মুমিনের মুনাজাত

68

মুমিন নানাবিধ দুঃখ-কষ্ট, বিপদাপদ, রোগ-শোকে কেবল তার প্রভুর কাছেই ধরণা দেয়। কিন্তু ল করে যে, দুঃখ-কষ্ট তার বাড়ে বৈ কমে না; তাই অনেক সময় সে হতাশ হয়ে পড়ে। আসলে ব্যাপারটা কী? আল্লাহ কি তাঁর বান্দার সাথে দেয়া প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করতে পারেন। মুমিন বলবে, কখনোই নয়। তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে ভাবতে হবে। দোয়া ও প্রার্থনা সম্পর্কে আল্লাহ পাকের বাণী- ‘হে নবী, আমার কোনো বান্দাহ যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের অতি নিকটে। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং আমার প্রতি ঈমান আনা তাদের একান্ত কর্তব্য, এ কথা তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দাও, হয়তো তারা সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে’Ñ বাকারা ১৮৬। এতে স্পষ্ট যে, ডাকতে হবে কেবল আল্লাহকে এবং এ জন্য কোনো মাধ্যম তালাশ করা বা কোনো পথ অতিক্রম করার প্রয়োজন নেই। তিনি আরো বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের দ্বারা সাহায্য গ্রহণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন’Ñ বাকারা-১৫৩।
উপরি-ওই আয়াতগুলোতে স্পষ্ট হয়েছে যে, আল্লাহপাক তাঁর বান্দাহদেরকে তাঁর কাছে চাওয়ার জন্য যেমন বলেছেন, সাথে সাথে প্রার্থনা মঞ্জুর করার প্রতিশ্রতিও প্রদান করেছেন। এর সাথে এটাও বলা হয়েছে যে, বিপদাপদ তাদের জন্য একটি পরীা। আল্লাহ পাক এই দুনিয়াকে একটি পরীাগার হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তার জ্ঞানের ভিত্তিতে কাউকে যেমন শাস্তি দেবেন না, আবার কাউকে পুরস্কৃতও করবেন না। বরং প্রত্যেককে তার আমলের ভিত্তিতে বদলা দেবেন।
এ প্রসঙ্গে কিছু হাদিস উল্লেখ করব। রাসূল সা: আল্লাহর কাছে বেশি বেশি বিশেষ করে নামাজের মধ্যে চাওয়ার জন্য বলেছেন। নামাজ নিজেই একটি প্রার্থনা। তারপর বান্দাহ যখন সেজদায় যায় রাসূল সা:-এর বর্ণনা মতে, সে তখন আল্লাহর খুব নিকটবর্তী হয়ে যায়। সেজদায় এবং শেষ বৈঠকে তাশাহুদ ও দরুদ পড়ার পর বেশি বেশি করে আল্লাহ পাকের নিকট চাইতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে শেষ রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে আল্লাহ পাকের নিকট চাওয়ার উপযুক্ত সময়। মজলুমরা বারবার আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করছেন এবং তাঁর সাহায্য কামনা করছেন। আমাদেরকে বুঝতে হবে মজলুমের দোয়া কখনো বৃথা যেতে পারে না। কারণ রাসূল সা: বলেন, মজলুম ও আল্লাহর মাঝে কোনো আড়াল নেই। তিনি আরো বলেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া তাৎণিক কবুল হয়Ñ সন্তানের জন্য পিতামাতার, মুসাফির ও মজলুমের।’
আল্লাহ পাকের প্রতিনিধি হিসেবে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা মূলত আল্লাহরই কাজ এবং এ কাজে বান্দাহর সাথে শত্র“তা আল্লাহর সাথে শত্র“তা হিসেবেই তিনি গ্রহণ করেন। ফলে বান্দাহর আল্লাহর ওপর ভরসা করে নির্ভীকভাবে দায়িত্ব পালন করা এবং শত্র“দের মোকাবেলার দায়িত্ব সম্পর্ণভাবে আল্লাহর ওপরই ন্যস্ত করা দরকার। আমরা দুনিয়ার জীবনেও ল্য করি, কোনো চাকর তার মনিবের বাগান পাহারা দিতে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হলে সে এসে তার মনিবের কাছে নালিশ করেই নিজেকে খালাশ মনে করে। তখন মনিব চাকরের আঘাতকে নিজের ওপর আঘাত মনে করে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আল্লাহ পাকের বিষয়টিও এমনি। আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে কোনো বান্দাহ নির্যাতিত হলে বিষয়টি তিনি নিজের ওপরই গ্রহণ করেন এবং প্রতিশোধ গ্রহণ তাঁর দায়িত্ব হয়ে পড়ে। আল্লাহ পাকের বাণী, ‘যারা ঈমানদার নর ও নারীর ওপর অত্যাচার করেছে অতঃপর তওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের কঠোর আজাব এবং তাদের জন্য রয়েছে আগুনে জ্বলেপুড়ে যাওয়ার শাস্তি’Ñআল বুরুজ ১০। তিনি আরো বলেন, ‘নিঃসন্দেহে তোমার রবের পাকড়াও ভীষণ শক্ত’Ñ আল বুরুজ ১২। আল্লাহ পাকের প থেকে প্রতিশোধ দুনিয়ায়ও হতে পারে আবার আখেরাতে তো রয়েছেই। কারণ জালেম যখন সীমা লঙ্ঘন করে, তখন আর সময় না দেয়া তাঁর নীতি। আল্লাহ পাক উভয়কেই পরীা করেন। জালেম কতখানি অগ্রসর হয় এবং