তারার মাঝে

–ডি এম কপোত নবী–

মা, বাবা কোথায় গেছে ? বাবা আসেনা কেন, কবে বাবা আসবে ? ছয় বছরের এই অবুঝ শিশুর কোন উত্তর দিতে পারে না তার মা। ছেলেকে সান্তনা দেবার জন্যে বলে, আসবে বাবা, তোর বাবা আর কিছু দিন পরেই আসবে। শিমুল ওর বাবাকে এদিক সেদিক খুঁজে কিন্তু কোথাও খুঁজে পায়না। বাবার ছবিটা হাতে করে প্রায় ছবির সাথেই কথা বলে শিমুল। ওর মার একটাই ভাবনা শিমুল একটু বড় হোক তখন ওকে সব বলবে। এদিকে আস্তে আস্তে শিমুল বড় হচ্ছে। স্কুলে ভর্তিও হয়েছে। চারপাশে কি ঘটছে, কি হচ্ছে সব কিছু বুঝতেও শিখেছে শিমুল। একদিন স্কুলে এক শিক্ষক শিমুলকে বললেন- জানো শিমুল তুমি কার ছেলে? তুমি হচ্ছ একজন ভাষা সৈনিকের ছেলে। তোমার বাবার কারণেই আজ আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি। তোমার বাবাদের মত অসংখ্য ভাষা সৈনিকদের কারণেই আজ আমরা প্রাণের ভাষা বাংলায় কথা বলছি। শিমুল তখন শিক্ষককে প্রশ্ন করলো- আচ্ছা স্যার আমার বাবা কোথায় গেছে আপনি জানেন ? হ্যাঁ শিমুল জানি, তোমার বাবা আকাশে তারা হয়ে গেছেন। রাতের তারার মাঝে তোমার বাবাও তারা হয়ে জেগে থাকেন। স্যারের কথায় শিমুল কিছু বুঝে উঠতে পারল না। মন খারাপ করে বাড়ি চলে এলো। রাতের বেলা শিমুল আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখছে আর স্যারের কথা মনে করছে। এমন সময় ওর মা এলো। মাকে দেখেই শিমুল প্রশ্ন করলো, আচ্ছা মা বাবা নাকি ওই আকাশে গিয়েছে, রাতে তারা হয়ে তিনি নাকি জ্বলেন, আজ স্কুলে স্যার এ কথাই বলেছেন। বলনা মা সত্যি কি বাবা ওখানে গিয়েছে ? ওখান থেকে বাবা কবে আসবে ? অশ্রু ভেজা নয়নে মা বললেন, হ্যাঁ বাবা তোর বাবা ওই আকাশে গিয়েছেন। ওখান থেকে বাবা কবে আসবে? জিজ্ঞেস করে শিমুল। মা বললেন, ওখানে যে একবার যায় সে আর ফিরে আসে না বাবা। তোর বাবাও আর আসবে না। এই সব কথা বলতে বলতে শিমুলকে জড়িয়ে ধরেন মা। মনের অজান্তেই চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে মায়ের। কিছুক্ষণ পর শিমুল আবার বললো, বাবার কি হয়েছিল ? বাবা কি ভাবে মারা গেলো ? তোর বাবা যখন মারা যায় তখন তুই আমার পেটে ছিলি। ১৯৫২ সালে শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য তোর বাবার মত আরও বহু মানুষ নেমেছিলেন আন্দোলনে। যেদিন তোর বাবা মারা যান, সেদিন একটা মিছিল বের হয়েছিল। তোর বাবা এবং আরও অনেকেই গিয়েছিলেন সেই মিছিলে। মিছিলের এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি করেছিল ভাষা সৈনিকদের উপর। সেই গুলিতেই তোর বাবা শহীদ হন। শিমুল বলল, মা এতদিন কেন এই কথা আমাকে বলনি। তুই ছোট ছিলি বলে তোকে কিছু বলিনি বাবা। আজ যখন সবকিছু জানতে পেরেছিস তখন তোকে সব জানালাম। মার কথা শুনে শিমুলের চোখে পানি এল। কিন্তু সে গর্বিত হলো তার বাবার জন্য। কিছুক্ষণ পর শিমুল তাকায় আকাশের তারাগুলোর দিকে। তারার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে ওঠে, বাবা দেখ আজ তোমার জন্য, তোমাদের মত ভাষা সৈনিকদের জন্য আমরা বাংলায় লিখছি, পড়ছি, বলছি। বাবা তুমি দোয়া করো, আমিও যেন তোমার মত হতে পারি। হটাৎ যেন একটি তারা চমক দিয়ে উঠল। শিমুল ভাবলো, হয়ত তার বাবাই তার ডাকে সাড়া দিলেন। সেই তারাটার দিকে তাকিয়ে শিমুল একটু হাসল গর্বের হাসি।