আখেরি নবীর আখেরি ভাষণ

61

gourbangla logo

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার দুই মাস আগে পবিত্র কোরআনের ‘সূরা নসর’ নাজিল হয়। এতে বলা হয়, ”যখন আসিবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করিতে দেখিবে, তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিও এবং তাহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিও- তো তিনি তওবা কবুলকারী। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে শেষ রমযান মোবারক ছিল হিজরি দশম সন। সেবার তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করলেন। ইতঃপূর্বে প্রতিবছর মাত্র ১০ দিনের ইতিকাফ করতেন। প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে তার কারণ বললেন- আমার সময় নিকটবর্তী মনে হচ্ছে। ১২ সফর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ উপত্যকায় গেলেন। শহীদদের কবরস্থানে সালাত আদায় করলেন। ফেরার পথে মিম্বরে আরোহণ করে খিতাব করলেন : হে জনতা, আমি তোমাদের আগে গমনকারী এবং সাক্ষ্য প্রদানকারী। আল্লাহর শপথ, আমি এখান থেকে হাউস দেখতে পাচ্ছি। আমাকে রাজ্যসমূহের খাজাঞ্চিখানার চাবি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার অবর্তমানে তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে- এ ভয় করি না। কিন্তু আশঙ্কা করছি তোমরা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করবে। অতঃপর তিনি জান্নাতুল বাকিতে গভীর রাতে গমন করলেন, দোয়া করলেন এবং বললেন, নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব। অতঃপর একদিন মুসলমানদের একত্র করার হুকুম দিলেন। তিনি বললেন- মারহাবা মুসলমান! আল্লাহ আমাদের রহমতের মধ্যে রাখুন! তোমাদের নিরুৎসাহিতা দূর করুন। তোমাদের রিজিক দান করুন। তোমাদের মদদ করুন। তোমাদের উন্নত করুন। তোমাদের নিরাপদ রাখুন। আমি তোমাদের আল্লাহ-ভীতির অসিয়ত করছি। আল্লাহর হাতে তোমাদের সোপর্দ করছি এবং তাঁরই ভয় তোমাদের দেখাচ্ছি। কেননা আমি সুস্পষ্ট ভয় প্রদর্শনকারী। সাবধান, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর জনপদের মধ্যে তোমরা কোনোরূপ অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করো না। আল্লাহতায়ালা আমাকে ও তোমাদের বলেছেন :
‘এটা আখিরাতের গৃহ, আমি তাদের দান করি যাঁরা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্ব আকাক্সক্ষা করে না এবং ফ্যাসাদও সৃষ্টি করে না। আর উৎকৃষ্ট পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য।’ অতঃপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন- ‘অহংকারীদের স্থান কি জাহান্নাম নয়?’
পরিশেষে বললেন : সালাম তোমাদের সবারই ওপর এবং তাদের ওপরও যাঁরা ইসলামের মাধ্যমে আমার বায়াতে শামিল হবে। বিদায়ের পাঁচ দিন আগে তিনি সাত কুয়ার সাত মশক পানি মাথায় দেয়ালেন। কিঞ্চিৎ সুস্থ হলে মসজিদে উপস্থিত হয়ে বললেন- ‘তোমাদের আগে এক কওম আম্বিয়া এবং নেক ব্যক্তিদের কবরস্থানকে সিজদার স্থান বানিয়েছিল। তোমরা অনুরূপ করো না। এসব ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ, যাঁরা আম্বিয়ার কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছে। আমার পর আমার কবরকে যেন এরূপ পূজার স্থান বানানো না হয়। অসুস্থতার তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে নামাজের ইমামতি করা খুব কঠিন হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রা.) কে ইমামতি করার নির্দেশ দিলেন। তিনি আলী (রা.) এবং ফজল (রা.)