তার জুলুমের মাত্রার ওপর শাস্তির ভয়াবহতা নির্ভর করে। পান্তরে মজলুম কতখানি ধৈর্যধারণ করতে পারে এবং তার ধৈর্যের মাত্রার ওপর পুরস্কার নির্ভর করে। অনেক ত্যাগ-তিতিার পরই হজরত ইব্রাহিম আঃ-কে আল্লাহ দুনিয়ার ইমাম নিয়োগ করেন। রাসূল সা: এবং তাঁর অনুসারীদেরেে ত্রও একই অবস্থার সৃষ্টি হযেেড়ছল। সমসাময়িক দুনিয়াতেও তাই ঘটছে। কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রমের মাধ্যমেই তারা তাদের কা´িখত ফল লাভ করেছেন। বাতিলের পওে দুনিয়ার নেতৃত্ব লাভের জন্য ত্যাগ-তিতিার বিকল্প নেই। মুমিনদের সুবিধা হলো, দুনিয়াতে ফল লাভ না করতে পারলেও এই প্রচেস্টার মাধ্যমে আল্লাহ পাক তার সব দোষত্র“টি মা করে দিয়ে নিশ্চিত জান্নাতে দাখিল করবেন। আল্লাহ পাকের ভাষায় এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। অবশ্য আমরা যা কামনা করি, আল্লাহর সাহায্য ও দুনিয়ার বিজয়Ñ তারও প্রতিশ্র“তি দান করা হয়েছে। এজন্য আমাদেরকে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। ঈমানদারদের সাথে আল্লাহ পাকের ওয়াদা নানাভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সে অনুযায়ী নেক কাজ করে, তাদের সাথে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, তিনি জমিনে তাদের অবশ্যই খেলাফত দান করবেন, যেমনিভাবে তিনি তাদের আগের লোকদের খেলাফত দান করেছিলেন; সর্বোপরি যে জীবনবিধান তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন তাও তাদের জন্য (সমাজ ও রাষ্ট্রে) সুদৃঢ? করে দেবেন, তাদের ভীতিজনক অবস্থার পর তিনি তাদের অবস্থাকে নিরাপত্তা ও শান্তিতে বদলে দেবেন, তবে এ জন্য শর্ত হচ্ছে তারা শুধু আমারই গোলামি করবে, আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না; এরপরও যারা তাঁর নেয়ামতের নাফরমানি করবে তারাই গুনাহগার হবে’-আন নূর ৫৫। আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা স্পষ্ট কিন্তু শর্ত যে আমাদেরকে নেক কাজ করতে হবে এবং এ নেক কাজের কোনো সুনির্দ্দিষ্ট তালিকা নেই। আমাদের সব কাজকর্ম-লেনদেন, কেনাবেচা, মানুষের সাথে আচরণ, বিরোধীদের সাথে আচরণ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, চাকরি সবেে ত্র একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ পাকের আনুগত্য করতে হবে এবং সততা ও ন্যায়পরণতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে। আমরা এটা পারলে অবশ্যম্ভাবী আল্লাহ পাকও তাঁর ওয়াদা পূরণ করবেন। আমাদেরকে এটাও অনুভব করতে হবে যে, আমরা আল্লাহ পাকের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি অর্থাৎ আমরা তাঁর সাহায্যকারী এবং আমরা তাঁর বাছাইকৃত বান্দাহ। আমাদের মর্যাদা সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে এবং বুঝতে হবে ঈমানদারদেরকে আঘাত করা মানে আল্লাহ পাককেই আঘাত করা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তিনিই যথেষ্ট। রাসূল সা: মক্কী যুগে নীরবে আঘাত সহ্য করেছেন। তিনি মদিনায় আল্লাহ পাকের নির্দেশক্রমেই পাল্টা আঘাতও হেনেছেন এবং যুদ্েেধত্রও তিনি একটি নিয়ম-নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। আÍরার অধিকার সবার রয়েছে; কিন্তু আগবাড়িয়ে আঘাত করা আল্লাহপাকের পছন্দনীয় নয়। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের আশায় একজন মুমিন তার সব দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারে। কারণ তার কোনো কষ্টই আল্লাহর অগোচরে নয়। কিন্তু প্রতিপরে কোনোই প্রাপ্তি নেই। বরং সে যত হিংস্রতা নিয়ে আঘাত করবে এবং আঘাত করে সে যত তৃপ্তি পাবে তার শাস্তি তত বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ পাক তাঁর রশি একটু ঢিল দিয়েছেন এবং সময়মতো ঠিকই টান দেবেন। আল্লাহই মুমিনদের একমাত্র অভিভাবক এবং অবিশ্বাসীদের কোনো অভিভাবক নেই। আল্লাহকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে অন্তরে অনুভব করতে হবে যে, শক্তি-সামর্থ্য বলতে যা বোঝায় তা সবই আল্লাহর এবং তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। নামাজে কাতরভাবে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে এবং দৃঢ়বিশ্বাস রাখতে হবে যে, তিনি আমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করবেনই। কখন, কিভাবে সেটা তাঁর ইচ্ছা।