বিধবা মেয়ে তুলি

–ডি এম কপোত নবী–

মা বাবার একমাত্র মেয়ে তুলি। লেখাপড়াও করেছিল অনেক, বেশ ধুমধামের সহিত বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের এক বছর হতে না হতেই তুলির স্বামী হার্ট এ্যাটাকে মারা গেল। অল্প বয়সেই তুলি হল বিধবা। কিছুদিন স্বামীর বাড়ি থাকার পর তুলি এল বাপের বাড়ি। এ বাড়ি এসে তুলি কিছুদিন খুব চুপচাপ থাকল। তুলিদের পরিবারটা একটু বড়। সবাই একসাথে একই বাড়িতে থাকে। সর্বমোট বার সদস্যের পরিবার। তুলির স্বামীর মৃত্যুতে পরিবারের সবাই কমবেশি শোকাহত হয়েছিল। কিন্তু তুলির ছোট চাচি হয়নি। তুলিকে সে মোটেও পছন্দ করে না। সবাই যখন চুপচাপ ছিল তখন তুলির ছোট চাচি বলে উঠল, পৃথিবীতে এলে মরতেতো হবেই, তবে কেউ আগে কেউ পরে, এটাই জগতের নিয়ম। এই নিয়ে সারাক্ষণ কাঁদলে আর ভাবলে কি চলবে ? ছোট চাচির এইসব কথা শুনে তুলি খুব দুঃখ পেল। তুলির এই ছোট চাচি মাঝে মধ্যেই তুলিকে খোটা দিয়ে কথা বলে।
যাই হোক এভাবে কেটে গেল অনেকটা দিন। নিজ বাড়িতে আপন মনে থাকতে লাগল তুলি। আস্তে আস্তে স্বামীর মৃত্যুর দুঃখটা কিছুটা হলেও ভুলে থাকল। একদিন তুলি বিকেলবেলা বাইরে যাচ্ছিল, হটাৎ পিছন থেকে তুলির ছোট চাচি ডাকল আর বলল কোথায় যাচ্ছ,
-চাচি এক বান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছি।
– বান্ধবীর বাড়িতে, ছি¦ তোমার লজ্জা করে না এভাবে ঢ্যাং ঢ্যাং করে ঘুরে বেড়াতে ?
– কেন চাচি লজ্জা কেন লাগবে, আমি কি পশুপাখি যে ঘরে বসে থাকব।
– ঘরে বসে থাকবে না তো কি করবে শুনি। বিধবা হয়েছ তবু শখ মেটেনি না, অপয়া মেয়ে কোথাকার।
– চাচি তুমি আমাকে অপয়া মেয়ে বললে।
– অপয়া বলব না তো কি বলব, অপয়া বলেইতো অমন সুন্দর ছেলেটা তোমাকে বিয়ে করে মারা গেল।
– চাচি তুমি এসব কি বলছ উল্টোপাল্টা কথা।
– আমি ঠিকি বলছি, নিজের সংসার ভেঙে এখন এসেছ এই সংসারটা ভাঙতে।
এসব কথা শুনে তুলির মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। তুলি আর বাইরে গেল না। নিজের ঘরে যেয়ে তুলি কাঁদতে লাগল। রাতের বেলা তুলি আর কিছু খেল না। তুলি রাতে কিছু খেল কিনা তা কেউ খোঁজও নিতে এল না। আসলে এ পরিবারে সবাই বর্তমানে তুলিকে অন্যচোখে দ্যাখে। সকালে তুলির বাবার ডাকে তুলির ঘুম ভাঙল। তুলির বাবা বলল,
– কিরে কী ব্যাপার, এখন পর্যন্ত ঘুমাচ্ছিস, সে কখন সকাল হয়েছে। শুধু ঘুমালে চলবে, বাড়ির কিছু কাজকর্মও করতে হবে।
– বাবা শরীরটা খারাপ লাগছিল তাই উঠতে একটু দেরী হয়ে গেল।
– ঠিক আছে চল উঠ এখন।
তুলি তাড়াতাড়ি মুখহাত ধুয়ে বাবাকে চা করে দিল এবং নিজেও নাস্তা খেল। এমন সময় তুলির বড় চাচা এসে বলল-তুলি আমার সাদা জামাটা ময়লা হয়েছে তুই একটু ধুয়ে দিবি?