-এর কাঁধে ভর দিয়ে হুজরা থেকে বের হলেন। আব্বাস (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগে চলছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা বেদনাক্রান্ত ছিল। মাথায় বাঁধা ছিল পট্টি। শরীর খুবই দুর্বল ছিল। পা টেনে টেনে চলছিলেন। তিনি মসজিদের মিম্বরের কাছে পৌঁছলেন এবং মিম্বরের নিচের তাকে বসলেন। অপেক্ষমাণ মুসল্লি প্রিয় নবীকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামদ ও সানা পাঠ করার পর বললেন- আমি জানতে পেরেছি যে, তোমরা তোমাদের নবীর মৃত্যু সম্পর্কে খুবই শঙ্কিত। আমার আগে প্রেরিত আল্লাহর কোনো নবি কি সর্বদা দুনিয়ায় অবস্থান করেছেন যে, আমিও সর্বদা অবস্থান করব?
সাবধান! আমিও আমার প্রভুর কাছে গমনকারী এবং তোমরাও তাঁর কাছে গমনকারী। আমি তোমাদের প্রথম যুগের মুহাজিরদের কল্যাণ সম্পর্কে অসিয়ত করছি। পারস্পরিক সুআচরণের জন্য আমি মুহাজিরদেরও নসিয়ত করছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- সময়ের শপথ। মানুষ অবশ্যই লোকসানের মধ্যে রয়েছে, একমাত্র তারা ছাড়া, যাঁরা ইমান আনে, সৎকর্ম করে এবং পরস্পর পরস্পরকে হক ও সবরের অসিয়ত করে।
তামাম বিষয় আল্লাহর অনুমতি মোতাবিকই সম্পন্ন হয়। যদি কোনো বিষয় সংঘটিত হতে বিলম্বিত হয় তা হলে ব্যস্ততা করো না। কারও ব্যস্ততার কারণে আল্লাহ ব্যস্ততা করেন না। যে আল্লাহর মোকাবিলায় বিজয় হাসিল করতে চায় আল্লাহ তার ওপর বিজয়ী হয়ে যান। যে আল্লাহকে প্রতারণা করে সে স্বয়ং প্রতারণার শিকার হয়। ক্ষমতা হাতে পেলে তোমরা জমিনে ফিতনা সৃষ্টি করো না এবং রিসতাদারদের সঙ্গে মন্দ আচরণ করো না। আমি তোমাদের আনসারদের ব্যাপারে কল্যাণের উপদেশ প্রদান করছি। তারা তোমাদের আগে ইমান গ্রহণ করেছে এবং হিজরতের জন্য স্থান দিয়েছে। তাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ কর। তারা কি তোমাদের তাদের ফসলে সমান অধিকার প্রদান করেনি? তারা কি তাদের নিজেদের গৃহ তোমাদের জন্য প্রশস্ত করে দেয়নি? নিজেরা অভাবের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও কি তারা তোমাদের অগ্রাধিকার দেয়নি? তোমাদের মধ্যে যে-ই আমির মনোনীত হোক না কেন এবং দুজনের মধ্যে ফয়সালা করুক না কেন, সে যেন আনসারদের ভালো লোকদের কথা মেনে নেয় এবং তাদের মন্দ লোকদের মাফ করে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা এবং নির্যাতনমূলক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করো না। তারা আমার শরীরের ভূষণ। তারা তাদের কর্তব্য পূরণ করেছে। এখন তাদের অধিকার বাকি রয়েছে। আমি তোমাদের মীরে মনজিল। আমি তোমাদের আগমনের সামান প্রস্তুতকারী। তোমরা আমার সঙ্গে সেখানে মুলাকাতকারী। আমার সঙ্গে তোমাদের মুলাকাতের স্থান হলো হাউস। আমার সঙ্গে সেখানে যে সাক্ষাৎ করতে চায় সে যেন তার হাত ও জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বললেন : এক বান্দার সামনে দুনিয়া এবং দুনিয়ার যাবতীয় বস্তু পেশ করা হয়েছে কিন্তু তিনি আখিরাতকে বেছে নিয়েছেন। আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
লেখক : ইসলামি গবেষক।