এক চিলতে রোদ

gourbangla logo

মাঘ মাস। কনকনে শীত। শীতের তীব্রতায় কাঁপছে মানুষ, হাঁস-মুরগী, গরু, ছাগল ইত্যাদি সকল প্রাণী। বিশেষ করে ছোট ছোট শিশু আর বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এখন ঠা-ায় কাতর অবস্থা। সকালের হাড় কাঁপানো ঠা-া উপেক্ষা করে ছোট ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া যে কী কষ্টের তা শুধু শিশু ও তাদের বাবা-মাই জানেন। লেপের ভেতর থেকে শুরু হয় কান্না। আমি স্কুলে যাব না। না আমি স্কুলে যাব না। তারপরও জোর করে বিছানা থেকে টেনে মা তার শিশুকে তৈরী করে স্কুলে নিয়ে যায়। বাইরে বের হয়ে যখন এক ঝলক রোদ তার গায়ে লাগে তখন রোদের মতই সেই শিশু তার মায়ের দিকে চায় আর খলখলিয়ে হাসে। মনে হয় যেন এক চিলতে রোদের ছোঁয়া শিশুর গায়ে এক চিলতে হাসির ঝিলিক দিয়ে যায়। এই শীতে গ্রামের বাড়িতে কত মানুষ যে কত রকমের পিঠা বানায় আর বাইরে উঠোনে বসে সবাই মিলে উপভোগ করে তা খুবই উপভোগ্য এবং মজার। রোদের ফাঁকে ফাঁকে মুচকি হাসির ঝলক আমার আজও মনে পড়ে সেই ছোট কালের পিঠা খাওয়ার বেলা। আমরা বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই মিলে একসাথে বসে সেই সকাল বেলা রোদের ফাঁকে সকালের হাসিমাখা মুখগুলো যেন আমার প্রাণে আজও বাঁশি বাজিয়ে যায়। শহরের অনেক বাসায় যদিও পিঠা তৈরী হয় কিন্তু গ্রামের বাড়ির মত এত আনন্দঘন পরিবেশে পিঠা উপভোগ সত্যিই বিরল। সেই সাথে মুড়িমাখা খেজুরের রস। ঠা-ায় গা কাঁপে ঠকঠক কিন্তু সেই এক চিলতে রোদ যেন অমৃতের স্বাদ।
২.
সুকান্তের সেই কবিতার লাইন কে-না জানে-

‘সকালের এক টুকরো রোদ
এক টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামী।’

প্রকৃতির সবকিছু যখন শীতের কম্পনে জবুথবু, সবকিছু যখন মাথা লুকায় তার আপন ঘরের ভেতর তখন একমাত্র সেই দীবাকরই প্রকৃতির সবকিছুকে বের করে নিয়ে আসে বাইরের জগতে। মানুষ এবং সকল প্রাণী খুঁজে নেয় তার আশ্রয় সেই রোদের ভেতর। একচিলতে রোদ যেন মহা আনন্দের ঢেউ বয়ে আনে আমাদের সকলের প্রাণে। হে সূর্য, তুমি এক মহা সৃষ্টি এই জগতের মাঝে। তুমি দিবসের প্রথম প্রভা, উষ্ণতার পালক ছড়িয়ে দাও এই বিশ্ব মাঝারে। আমাদের রাত যেন ভোর হয় না তোমার অনুদয়ে। গভীর কুয়াশায় যখন রোদ ফোটে না, চারদিক আঁধারে অষ্ফুট থাকে, কত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে পথে পথে, কত মানুষের প্রাণ যায় অকাতরে। ঘরে বাইরে আমাদের কাজের গতি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধার হাড় যেন ঠকঠক কাঁপে। কিছুতেই চায় না যেতে ঘরের বাইরে। একচিলতে রোদ যখন উঁকি মারে আকাশে, বৃদ্ধা আঁচল পেতে দেয় তার সেই সূর্যের কাছে। মনে হয় কত দিনের পাওনা আদায় করে নেয় কড়ায় গ-ায়। গরীব-বড়লোক বলে কথা নেই এই শীতের ঠা-ায় এখন আগের মত যেমন আর কষ্ট পেতে হয় না ঠিক তেমনই এর মজাও কিন্তু আগের মত আর নেই। মহাজাগতিক কিছু বিষয় থাকে তা কেবল প্রকৃতির কাছেই প্রাপ্য। এখন সব কিছুই হয়ে পড়েছে যান্ত্রিক এবং কৃত্রিম। প্রকৃতির কাছে আমরা আর সেই দিন খুঁজি না বা খুঁজার চেষ্টাও অতটা করি না। দিব্যলোকের দিব্য দৃষ্টি অত সহজ নয় । এ এক মহা সাধনার ধন। কত সাধনায় যে এ শক্তি মানুষের মেলে তার হিসাব শুধু গণিতের ভাষায় মেলে না। সৃষ্টি, সৃষ্টিত্বত্ত এবং সৃষ্টিকর্তার মাঝে এক মহা মিলনের নামই হচ্ছে দিব্যদৃষ্টি যা একচিলতে রোদের মত এক অন্যরকম আমেজ বয়ে আনে সমস্ত শরীর, মন ও প্রাণে। কাঁপতে কাঁপতে বৃদ্ধার মনে পড়ে যায় সেই মহামানবের কথা। আর ক দিনই বা পৃথিবীতে সে আছে। রোদের মাঝে সে জিকির করে আল্লাহ, আল্লাহ। ওধারের ঐ বৃদ্ধা বলে রাম, রাম। ও গড, গড। এভাবেই কেটে যায় মধুর সকাল।

