একাগ্রতা আর দৃঢ় মনোবলের কারণে সাবলম্বী দিপ্তী হালদার

75

–নমিতা চৌধুরী–

আমাদের সমাজের আনাচে-কানাচে এমন অনেক নারী আছেন, যারা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে অর্থনৈতিকভাবে সফল, এসব নারী কিন্তু পারিবারিকভাবে উত্তরাধিকারী সুত্রে প্রাপ্ত স¤পদ কিংবা উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে সফল হন নি। তাদের সফলতার পেছনে যেটি থাকে তা হলো কঠোর পরিশ্রম আর দীর্ঘ ধৈর্যের একাগ্রতা। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করে নিজের দক্ষতা ও মেধা দিয়ে বিউটিফিকেশনের কাজে সফলতা পেয়েছেন এক নারী। এ কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি ১২ জন নারীকে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। এই নারী হলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের শিবতলার দিপ্তী হালদার। প্রতিদিন তার কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসছে বিভিন্ন এলাকা থেকে দরিদ্র নারীরা। কিন্তু আজ তিনি যে জায়গায় এসেছেন তাতে তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তার জানতে চাইলে তিনি তার সংগ্রমের কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন, “মা বাবা ও পাঁচ ভাই বোনকে নিয়ে আমার পরিবার। আমার বাবা স্বর্ণকারের কাজ করতেন। আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করি তখন আমার বাবা হঠাৎ-ই রোগে আক্রান্ত হয়ে তার কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এতে পরিবারে সাত সদস্যেদের মাঝে দূরাবস্থা নেমে আসে, যার ফলে থেমে যায় আমার লেখাপড়া। আমার মা কারখানায় কাজ করলেও তার সামান্য উপার্জনে আমাদের তিনবেলা ঠিকমতো খাবারও জুটত না। অন্যদিকে বাবার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ হতো। পরিবারের এই দুরাবস্থা দেখে আমি বাড়িতে বেকার বসে থাকতে পারলাম না। কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পরলাম। তখন শহরের ভেলুর মোড়ে একটি পার্লার থেকে বিউটিফিকেশনের প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করি এবং কিছু বচ্চাকে প্রাইভেটও পড়াতে থাকলাম।

এক বছর সেখানে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর আমি নিজেই বাড়িতে একটি ছোট করে পার্লার প্রতিষ্ঠা করলাম। প্রথম প্রথম সেই পর্লারে অর্থের অভাবে আমি ভালো অসবাবপত্র কিনতে পারি নি। ঘরের ছোট একটি জায়গায় সেই পার্লারটি ছিলো। কিন্তু এক সংস্থা থেকে আমি ঋণ নিই। সেই টাকা দিয়ে আমি পার্লারের জন্য কিছু আসবাবপত্র কিনি এবং পর্লারটাকে একটু বড় করি। তারপর ধীরে ধীরে আমার আয় বাড়তে থাকে। এখন সেই পার্লারের কাজ করে আমাদের দু:খ অনেকটাই দূর হয়েছে। আমি আমার পরিরবারের চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছি, সেই সাথে আমি আমার ভাইবোনদের পড়ালেখা করাতে পারছি এবং আমি আমার থেমে যাওয়া পড়ালেখা আবার শুরু করেছি।” তিনি আরও বললেন, “আমার এখন স্বপ্ন যে, আমি এই পার্লারটাকে আরও বড় করবো। ভাই বোনদের ভালোভাবে পড়ালেখা শিখিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবো।”
একসময় তিনি নিজেই প্রশিক্ষণার্থী থাকলেও এখন তিনি তার মতো দরিদ্র নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলছেন। এ বিষয়ে তিন বললেন, “আমার কাছে ১২ জন নারী প্রশিক্ষণ নেয়। তারা আমার মতোই দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তারা যেনো আমার কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। নিজের পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে পারে সেটায় তাদের লক্ষ্য। তারা যেনো দারিদ্রতার জন্য পিছিয়ে না পড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তাই আমি তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।”  দিপ্তী হালদারের মা শেফালী রানী তাকে নিয়ে আনেক গর্ববোধ করেন। তিনি বললেন, “আমার স্বামীর অসুখ হওয়ার পর আমাদের সংসারে যে অভাব নেমে এসছিল এখন তার অনেকটাই কমে গেছে। এখন এই পুরো সংসারটাকে দিপ্তী একাই চালাচ্ছে। আমি চাই আমার মেয়ে আরও বড় হোক।” দিপ্তী হালদারের কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী ১২ নারীর মধ্যে শারমিন খাতুন তাদের একজন। তিনি বললেন, মা বাবাসহ ৩ ভাই বোনকে নিয়ে আমার পরিবার। আমার বাবা রিকশা চালায়। বাবা রিকশা চালিয়ে যে টাকা পায় তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। আমার পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে গেছে। সেজন্যই আমি প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। আমি যেন নিজেই একটা কিছু করতে পারি আমার পরিবারকে দেখতে পারি। আমার স্বপ্ন আছে একটি পার্লার স্থাপন করার। দিপ্তী হালদারের মতো অনেক নারী বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যেমন এগিয়ে যাচ্ছেন নানারকম কর্মক্ষেত্রে তেমনই তারা সাবলম্বীও হচ্ছেন। নারীদের এই অগ্রগতি নিয়ে জাতীয় মহিলা সংস্থা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চেয়ারম্যান এ্যাড. ইয়াসমিন সুলতানা রুমা বলেন, বর্তমান সমাজে মেয়েরা এগিয়ে আসছে, সফলকামও হচ্ছে। নারীরাও যে সমাজে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করতে পারবে, দেশটাকে গড়তে পারে শুধু এই বিশ্বাসটুকুও যদি তারা রাখে তাহলেই তারা এগিয়ে যাবে। বর্তমরি সরকার দিপ্তী হালদারের মতো আত্মবিশ্বাসী নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। এর ফলে তারা যেমন সাবলম্বী হবে তেমনই তাদের মাধ্যমে দেশও অর্থনৈতিক উন্নতি করবে।
মানুষের জীবনে নানা রকম ঘাত প্রতিঘাত আসতে পারে। কিন্তু এই ঘাত প্রতিঘাতের সাথে সংগ্রাম করতে সহায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার ইচ্ছাশক্তি। তেমনই দিপ্তী হালদার, তার ইচ্ছাশক্তির দ্বারা তিনি জয় করেছেন তার জীবনযুদ্ধ। আমাদের সমাজে তার মতো অনেক নারীরা আছে যারা, দেশের উন্নয়ন এবং নিজেদের আর্থিক অভাব দূর করতে নিরলস সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এমনকি জীবনের এই সংগ্রামে তারা সফল হয়ে ফিরিয়ে আনছে তাদের পরিবারের অর্থিক সচ্ছলতা এবং সেই সাথে হচ্ছেন সাবলম্বী।

ফেলো
রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম