মা

– সাদিক সাকলায়েন

“আল্লার কসম আমি চুরি করি নাই। বিশ্বাস করেন। পীর সাহেবের কসম, ঐ বাক্সে আমি হাত দেই নাই।”

“কেউ বিশ্বাস কইরেন না। বিপদে পড়লে ভালো-মন্দ বেবাকই আল্লারে ডাহে। আল্লার কসম কইলেই সইত্য না মিছা বুঝা যায় না। অরে কেউ বিশ্বাস কইরেন না। দরবার শরীফের টেকা, আল্লার ঘরের দান, কতো নেক মাইনষ্যের মানত- এই ব্যাটা চুরি করছে! চুরি কইরা আবার মিছা কতা কয় শালার হারামি”। -চুরি কইরা কি কেউ কয় যে, আমি চুরি করছি? হায়দারের কথার মাঝখানে একজন বলে ওঠে। হায়দার বিরক্ত হয়। বলে, “তয় পরমান করেন, হে চুরি করছে কি করে নাই?” উপস্থিত লোকজন একটু নড়েচড়ে বসে। হুজুর প্রস্তাব করে যে পানি পড়া খাওয়ানো হোক। সত্য কথা বললে কিছু হবে না, কিন্তু মিথ্যা বললে ওর জবান বন্ধ হয়ে যাবে। এখনকার মানুষজন এসবে বিশ্বাস করে না কিন্তু তখন কাউকে আপত্তি করতে দেখা গেলো না। কাউকে বলা হয়নি কিন্তু একজন ততক্ষণে দৌড়ে গিয়ে এক বোতল পানি নিয়ে এসেছে। হুজুর দোয়া পড়ে পানিতে ফুঁ দিলেন। তারপর লোকটার দিকে বোতল এগিয়ে দিয়ে বললেন দেখ্ চিন্তা কইরা। লোকটা কিছু বললো না, নিঃশব্দে বোতল হাতে নিয়ে মুখে পানি ঢালবে এমন সময় হুজুর বললেন- ঐ, বিসমিল্লা কইবি। লোকটা বললো, বিসমিল্লা।

ঢকঢক করে এক বোতল পানি গিলে ফেললো কাদের। লোকজন অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে আছে কি হয় দেখার জন্য। হায়দার নীরবতা ভাঙালো। চটকদার হিন্দি গানের সুর বেজে উঠলো ওর মুঠোফোনে। পকেট থেকে ফোন বের করে কলটা কেটে দিলো। ভাবটা এমন যে দুনিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ত লোক সে। আসলে বেকার লোকেরা এমনই হয়। এদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ থাকে না কিন্তু যা করে তা-ই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যা হোক সে ধমক দিয়ে বললো, “কিরে তুই সত্যই কি চুরি করস নাই?” কাদের বললো- না। হায়দার খেঁকিয়ে উঠলো- অই হালার পুত, কতা কানে যায় না? তুই চুরি করছস্? উপস্থিত সবাই অবাক, লোকটা তাহলে সত্যিই চুরি করেছে! হুজুরের কেরামতি দেখ্- গুঞ্জন ওঠে। কাদের বলে- “ আফনেরা কি কন? আমি তো চুরি করি নাই!” কিন্তু লোকজন গোঙানি ছাড়া আর কিছু শুনতে পায় না। মানুষ হাসে। কাদের ওদের দেখে আবার চিৎকার করে- “বিশ্বাস করেন আমি ঐ বাক্সে হাত দেই নাই। বিশ্বাস করেন, আমার দুইটা বাচ্চা আছে, একটা পোলা, একটা মাইয়া- অগো কসম”। কাদেরের এই কথা গইরু জবাই করলে যেমন গোঙানি শোনা যায়, জনতার কানে এমনই শোনালো।

ভীড়ের মধ্য থেকে একজন বললো- মার। অমনি দুমদাম কিল ঘুসি। কাদের চিৎকার করে বললো- আল্লার দোহাই, আমারে ছাইড়া দেন, আমি গরীব হইবার পারি কিন্তু চোর না”। কথাগুলো কারো কান পর্যন্ত পৌঁছালো না, কাদেদের জবান বন্ধ।

