চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভীরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাবে : বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সচিব

295

বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সচিব (যুগ্মসচিব) মো. মনজুর হোসেন বলেন, গম্ভীরা সংরক্ষণে এই প্রকল্পের আওতায় যে দলিল (ডকুমেন্টশন) তৈরী করা হবে তাতে যেন গম্ভীরার সঠিক ইতিহাস উঠে আসে, তথ্যে যেন কোন ঘাটতি না থাকে, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন যদি ঠিকমত এ কাজটি করা যায় তাহলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভীরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাবে।
গতকাল শনিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে “সেভিং গম্ভীরা,  ইন্ট্যাজেবল কালচারাল হেরিটেজ অব বাংলাদেশ” শীর্ষক একটি প্রকল্পের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি কথাগুলো বলেন । চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষে ইউনেস্কো পার্টিসিপেশন প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সহায়তায় এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেন। গম্ভীরা সর্ম্পকীত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির লোক সংস্কৃতি গবেষণা বিভাগের গবেষক আরমান আলি। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন, বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের প্রোগ্রাম অফিসার মোহাম্মদ তাজউদ্দিন, , জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারল অফিসার ফারুকুর রহমান ফয়সাল, বিশিষ্ট সমাজ সেবক মনিম উদ দৌলা চৌধুরী, সাংবাদিক জোনাব আলী, গম্ভীরার নানা মাহবুব আলম, নাতি ফাইজুর রহমান মানি, গণমাধ্যম কর্মী জাকির হোসেন পিংকু, নানা সাইদুর রহমান, নানা সৈয়দ শাহজামাল, নাচোল এসিয়ান স্কুল এন্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা প্রমুখ।
গম্ভীরা যেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভাষায় হয়, তা না হলে গম্ভীরার ঐতিহ্য থাকবে না উল্লেখ করে প্রধান অতিথি আরও বলেন-আমি  ইউনেস্কোতে আছি এবং প্রজেক্টে কাজ করছি। আমি প্রায় ৪ বছর যাবৎ এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। আমরা চেষ্টা করি অন্তত প্রতি বছরই যেন অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে কালচারাল বিষয়ে একটা প্রকল্প থাকে।  সে কারনেই এবার যখন আমার সহকর্মী প্রকল্পের আওতায় গম্ভীরাকে নেয়ার প্রস্তাবনা দেন তখনই আমার আগ্রহ হয় এবং তা প্রস্তাব আকারে পাঠায় ইউনেস্কো সদর দপ্তর প্যারিসে এবং তা গৃহিত হয়। এখানে আমার একার কৃতিত্ব নেই, আমার সহকর্মীদেরও যথেষ্ট অবদান আছে। যেহেতু প্যারিস থেকে এই প্রকল্পগুলো গৃহিত হয়, সুতরাং আমি বলবো তাদের বদান্যতায় আমরা এই প্রকল্পটি পেয়েছি। টাকার পরিমান খুব বেশী তা কিন্তু বলবো না। ইউনেস্কোর এই প্রোগ্রাম গুলোতে হয় কি, টাকার পরিমানটা কম হয়। এই প্রোগ্রামগুলোতে আমরা টাকাকে বড় করে দেখি না। এখানে টাকার চেয়ে বড় যে বিষয়টা হচ্ছে এতে ইউনেস্কোর সম্পৃক্ততা রয়েছে। আজকে এই প্রকল্পটাতে ইউনেস্কোর লোগো ব্যবহার করতে পারছি। এটার একটা ব্র্যান্ডিং ভ্যালু রয়েছে। এই ভ্যালুটাকে আমরা সামনের দিকে তুলে আনতে চাই। অনেক কিছুই কিন্তু ইন্ট্যানজেবল কালচারাল হেরিটেজ আছে। তিনি বলেন-যতক্ষণ পর্যন্ত এটা ইন্ট্যানজেবল কালচারাল হিউমিনিটি না হবে ইউনেস্কো থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত স্বীকৃতি পাওয়া যাবে না। এই জন্যই প্রাথমিক ভাবে কাজ শুরু করা হয়েছে। এখন দরকার সঠিক তথ্য। তিনি বলেন যে আপনাদের এই জন্য সঠিক তথ্য দিতে এগিয়ে আসতে হবে। আপনারাই এই প্রকল্পের সাফল্য আনতে অগ্রণী  ভুমিকা