উৎপাদনে যেতে না পাড়লেও বাড়ছে স্পিনিং মিলের সংখ্যা

89

দেশে একের পর এক স্পিনিং মিলের সংখ্যা বাড়ছে। অথচ গ্যাসসহ নানা সঙ্কটে অনেক মিলই উৎপাদনে যেতে পারছে না। বর্তমানে দেশে স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৪শরও বেশি। তার মধ্যে উৎপাদনে নেই ৭৪টি মিল। তা সত্ত্বেও ওই খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। স্থাপিত হচ্ছে নতুন নতুন ইউনিট। অথচ গত কয়েক বছরে দেশের বস্ত্র খাতের স্পিনিং মিলগুলোকে বড় ধরনের গ্যাস সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাস সংযোগ না দেয়ায় ২০১৫ সালের শেষ ভাগে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় প্রায় ২৫টি মিল। আবার অনেক মিলে বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন ছিল না। পাশাপাশি কয়েক দফায় বেড়েছে গ্যাসের দামও। এমন অবস্থায় বেশকিছু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালে উৎপাদন বন্ধ স্পিনিং মিলের সংখ্যা ছিল ৭৪টি। কিন্তু তারপরও ২০১৬ সালে নতুন করে ১১টি স্পিনিং মিল গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ১৯৮৫ সালে দেশে ২১টি স্পিনিং মিল থাকলেও ২০০০ সালে ওই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২০টিতে। তারপর ২০১০ সাল নাগাদ স্পিনিং মিলের সংখ্যা ছিল ৩৬১। আর ২০১৬ সাল শেষে মিলের সংখ্যা হয়েছে ৪২৪টি। ওই হিসাবে এক দশকে মিলের সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ। ১৯৮৫ সালে স্পিনিং খাতের স্পিন্ডল সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ১১ হাজার ৮৪। ২০০০ সালে স্পিন্ডল সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৫৬ হাজার ২০০। ২০১০ সালে স্পিন্ডল সংখ্যা বেড়ে হয় ৮৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৫। ২০১৬ সাল শেষে তা আরো বেড়ে ১ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত হয়। ওই হিসাবে গত এক দশকে স্পিন্ডল সক্ষমতা বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। বর্তমানে স্পিনিং মিলগুলো বার্ষিক ২৪১ কোটি কেজি সুতা উৎপাদনের সামর্থ্য রাখে। তবে খুব কম সংখ্যক মিলই আছে যারা কৃত্রিম সুতা উৎপাদনে মনোনিবেশ করতে শুরু করেছে। বিশ্ব ও স্থানীয় চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়েই স্পিনিং খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে। বর্তমানে ওই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগই শুধু স্পিনিং মিলের বিনিয়োগ।
সূত্র জানায়, দেশের স্পিনিং মিলগুলোয় তুলার মতোই প্রয়োজনীয় একটি কাঁচামাল হলো গ্যাস। গ্যাস সংকটে বিদ্যমান কারখানাগুলোর উৎপাদন সামর্থ্যরে ৩০-৩৫ শতাংশই অব্যবহৃত থাকে। আবার গ্যাসের দামও বেড়েছে কয়েক দফা। তার প্রভাবে অনেক কারখানাই বসে পড়েছে। এরকম পরিস্থিতিতেও স্পিনিং খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ছে। ফলে স্পিনিং খাতের শিল্প রুগ্ন হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। যদিও দেশে এখনো স্পিনিং খাতের চাহিদা আছে। আর একটি মিল স্থাপন করতে ৪-৫ বছর সময় লাগে। এখন যে প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করছে সেগুলোর পরিকল্পনা করার সময় গ্যাসের সংকট এতোটা প্রকট ছিলো না। তবে বর্তমানে যারা বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করছে তাদেরকে গ্যাস ও অবকাঠামোর মতো বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। কারণ স্পিনিং খাতে অনেক বড় ধরনের পুঁজি প্রয়োজন। ওই কারণেই আগ্রহী উদ্যোক্তাদের গ্যাস সংযোগ, সরবরাহের সঠিক সময় ও দামের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সূত্র আরো জানায়, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বস্ত্র খাতের মূলধনি যন্ত্রের আমদানি। ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরে যথাক্রমে টেক্সটাইল মেশিনারির আমদানি হয় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, ৪ হাজার ৯১২ টাকা, ৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা, ৫ হাজার ৬৩ কোটি এবং ৭ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রের আমদানি হয় ৮ হাজার ৩২২ কোটি ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭০ টাকার। ওই হিসাবে ২০১০-১১ সালের তুলনায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রের আমদানি বাবদ ব্যয় বেড়েছে ৮০ শতাংশ। গ্যাস সংকটের সুরাহা না হলে ওসব বিনিয়োগ অপবিনিয়োগে রূপের আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে স্পিনিং খাতে বিনিয়োগ বাড়া প্রসঙ্গে বিটিএমএ সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন জানান, দেশের পোশাক খাতের নিট পোশাকের চাহিদার ৯০ শতাংশ সুতা বিটিএমএ সদস্যরা সরবরাহের সক্ষমতা রাখে। অর্থাৎ চাহিদার ১০ শতাংশ সরবরাহ সক্ষমতা এখনো বৃদ্ধির সুযোগ আছে। রফতানি চাহিদাকে লক্ষ্য করে সংকটের মধ্যেই বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে স্পিনিং খাতের উদ্যোক্তারা। আবার তার পাশাপাশি স্থানীয় চাহিদাও আছে। সব মিলিয়ে স্পিনিং খাতের বর্তমান বিনিয়োগকে অতিরিক্ত বলা যাবে না। অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বস্ত্র পরিদপ্তরের পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইসমাইল জানান, স্পিনিং মিলে তৈরি সুতার চাহিদা অনেক ব্যাপক। সংকটের মধ্যেও বিনিয়োগ বাড়ছে মূলত বাজার চাহিদার কারণেই। গ্যাসের নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে পারলেই এ খাতের বিনিয়োগ কোনো সমস্যার মধ্যে পড়বে না। স্পিনিং খাতে আরো কিছু বিনিয়োগের সুযোগ এখনো আছে।