-ঠিক আছে চাচা তুমি রেখে যাও আমি ধুয়ে রাখব।
কলের কাছে তুলি জামাদুটো পরিস্কার করছিল সে সময় তুলির ছোট চাচি দুটি চাদর দিয়ে বলল-কাপড় যখন ধুচ্ছ তখন এই চাদর দুটোও ধুয়ে নিও। তুলি কোন কথা না বলে কাপড় ধুতে থাকল। শুধু ছোট চাচির মুখের দিকে একবার তাকাল। সব কাপড় ধুয়ে তুলি ছাদে কাপড়গুলো শুকাতে দিতে গেল। ছাদে তুলির সাথে অভির গেখা হল। অভি বড় চাচার ছেলে। তুলিকে দেখে অভি বলল- তুলি আপু তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ তাই না।
-নারে অভি কষ্ট কেন পাব। দুএকটা কাপড় ধুয়াকে কি কষ্ট বলে।
-তুমি বললেই হল নাকি, কাজের মেয়েটা চলে যাবার পর সব কাজতো তোমাকেই করতে হচ্ছে।
-মেয়ে মানুষ কাজতো করতেই হবে।
-তাই বলে এভাবে আপু। তোমারতো কেউ খোঁজ নেয় না। তুমি কি খাচ্ছ কেউ একবার দেখতেও আসে না।
হটাৎ তুলি কেঁদে ফেলল এবং বলল- সবি আমার কপালের দোষরে অভি। নইলে কি আমার জীবনটা এ রকম হয়। বাদদেতো আমার কথা, চল এখন নিচে চল। এই বলে ওরা নিচে চলে গেল।
সারা দিন কাজ করে তুলি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ল। রাতে দুটো খেয়ে তুলি শুয়ে পড়ল। সকাল বেলা ছোট চাচির চেচামেচিতে তুলির ঘুম ভাঙল। ছোট চাচি চেচিয়ে বলছে- নবাবের মেয়ে বেলা কত হয়েছে হুশ আছে। নাস্তা কে করবে? জলদি উঠে নাস্তা বানাও তুলি। ক্লান্ত দেহ নিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে তুলি নাস্তা বানাল এবং খাবার টেবিলে দিল। ছোট চাচা নাস্তা খেতে খেতে বলল- রান্না বান্না সব ভুলে গেলি নাকি? ভাজিতেতো একটুও লবন দিস নাই। এভাবে চললেতো হবে না বুঝলি। এত বড় মেয়ে ঠিকমত যদি রান্নাটাই করতে না পারবি তাহলে আর কি পারবি?
এসব কথা শুনে তুলি কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং বলল- হে খোদা তুমি কেমন পরীক্ষা নিচ্ছ আমার। যারা আমাকে বিয়ের আগে এত ভালবাসত আজ তারাই বিধবা হবার কারণে এ রকম করছে। খোদা তুমি কেন আমার স্বামীর সাথে আমাকেও নিলে না। কেন আমাকে বাঁচিয়ে রাখলে বল, কেন?
কিছদিন পর তুলির মামা গ্রাম থেকে বেড়াতে আসল। তুলির মামা তুলিকে খুব ভালবাসে। তুলির মামা খুব ভাল। তুলিত তাঁর মামাকে খুব ভালবাসে। তুলিকে দেখে তুলির মামা বলল- তুলি চেহারার একি হাল বানিয়ে রেখেছিস। অসুখ-বিসুখ করে নিতো।
-না মামা আমার কিচ্ছু হয়নি। আমি খুব ভাল আছি। এখন তুমি বল মামি কেমন আছে।
– আছে এক রকমিরে। তুলির মামা এ বাড়িতে থাকার কারণে বুঝতে পারল তুলির সাথে সবাই কেমন যেন অন্যরকম ব্যবহার করছে। রাতে আবার তুলিকে ওর মামা বলল- আচ্ছা তুলি, তুই কি এ বাড়িতে সুখে আছিস?
-হ্যা মামা আমি খুব ভাল আছি।
-মিথ্যে কথা বলিস না তুলি। বেশ কিছুদিন থেকে দেখছি সবাই কেমন যেন তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করছে।
তুলি চুপ করে থাকল।
-কিরে কিছু বলছিস না কেন?
-মামা এ বাড়ির কেউ আমাকে সহ্য করতে পারে না। এ বাড়িতে আমি এখন শুধু কাজের মানুষ। আজ আমি বিধবা হয়েছি, এটাই কি আমার অপরাধ? অথচ দেখ মামা বিয়ের আগে সবাই আমাকে কেমন ভালবাসত।
-তুই ঠিকি বলেছিস রে তুলি। কি করবি বল, সবি তোর কপালের দোষ।
-মামা তুমি আবার এইসব কথা কাউকে বলিও না। বাড়ির কেউ জানলে আমাকে আস্ত রাখবে না।
-তুলি এখানে থাকতে হবে না। চল আমার সাথে গ্রামে।
-না মামা, বাবা বেঁচে থাকতে আমি কোথাও যাব না।
-আজ বিকেলেই আমি চলে যাব। তুই তাহলে দেখেশুনে থাকিস। আর কোন অসুবিধে হলে চলে আসবি কেমন।
-ঠিক আছে মামা।
বিকেলে তুলির মামা চলে গেল। তুলির মামা চলে যাবার পর ছোট চাচি বলল- খুবতো মামার সাথে ফুসুর ফুসুর করলে, এখন একটু কাজকর্ম কর। দাঁড়িয়ে না থেকে যাও কাজগুলো শেষ কর।
তুলি কোন কথাই বলতে পারল না। চুপচাপ কথাশুনে চলে গেল। রাতে তুলি শুয়ে কাঁদতে লাগল আর বলতে লাগল- এত কষ্ট আর সহ্য করা যায় না। এ বাড়িতে কেউ আমাকে একটুও ভালবাসেনা। কেউ আমাকে মেনে নিতে পারেছে না। না..না আর না। এ বাড়িতে আর থাকব না। আমি বিধবা হয়েছি এটাই বোধহয় আমার খুব বড় একটা অপরাধ। কিন্তু বিধবারা কি মানুষ না ? তারাওতো রক্তে মাঙসে গড়া মানুষ। তুলি আর মোটেও দেরি করল না। রাতের অন্ধকারে অজানার উদ্দ্যেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় শুধু একবার পিছন ফিরে বাড়িটার দিকে তাকাল আর চোখের জল মুছল।