বোবা কাদের। ফরিদপুর থেকে ঢাকা এসেছে। বছর পাঁচেক হলো। নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। যখন যে কাজ পায় সেটাই করে। অবসরে শহীদের চা’র দোকানে চা, বিড়ি খায়, গল্প করে। এমনই একদিন বসে গল্প করছিলো। হঠাৎ চোখ যায় বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে শেকলে বাঁধা লাল বাক্সটার দিকে। শহীদের কাছে জানতে চায় যে এটা কে লাগিয়েছে। শহীদ জানে না। কে লাগিয়েছে আর কে-ই বা খুলে নিয়ে যায়, সারাদিন ওখানে বসে থেকেও সে জানতে পারেনি। তবে মাঝেমাঝে কাউকে ওটার ভেতরে টাকা ফেলতে দেখে। ব্যাস, এটুকুই। আর তার পরের দিনই বাক্সটা উধাও! আর সেদিনই প্রথম বাক্সের মালিককে দেখা গেলো। শহীদের কাছে জানতে চাইলে সে কাদেরকে দেখিয়ে দেয়। আর ভোলাভালা কাদের! হুজুরের কেরামতিতে জবান বন্ধ আর মার খেয়ে শরীরের অবস্থা খারাপ।

সেই ঘটনার পর থেকে মানসিক ভাবেও বিপর্যস্ত। খাবারে অরুচি, ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না। ফলে স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে, কর্মস্পৃহা কমে গেছে। পরিবারের সাথে যোগাযোগ নেই অনেকদিন। মাঝেমাঝে ছেলেমেয়ে দুটোর কথা মনে পড়ে, তখন বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যাওয়া আর হয় না। সারাদিন সন্তানের সাথে গল্প করতো যে লোকটা সে এখন কি করে তাদের সামনে গিয়ে নিশ্চুপ থাকবে। ওরা যখন জানতে চাইবে কি হয়েছে, উত্তর দেয়ার মতোও সামর্থ্য নেই। থাকলেও কি বলতে পারতো যে চুরির দায়ে এমন অবস্থা? তবু পিতৃহৃদয় বলে কথা! একদিন সিদ্ধান্ত নেয়, সে বাড়ি যাবে। তার আগে হুজুরের খোঁজ। বেশি খুঁজতে হলো না। সেখানেই, যেখানে কাদেরের বিচার হয়েছিলো, হুজুর আরেকটা সালিশে ব্যস্ত। শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাদের অপেক্ষা করে। বিচার শেষে চা পর্ব। হুজুর চা-নাস্তা সেরে উঠে চলে যাবেন, এমন সময় কাদের দৌড়ে গিয়ে হুজুরের পা জড়িয়ে ধরলো। হচকিত হুজুর ভারী পেট নিয়ে পড়ে যাওয়া থেকে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিলেন। -ছাড়, ছাড়। কাদের ছাড়লো না, পা জড়িয়ে ধরেই চিৎকার করে বললো- হুজুর, আমার জবান ফিরাইয়া ফিরাইয়া দেন। হুজুর শুধু গোঙানি শুনলেন। ঠিক বুঝতে পারলেন না ঘটনাটা কি। কিন্তু কাদেরের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে চিনতে পারলেন এবং ঘটনা মনে পড়লো। তিনি কাদেরকে সরে যেতে বললেন, বললেন যে উল্টো পানি পড়া দেবেন। আশ্বাস পেয়ে কাদের হুজুরের পা ছেড়ে দিলো। হুজুরের মন গলেছে। টেবিলের ওপরে তারই আধখাওয়া পানির গ্লাসে কি যেন দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন এবং কাদেরের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। কাদের হাত বাড়ালো কিন্তু হুজুর গ্লাস সরিয়ে নিলেন। কাদের এবার দু হাত এক করে আঁজলা পাতলো। হুজুর পানিটুকু কাদেরের হাতে ঢেলে দিয়ে বললেন- বিসমিল্লা কইবি। কাদের বললো- বিসমিল্লা। কিন্তু শুধু গোঙানি শোনা গেলো। কাদের পরম শ্রদ্ধায় পানিটুকু পান করলো। হুজুর বললেন- ক আলহামদুলিল্লা। কাদের বললো -আলহামদুলিল্লা, কিন্তু গলা থেকে অদ্ভুত কিছু গোঙানি ছাড়া আর কিছু বেরুলো না। হুজুরও অবাক হয়ে গেলো। আল্লার কালাম বৃথা হতেই পারে না। বললেন, আল্লা তোরে শাস্তি দিছে, তার নিকট ক্ষমা চা। কাদের বোঝে না কোন্ অপরাধে তার এ শাস্তি। কাদের কান্নায় ভেঙে পড়ে, আল্লার কাছে ক্ষমা চায়। হুজুর ও বাকি লোকজন সবাই চলে যায়।

