দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতে স্বল্পদক্ষ বিদেশী কর্মীরা পাচ্ছে মোটা বেতন

এফএনএস এক্সক্লুসিভ: দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানই বিদেশী কমী নিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ফলে স্বল্পশিক্ষিত বিদেশী কমীরা ওসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাচ্ছে বিশেষজ্ঞ হিসাবে। ওসব বিদেশী কর্মীর অনেককেরই যোগ্যতার কোনো সনদ নেই। ফলে কমসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সহজলভ্য এবং সমযোগ্যতাসম্পন্ন দেশীয় শ্রশক্তি। পাশাপাশি ওসব বিদেশী কর্মীদের মোটা অংকের বেতন বাবদ বিপুল অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিআইডিএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিদেশী কর্মীর বেশির ভাগই চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্ককার নাগরিক। রফতানিমুখী বস্ত্র ও পোশাক শিল্পে ওসব দেশের কর্মীরা বেশি নিয়োগ পাচ্ছে। দেশে বিদেশী কর্মীদের কাজের অনুমোদন দেয় এমন সরকারি সংস্থার মধ্যে আছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিআইডিএ), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও এনজিও ব্যুরো। বিশেষজ্ঞ ঘোষণায় স্বল্পদক্ষ বিদেশী কর্মী নিয়োগের ঘটনা ঘটলেও এই সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ওসব সংস্থার কাছে নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানই ঘোষণা অনুযায়ী বিদেশী কর্মীর যোগ্যতা সনদ দেখাতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে স্বল্পদক্ষ বিদেশী কর্মী নিয়োগপ্রবণতা কমিয়ে আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে বিআইডিএ।
সূত্র জানায়, এদেশীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন দেশীয় কর্মীর চেয়ে বিদেশী কর্মীরা বেশি প্রয়োজন মেটাতে পারছে। যে কারণে তারা স্বল্পদক্ষ বিদেশী নিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। কারণ শিল্পোদ্যোক্তারা আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লাভবান হন। কিন্তু বিদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। নিয়োগদাতারা বিশেষজ্ঞ ঘোষণা দিয়ে স্বল্পদক্ষ বিদেশী কর্মী নিয়োগ দেয়ায় বৈধ পথেই দেশ থেকে অর্থ পাচারের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে থেকে যায়। যদিও এদেশে বিদেশী কর্মীদের কাজ করার ওয়ার্ক পারমিট দেয় এমন সরকারি সংস্থাগুলোর বিদেশী কর্মী নিয়োগে কঠোরতা অবলম্বনের দিকনির্দেশনা আছে। ফলে বিদেশী কর্মীর কাজের অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ হিসেবে যেসব বিদেশী বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে চাইছেন তাদের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা বেশি অবলম্বন করা হচ্ছে। নিয়োগ দেয়া হলেও ভিসা দেয়া হচ্ছে স্বল্পসময়ের জন্য।
সূত্র আরো জানায়, বতমানে বস্ত্র ও পোশাকসহ দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার অনেক কর্মী নিয়োজিত। এর প্রধান কারণ হচ্ছে দেশীয় কর্মীদের মধ্যে দক্ষতার পাশাপাশি একাগ্রতার ঘাটতি আছে। তাছাড়া শিল্পায়নের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে ওসব দেশের কর্মীদের উৎপাদনশীলতাও দেশীয়দের তুলনায় বেশি। কাজের প্রতি যথেষ্ট নিষ্ঠাবান তারা। ওসব কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠান যথাযথ সনদ দিতে না পারলেও অনুরোধ ও সমঝোতার মাধ্যমে কাজের অনুমোদন নেয়া হয়। তবে বর্তমানে সতর্কতা অবলম্বনের কারণে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম কম হচ্ছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানই বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিদেশীদের নিয়োগ দিলেও আসলে তারা স্বল্পদক্ষ। মূলত কাজে পারদর্শিতা ও প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উৎপাদনশীলতার কথা বিবেচনায় নিয়ে বিদেশী কর্মীদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া দেশীয় প্রতিষ্ঠানে অনেক বিশেষজ্ঞ বিদেশী কর্মী কাজ করে এমন তথ্যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বহন করে। এই কারণেও অনেক ব্যবসায়ী তথ্য গোপন করে বিদেশী নিয়োগ দিচ্ছে। পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়িরা দেশের বাইওে অথ নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেও বিদেশী কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। তাছাড়া দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি দীর্ঘদিনের। ওই ঘাটতি পূরণের অংশ হিসেবেই ওসব খাতে বিদেশীদের নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। এদেশে মোট বিদেশী কর্মীর কাজ করার অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রায় ৪০ শতাংশ বাণিজ্যিক ও বাকি ৬০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছে। সেক্ষেত্রে ৮০ শতাংশের বেশি ওয়ার্ক পারমিট পেয়েছে উন্নয়নশীল দেশের কর্মীরা।
এদিকে বিগত ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অধুনা বিলুপ্ত বিনিয়োগ বোর্ড ও বর্তমান বিআইডিএ দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় কাজের জন্য ২৬ হাজার ৬১৯ জন বিদেশীর নামে ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করেছে। তার মধ্যে ৭ হাজার ৯২০ জন বা এক-তৃতীয়াংশই ভারতের নাগরিক। তারপরই আছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দুটি দেশ শ্রীলংকা ও পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের কর্মীদের মধ্যে আধিক্য আছে চীনের। দক্ষ কর্মী ঘাটতিতে প্রতি বছর দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরেই দেশের বাইরে চলে যাওয়া অথের পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলার (৩১ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে গেছে। আর ওই অর্থ যাচ্ছে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলেই।
অন্যদিকে দিকে বিদেশী কর্মী নিয়োগদাতা দেশীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার কাজে বিদেশীরা যে রকম দক্ষ, সে তুলনায় দেশে দক্ষ জনবল নেই। বিদেশীরা অনেক বেশি পেশাদার। সেক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা সনদের চেয়েও তাদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্যই বাধ্য হয়ে বেশি বেতন দিয়ে তাদের আনা হয়। শিল্প মালিকরা তো শুধু শুধু বেশি টাকা দিয়ে বিদেশী কর্মী নিয়োগ দেয় না। নিয়োগপ্রাপ্ত বিদেশী কর্মী মানসম্পন্ন কাজ করছে কিনা বা তার দ্বারা কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা তাও দেখে। দেশে অবৈধভাবে বিদেশী কর্মী নিয়োগ হলে তা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন। তবে সবার আগে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। যাতে শিল্পে টেকনিক্যাল কর্মীর জন্য বহির্বিশ্বের মুখাপেক্ষী হতে না হয়।
এ প্রসঙ্গে বিআইডিএর নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র ম-ল জানান, দেশে বিপুল পরিমাণ স্বল্প ও অদক্ষ জনশক্তি আছে। তারপরও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ওই ধরনের বিদেশী কর্মী নিয়োগ হচ্ছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।