রাখতে পারেন। এই প্রকল্পর কাজ সহজ করতে গম্ভীরার আসল তথ্য পেতে এ বিষয়ে যারা জানে, তাদের নিয়ে কাজ করার জন্য প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির প্রতি আহবান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম বলেন, আম কে যেমন এই জেলা থেকে কেড়ে অন্য জেলার করে নিতে পারেনি, গম্ভীরাও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলারই হবে। কেউ কেড়ে নিতে পারবে না এবং গম্ভীরা এই জেলার ইন্ট্যানজেবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা জেলা প্রশাসন এই প্রকল্পকে এ জেলায় বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।
শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার ফারুকুর রহমান বলেন- বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলায় প্রতিটা শিল্পকলা একাডেমীতে ফোকলোর সেন্টার খুলতে যাচ্ছে। সেখানে শুধু গম্ভীরা নয় ফোক আঙ্গিকের যে সব গান রয়েছে তা  চর্চা এবং প্রশিক্ষণের প্লাটফর্ম তৈরী হবে। যদিও এর ফান্ডিং খুব অল্প তবুও এটাকে স্থানীয় ভাবে প্রচার প্রসারের যথেষ্ট চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে লোকজ সংস্কৃতি উৎসব করার একটা প্রস্তাবনা দেয়া আছে আমাদের। তিনি বলেন- অল্প কিছুদিনের মধ্যে লোকনাট্য উৎসবও হতে যাচ্ছে, তাতে গম্ভীরাসহ যেসব ফোক গান আছে তা তুলে ধরা হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গম্ভীরা যেহেতু একটি ব্রাইট প্রাটফর্ম তাই আমি বিশ্বাস করি এটাকে  পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্ব কাতারে দাঁড় করা সম্ভব হবে । প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির ফোক থিয়েটার যেহেতু এ বিষয়ে কাজ করছে সেহেতু  তারা যদি আমাদের শিল্পকলা একাডেমীকে সহযোগীতা করে তাহলে আমরা গম্ভীরা ও ফোক গান, আলকাপ, কবি গানসহ  লোকজ সংস্কৃতিকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারবো । আমরা প্রয়াসের কাছ থেকে সহযোগীতা চাই। এবং প্রয়াসকে সহযোগীতা করতে চাই।
স্বাগত বক্তব্যে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেন প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি ও গম্ভীরা সংরক্ষণ প্রকল্পের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলেন-চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরাকে যুগযুগ টিকিয়ে রাখতে, গম্ভীরাকে আরো সুরক্ষিত করতে ইউনেস্কো পার্টিসিপেশন প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সহায়তায় প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি “সেভিং গম্ভীরা, ইন্ট্যানজেবল কালচারাল হেরিটেজ অব বাংলাদেশ” শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় নারী গম্ভীরাদলসহ  নতুন ২০টি গম্ভীরা দল তৈরি করা হবে এবং দলগুলোর জন্য গম্ভীরা সম্পর্কিত বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে যা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরাকে যুগ যুগ টিকিয়ে রাখতে বিশেষ ভুমিকা পালন করবে। হাসিব হোসেন বলেন, আমার এই সংগঠন প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে জন্ম নেয়া সংগঠন। তাই আমি গম্ভীরা নিয়ে কাজ করতে পেরে আমরা গর্ব অনুভব করছি। গম্ভীরা নিয়ে এর আগে কখনও কাজ হয় নি, এবারই প্রথম হচ্ছে। আশা করি বাউল গান ইউনেস্কো থেকে যেভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, গম্ভীরাও সেভাবে পাবে। তিনি আরও বলেন, আমের ব্র্যন্ডিং যেভাবে হয়েছে গম্ভীরারও সেভাবে ব্র্যান্ডিং হবে। তিনি বলেন, ইউনেস্কো বাংলাদেশের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ যে তারা গম্ভীরাকে নিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। সাথে সাথে জেলা প্রশাসন যেন আমাদের এই প্রকল্পের কাজে সহযোগীতা করে আমি সে কামনা করছি। গম্ভীরাকে ইন্ট্যানজেবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্রে মিডিয়া কর্মীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