কাদের বাড়ি যাবে। ছেলেমেয়ে আর বউয়ের জন্য জমানো টাকা থেকে কিছু কেনাকাটা করে। বাস টার্মিনালে গিয়ে ফরিদপুরের টিকেট চায়। কাউন্টারের লোকটা বুঝতে পারে না যে কাদের কি বলছে। সে বিভিন্ন জায়গার কথা জিজ্ঞেস করে কিন্তু কাদের না সূচক মাথা নাড়ায়। লোকটা বিরক্ত হয়ে একটা টিকেট দিয়ে দেয়। চারশো টাকা ভাড়া। কাদের খুশিমনে গিয়ে বাসে ওঠে। রাতের যাত্রা। বাস চলা শুরু করলে জানালা দিয়ে ঠা-া বাতাস এসে কাদেরের গায়ে আছড়ে পড়ে। আরামে কাদেরের চোখে ঘুম চলে আসে। যখন টের পায় তখন ভোর। বাস থেমেছে। চোখ খুলে দেখে আর কেউ নেই। কাদেরও তার গামছা বাঁধা পুঁটলিটা নিয়ে নেমে পড়ে। অচেনা কোনো এক জায়গা। আশেপাশের দোকানের সাইনবোর্ডগুলো দেখে কিন্তু কাদের পড়তে পারে না। গরীব কাদের লেখাপড়া শেখেনি। কাউকে জিজ্ঞেস করতে চায় কিন্তু কেউ কি বুঝবে তার গোঙানির অর্থ? তাই কাদের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাতে সে অনেকদূর যায়। অনেকদূর থেকে অনেকদূর। মনে হয় আরেকটু গেলেই তার বাড়ি। কিন্তু বাড়ির পথ খুঁজে পায় না। দুপুরের দিকে ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের নিচে বসে কাদের একটু জিরিয়ে নেয়। তারপর আবার হাটা শুরু করে, সন্ধ্যার আগেই বাড়ি পৌঁছাতে হবে। কাদেরের আর ক্লান্তি নেই, ক্ষুধা নেই, পিপাসা নেই, আছে শুধু বাড়ি যাবার আকুতি, দুটো সন্তান আর স্ত্রী।

ভোরের আলো ফুটেছে। জোলেখা ফকিরনি ঘুম থেকে উঠে পরিষ্কার হতে তাড়াতাড়ি নদীর ধারে যায়। নদীর পানিতে পরিষ্কার হয়ে ফিরছিলো, এমন সময় তীরে ভেজা মাটির ওপর একটা লোককে পড়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। সে এগিয়ে যায়। মাঝবয়সী একটা লোক। মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফ, নাকে শব্দ করে ঘুমাচ্ছে। সে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে- কেডা? কাদের টের পায় না। জোলেখা আবার জিজ্ঞেস করে- কেডা রে? এইহানে কি? কাদের এবার চোখ খোলে সদ্য ঘুম ভাঙা কাদের চোখের পিঁচুটি মুছতে মুছতে জোলেখার দিকে তাকায়। হাড় জিরজিরে জোলেখা ফকিরনির কোঁচকানো মুখের দিকে তাকিয়ে কাদেরের মায়ের কথা মনে পড়ে। কাদের ডুকরে কেঁদে ওঠে। জোলেখা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে কি নাম, কোত্থেকে এসেছে, এখানে পড়ে ছিলো কেনো। কিন্তু কাদের কোনো জবাব দিতে পারে না। পুঁটলি খুলে দেখায় একটা শাড়ি, একটা বাচ্চা মেয়ের জামা, চুড়ি আর ছোটো ছেলের জন্য একটা শার্ট। কাদের গোঙায় আর একদিকে আঙুলের ঈশরা করে। জোলেখা কিছুই বোঝে না। ততক্ষণে গ্রামের আরও কয়েকজন এসেছে। ওরাও বোঝে না। জোলেখার কাছে ওরা জানতে চায় ঘটনা কি। জোলেখা কাদেরের এখানে পড়ে থাকার কথা বলে। বলেই সে চলে যেতে উদ্যত হয়, বেলা হয়ে যাচ্ছে, ভিক্ষায় বেরুতে হবে।। কিন্তু সবাইকে অবাক করে তার যাওয়া রুখে দেয় কাদের। পেছন থেকে কাদের দেখে ওঠে- ‘মা’। জোলেখা ফকিরনি ফিরে তাকায়। – কেডা তোর মা? কাদের বলে- তুই, তুই আমার মা। কিন্তু সব গোঙানি শোনা যায়, শুধু শেষ শব্দটা স্পষ্ট -‘মা’।

SHARE