে করি না। চা টা পুরো শেষ না করেই হাই প্রকাশনী থেকে বাই বলে বিদায় নিতে হলো। মনে ভীষণ কষ্ট নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলাম। এরপর লেখক আংকেল? আমি তবুও থেমে যাইনি পলক। তবুও লেখা চালিয়ে গেছি। আজ ভালো মানুষের অনেক অভাব। আমি গরিব বলে কোন যৌথগ্রন্থের সম্পাদক ও প্রকাশনীর প্রকাশক লেখা প্রকাশ করেনি। টাকা ছাড়া তারা যেন কিছুই বুঝেন না। অনেক প্রকাশক বই প্রকাশের কথা দিলেও কেউ প্রকাশ করেনি। এভাবে ফেবু চালাতে চালাতে একদিন নাহিদ প্রকাশনি এর পেইজ এ এক গল্পে তারকা নামক পোস্ট লক্ষ্য করলাম। এরপর যথাসময়ে পাঠিয়ে দিলাম আমার লেখা একটি সেরা গল্প। গল্পটি পাঠক মহলে ব্যাপক সারা পাওয়ায় আমি হয়ে গেলাম এ গল্পে স্টার। তখন থেকে নাহিদ প্রকাশনী থেকে প্রতি বছর ২ টি করে ফ্রি বই প্রকাশ করা হয় পলক। আর উপযুক্ত সম্মানিও দেয় নাহিদ প্রকাশনীর নাহিদ ভাই। ট্রেনটি স্টেশন এ পৌছে গেল। লেখক আংকেল নামতে হবে। তিনি ২ টি বই উপহার দিয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকলেন আর বললেন ফোন দিও পলক । ভালো থেকো।

 

SHARE