ইসলামে পিতার মর্যাদা

gourbangla logoপৃথিবীতে কারা আমাদের বেশি ভালোবাসেন? দু’চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তেই বলে দেওয়া যাবে- কারা আবার! বাবা-মা আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। হ্যাঁ, বাবা-মা আমাদের বেশি ভালোবাসেন। কারণ জন্মের পর থেকেই প্রতিটি বাবা-মা নিজেদের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে সন্তানের সুখ ও নিরাপত্তার জন্য যতটা চিন্তিত থাকেন অন্য কেউই এমনটি করেন না। সন্তান যেন আদর্শ মানুষ হয় এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়, সেজন্য বাবা-মা শৈশব থেকেই চেষ্টা করেন। আর এজন্যই পৃথিবীর সব ধর্মই বাবা-মাকে বিশেষ সম্মান দিয়েছে। কোনো ধর্মই বাবা-মাকে অবজ্ঞা-অবহেলা করার সুযোগ দেয়নি। পৃথিবীর সেই øেহপরায়ণ সব বাবার জন্য আগামী রোববার পালন করা হবে ‘বিশ্ব বাবা দিবস’। প্রতি বছর জুনের তৃতীয় রোববার দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।
পবিত্র কোরআনের অন্তত ১৫ জায়গায় বাবা-মার প্রতি সন্তানের কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর না এবং বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন; তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারপূর্ণভাবে কথা বলো।’ সূরা : বনি ইসরাঈল : ২৩-২৪
হজরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বাবার মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাবার সন্তুষ্টির ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং বাবার অসন্তুষ্টির ওপর আল্লাহর অসন্তুষ্টি নির্ভর করে।’ বাবা-মার সঙ্গে অসৎ আচরণকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ বলে অভিহিত করা হয়েছে ইসলাম ধর্মে।
দীর্ঘ এক হাদিসে আছে, হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমরা মিম্বরের কাছে জমায়েত হও। আমরা মিম্বরের কাছে জমায়েত হলাম। তিনি মিম্বরের প্রথম ধাপে আরোহণ করে বললেন, আমিন। দ্বিতীয় ধাপে আরোহণ করে আবার বললেন, আমিন। তৃতীয় ধাপে আরোহণ করে আবারও বললেন, আমিন। তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করার পর আমরা তাঁর কাছে আরজ করলাম, আজ আমরা আপনার কাছ থেকে এমন কিছু কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনও শুনিনি। তিনি বললেন, জিবরাঈল (আঃ) (এইমাত্র) আমাকে এসে বললেন- সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমজান মাস পেয়েছে অথচ তার গুনাহ মাফ হয়নি। আমি বললাম, আমিন (আল্লাহ কবুল করুন)। আমি দ্বিতীয় ধাপে আরোহণ করলে তিনি (জিবরাঈল আঃ) বললেন, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলো অথচ সে দরুদ পড়ল না। আমি বললাম, আমিন। আমি মিম্বরের তৃতীয় ধাপে আরোহণ করলে জিবরাঈল (আঃ) বললেন, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে বাবা-মা উভয়কে অথবা তাদের কোনো একজনকে পেল, কিন্তু তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাল না। আমি বললাম, আমিন।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসরা বলেছেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষ দ্রুত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। শরীর ক্রমাগত শক্তিহীন ও দুর্বল হতে থাকে। কর্মদক্ষতাও হারিয়ে ফেলে; চলাফেরা করার ক্ষমতা থাকে না। দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব তাদের গ্রাস করে ফেলে। ফলে তারা সন্তান-সন্ততির ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অপরদিকে বার্ধক্যের চাপে ও চতুর্মুখী রোগ যাতনায় তাদের মেজাজ খিটখিটে, কথাবার্তা কর্কশ, আচার-আচরণ রূঢ় হয়ে যায়। এ সময়টা হয় মানুষের জন্য চরম দুর্দিন।
এই কঠিন মুহূর্তে বাবা-মা যে সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট হন আল্লাহতায়ালাও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য জান্নাতের ফয়সালা করে দেন।
পক্ষান্তরে যে সন্তান বাবা-মার কষ্ট ও তার প্রতি তাদের অবদানকে ভুলে যায় এবং এ অসহায় অবস্থায় সেবা-যতœ করার পরিবর্তে তাদের অবাধ্য হয়ে মনে কষ্ট দেয়, আল্লাহতায়ালা তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও রাগানি¦ত হয়ে তার জন্য জাহান্নামের ফয়সালা করে দেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উম্মতের প্রতি অত্যন্ত রহমদিল ছিলেন। উম্মতের শাস্তির কথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন। উম্মতের ইহ ও পরকালীন সুখ-শান্তি এবং কল্যাণ সাধন করাই ছিল তাঁর নবুয়তি জীবনের মিশন। তা সত্ত্বেও বাবা-মার অবাধ্য এবং তাদের মনে কষ্ট দানকারী সন্তানের ধ্বংসের জন্য তিনি বদদোয়া করেছেন। কাজেই তাদের ধ্বংস অনিবার্য।
তবে যদি তারা তওবা করে এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করে বাবা-মার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়; তাদের সেবা-যতেœ আÍনিয়োগ করে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করে; আর বাবা-মা মারা গেলে নিজেদের কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করে, বাবা-মার জন্য দোয়া ও দান-সদকা করতে থাকে এবং বাবা-মার পক্ষের আÍীয়-স্বজনের সঙ্গে ও বাবা-মার বন্ধু মহলের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে থাকে, তাহলে আশা করা যায়, তারা অনিবার্য ধ্বংস থেকে রেহাই পাবে।
এক হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যখন কোনো সন্তান নিজের বাবা-মার প্রতি অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকায় আল্লাহতায়ালা তার প্রতি দৃষ্টির বিনিময়ে তার আমলনামায় একটি কবুল হজের সওয়াব লিপিবদ্ধ করেন। সাহাবায়ে-কেরাম (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি সে দৈনিক একশ’বার তাকায়? উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, তারও বিনিময়ে একশ’ হজের সওয়াব দেওয়া হবে।
প্রায়ই দেখা যায় অনেক সন্তান তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে প্রবীণ নিবাস কেন্দ্রে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে। অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। বৃদ্ধ বা অসুস্থ বাবাদের পরিবারের বোঝা মনে করা হচ্ছে। এসব দৃষ্টিভঙ্গি ইসলাম সমর্থন করে না। তাই শুধু দিনসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতায় নয়; মনে-প্রাণে বাবা-মাকে আমাদের সর্বদাই শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখতে হবে। তাদের সঙ্গে ভালোবাসাপূর্ণ উত্তম আচরণ করতে হবে। শৈশবে বাবা সন্তানের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছেন; এই বৃদ্ধ বয়সে তাদের সঙ্গে ঠিক তেমন আচরণ করতে হবে। এটিই হোক এবারের বাবা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার।