মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধে ব্যাংকে বড় অংকের লেনদেনের লাগাম টানা হচ্ছে

139

মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধে ব্যাংকে বড় অংকের নগদ টাকা জমা ও তোলার ক্ষেত্রে সীমা আরোপ করা হচ্ছে। বর্তমানে গ্রাহকদের যে কোনো বড় অঙ্কের টাকা নগদ তুলতে ও জমা দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমারেখা নেই। মূলত বড় অঙ্কের লেনদেনের লাগাম টানারই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনায় ওই বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধ করতেই নতুন নীতিমালা করা হচ্ছে। ওই নীতিমালা কার্যকর হলে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি টাকা নগদে তোলা বা জমা দেয়া যাবে না। সীমার বেশি লেনদেন করতে হবে অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেক বা অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের মাধ্যমে। তবে ওই সীমা কত হবে তা এখনো নির্দিষ্ট করা হয়নি। যদিও লেনদেনের সীমা বেঁধে দেয়া হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সে পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয় তা লক্ষ্য রেখেই নীতিমালা করা হবে। সূত্র জানায়, নগদ লেনদেন সীমিত করার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংককে দেয়া এক চিঠিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে ওই বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে আবশ্যিকভাবে ৫টি বিষয় থাকতে হবে। তাতে বলা হয়েছে, গতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রেখে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নসহ বিভিন্ন আর্থিক অপরাধ রোধে নগদ অর্থের প্রবাহ কমানোর উপায় নির্ধারণ করতে হবে। দেশের অর্থনীতিতে কী পরিমাণ নগদ অর্থ প্রচলিত আছে এবং কী পরিমাণ নগদ অর্থের প্রয়োজন রয়েছে সে বিষয়েও বিশ্লেষণ থাকতে হবে। আর নগদ অর্থ প্রবাহের সাথে অপরাধ প্রবণতার সম্পর্ক জানাতে হবে। নগদ অর্থ বিনিময়ের ধরন ও জনগণ কর্তৃক ধারণের প্রকৃতি উল্লেখ করতে হবে। তাছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপের ফলে নগদ অর্থ প্রবাহের ওপর তার প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হবে। তার বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব বিবেচনায় কোনো কিছু থাকলে তাও প্রতিবেদনে যুক্ত করতে বলা হয়েছে। মূলত জঙ্গি ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের নির্দেশনার আলোকে নীতিমালা তৈরির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম এবং কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সার্বিক বিষয়ে সহযোগিতা দিচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর নীতিমালার খসড়া তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছে। নগদ লেনদেন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তোলা ও জমার প্রতিটি পর্যায়ে সীমা ঠিক করে দেয়ার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ভেদে ভিন্ন-ভিন্ন সীমা থাকবে। তবে চেক বা অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরভিত্তিক যে কোনো অঙ্কের পরিশোধে কোনো বাধা থাকবে না। তাতে করে কার্ডভিত্তিক, ইএফটিএন, আরটিজিএসের মতো চ্যানেল ব্যবহার করে লেনদেন বাড়বে। যার প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। কেউ জঙ্গি অর্থায়ন বা অবৈধ লেনদেন করলে তা ধরা সহজ হবে। প্রথমদিকে এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কিছুটা সমস্যা দেখা দিলেও ধীরে ধীরে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। যদিও বর্তমানে নগদ লেনদেনে কোনো সীমা নেই। পাশাপাশি সাম্পতিক সময়ে ব্যাংকগুলোও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। অন্যের অ্যাকাউন্টে টাকা জমার ক্ষেত্রে বাহকককে তার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। আর বড় অঙ্কের অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেকের ক্ষেত্রে ব্যাংককে জানাতে হয়।
এদিকে সরকারের এ উদ্যোগ প্রসঙ্গে ব্যবসায়িরা বলছেন, দেশে এমন বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে শ্রমিকদের এক মাসের বেতন দিতে ১০-২০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। ওসব শ্রমিকের বেশিভাগেরই এখনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে সীমা মানতে গিয়ে মালিকদের কয়েক দফায় টাকা তুলে বেতন দিতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে ওই কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। তাছাড়া অনেক ব্যবসায় প্রচুর নগদ লেনদেন হয়। সেক্ষেত্রে নগদ লেনদেনে সীমা বেঁধে দিলে মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে নিজের কাছেই বেশি রাখবে। টাকা যদি ব্যাংকে না রেখে বাসায় রাখা শুরু করে তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।
অন্যদিকে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লেনদেনে সীমা বেঁধে দিলেই জঙ্গি বা সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঠেকানো যাবে তা নয়। বরং সীমা বেঁধে দিলে মানুষ ব্যাংকের তুলনায় নিজের কাছে টাকা রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। যেসব দেশে এরকম ব্যবস্থা রয়েছে তাদের অধিকাংশ লেনদেনই ই-পেমেন্টভিত্তিক। ওসব দেশে কার্ডের মাধ্যমে সব ধরনের কেনাকাটা বা বিল পরিশোধের চর্চা রয়েছে। এমনকি গাড়ি ভাড়া, রেস্টুরেন্টসহ যে কোনো ধরনের বিল তারা কার্ড বা অ্যাকাউন্ট থেকে পরিশোধ করতে পারে। বাংলাদেশ এখনো ওই পর্যায়ে আসেনি। এখানকার অনেক প্রতিষ্ঠান বিশেষত শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের বেতন নগদে দেয়া হয়। ফলে এখনই এই নিয়ম বাস্তবায়ন করা হলে আর্থিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। তবে নগদ জমা ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোন উপায়ে এবং কী পরিমাণ অর্থ লেনদেনের সীমা বেঁধে দেয়া হবে তার ওপর নির্ভর করবে সমস্যা হবে কিনা। বিশ্বের অনেক দেশে লেনদেনে সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। তবে বাংলাদেশে অনভ্যস্ততায় প্রথম দিকে তা বাস্তবায়নে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। যদিও বিদ্যমান নিয়মে, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে যে কোনো পরিমাণের টাকা নগদে জমা বা তুলতে পারেন। তবে নগদ লেনদেনের পরিমাণ ১০ লাখ টাকার বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিএফআইইউতে রিপোর্ট করতে হয়। আবার কোনো লেনদেন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সন্দেহ হলেও সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিএফআইইউকে জানাতে হয়। আর অ্যাকাউন্ট খোলার সময় প্রত্যেককে একটি ঘোষণা দিতে হয়। যেখানে অ্যাকাউন্টে কী পরিমাণ নগদ জমা বা উত্তোলন হবে তার একটি ধারণা দিতে হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় যাকে লেনদেন প্রোফাইল বা টিপি বলে। ওই টিপিতে উল্লিখিত সীমার বেশি কেউ জমা বা উত্তোলন করতে পারে না। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের টিপিতে উল্লিখিত সীমার বেশি উত্তোলন বা জমার প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করে সীমা বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান জানান, অবৈধ লেনদেন ঠেকাতে নগদ লেনদেনে সীমা আরোপের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। কারণ যে কোনো লেনদেন চেকের বিপরীতে বা অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরভিত্তিক হলে তা কোথায় কী কাজে ব্যবহার হয় তার প্রমাণ থাকে। কেউ যদি নগদ টাকা উত্তোলন করে অবৈধ কাজে ব্যবহার করেন তাহলে খুঁজে বের করা কঠিন। বিশ্বের অনেক দেশে নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। তবে নগদ লেনদেন সীমিত করলে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাবেরও আশঙ্কা থাকে।