মুক্ত আলোচনায় মনিম উদ দৌলা চৌধুরী বলেন, উপস্থাপিত প্রবন্ধে আরো কিছু তথ্যঘাটিত আছে তা যেন সংযোজন করা হয়। সাংবাদিক জোনাব আলী আঞ্চলিক ভাষায় গম্ভীরা পরিবশেনের জন্য সংশ্লিষ্ট্যদের প্রতি আহবান জানান। মান বজায় রেখে দলগুলো যেন গম্ভীরা পরিবশেন করে সে ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ফাইজুর রহমান মানি। এই সময় বক্তারা, একটি শক্তিশালী গম্ভীরা একাডেমি তৈরিসহ গম্ভীরা যাদুঘর স্থাপনের দাবি জানান।
প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির লোক সংস্কৃতি গবেষণা বিভাগের গবেষক আরমান আলি তিনি তার উপস্থাপনায় বলেন, প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে গম্ভীরার যাত্রা শুরু হয়েছিল, কালের পরিক্রমণে লোকসঙ্গীতের জগতে গম্ভীরা তাঁর আসন তৈরি করে নিয়েছে অব্যাহত ধারায়। অন্যান্য লোক-সঙ্গীতের মতো এ সঙ্গীতের আবেদন সুরের মূর্ছনায় নয়, নয় তার গীত-ঝঙ্কারে। এ গানের প্রধান আকর্ষণ নানা-নাতির উপস্থিত সংলাপ আর অঙ্গভঙ্গিতে। নানা-নাতির বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে সমাজের দুঃখ দৈন্য, নানাবিধ সঙ্কট, মূল্যবোধের অভাবজনিত অবস্থা, দুর্নীতি, নানাগল্প-গাঁথারমধ্য দিয়ে ব্যঙ্গমিশ্রিত কৌতুকের আবরণে তুলে ধরা হয়। এ ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ততীব্র। সমাজের যে কোনো স্তরকে আকর্ষণ করতে পারে সহজেই। লোকসঙ্গীতের জগতে অন্য কোন সঙ্গীতে এ গুণ নেই। এখানেই গম্ভীরার স্বাতন্ত্র্য, এখানেই তার অনন্যতা। সুতরাং বলা যেতে পারে, একটা জেলার চৌহদ্দির সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে এর যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এ গানের আকর্ষণ সমগ্র বাংলাদেশের সকল মানুষের নিকট। আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য নিয়েও গম্ভীরা শিল্পীদের ঐকান্তিক নিষ্ঠা এবং নিরলস সাধনার ফলে বাংলার লোকসাহিত্যের অঙ্গনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকসঙ্গীত ‘গম্ভীরা’র আবেদন তাই হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। এ লোকসংস্কৃতি অর্থাৎ এই গম্ভীরার মাধ্যমে খুব সহজেই যেকোনো তথ্য বা পরামর্শ মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়। শুধু সামাজিক বৈষম্যই নয় নানাবিধ সামাজিক সমস্যা দুরিকরণে গম্ভীরার ভুমিকা অতুলনীয়। কারণ এমন কিছু সমস্যা বা অসঙ্গতি আছে যা কর্তৃপক্ষ বা লক্ষিত জনগোষ্ঠির নিকট সরাসরি বলা খুব কঠিন। সমাজের অসঙ্গতি বা সমস্যা সমূহ নানা-নাতির হাস্য রস ও কৌতুকের মাধ্যমে সহজে তুলে ধরা যায় সংশ্লিষ্ট্য কর্তৃপক্ষ বা লক্ষিত জনগোষ্ঠির নিকট। ফলে কর্তৃপক্ষের বা লক্ষিত জনগোষ্ঠির টনক নড়ে এবং তার সামাধানে ভূমিকা রাখে।
উল্লেখ্য গম্ভীরাকে ‘ইন্ট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের প্রতি জোর দাবি জানান বক্তারা।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের শিক্ষা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার নাজিবুল আলম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি গোলাম মোস্তফা মন্টু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এমারন ফারুক মাসুম, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা শফিকুল আলম, জেলার সরকারি বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ, স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সুধীজন এবং প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটসহ নতুন ও পুরাতন গম্ভীরা দলের প্রতিনিধিবৃন্দ।