৩.
এত গেল শীতের বাস্তব অবস্থা। এই শীত আবার আমাদের জীবনে বয়ে আনে নানা দুঃখ-কষ্টের উপমা। জীবনে অনেক সময় আমরা আমাদের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যর্থতাই পর্যবসিত হই। নানা দিক থেকে আমাদের উপর নানা রকম দৈব-দুর্বিপাক আসতে থাকে। আমরা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসি আমাদের আপন ঘরে। যেমন ধরুন এই যখন ভোটের সময় আমরা দেখি ভোটের ফলাফল হবার পর যে সকল প্রার্থী ভোটে হেরে যান তারা ঠা-ায় কাতর হয়ে পড়েন এবং আপন গৃহে লেপের নিচে শরীরটা গরম করে নেন। আবার হঠাৎ কারো কারো শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ওঠা-নামা করতে শুরু করলে দেখা যায় শরীর ঠা-া হয়ে আসে। হাত পা অবস হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় শরীরে তাড়াতাড়ি করে গরম কাপড় পরানো হয়। আবার হঠাৎ কারো কোন দুর্ঘটনার খবর কানে এলে দেখা যায় শরীর আস্তে আস্তে ঠা-া হয়ে আসে। শরীরে প্রচ- শীত অনুভব হয়। বড় একটা নার্ভাস অবস্থার সৃষ্টি হয়। সেই সময় উক্ত ব্যক্তিকে গরম পোশাক পরিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। কোন দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন এক উৎসাহ-উদ্দীপনা যা আমাদের জীবনে এক শরীরিক এবং মানসিক টনিক হিসেবে কাজ করে এবং যা আমাদের শরীরকে প্রচ- ঠা-ার হাত থেকে রক্ষা করে। তখন যেন মনে হয় এক চিলতে রোদ সেই শরীরে বয়ে যায়। তাই এহেন বিপদাপন্ন অবস্থায় একজন মানুষের জন্য তার পাশে বসে তাকে উৎসাহ উদ্দীপনা তার জন্য অনেক বড় কাজে আসে। চিকিৎসার চেয়ে বড় হচ্ছে একজন মানুষকে বিপদে পড়লে তাকে মানসিক সার্পোট দেয়া। আমাদের বাঙালি সমাজে কোন মানুষ বিপদে পড়লে আমরা তাকে আরও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকি এবং পরিশেষে সে জীবনাবসনের পথ বেছে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে আমরা জেনে শুনে এ কাজগুলি করে থাকি যা মানুষ হিসাব কখনোই আমাদের কাম্য নয়। কারো দুঃখে, বিপদে, অসহায়ত্বে এগিয়ে এসে তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে একজন প্রকৃত মানুষের কাজ। আমরা সকলে সকলের বিপদে এগিয়ে আসবো, যথাযথ সহায়তা দেবো, তাহলেই মাঘ মাসের এই শীতের সকালে এক চিলতে রোদ ছড়াবে মানুষের উঠোনে উঠোনে।
৪.
প্রেম ভালবাসা একটি মানুষের জীবনে এক পরম পাওয়া। এটা ছাড়া মানুষ কোন মতেই মানুষ থাকতে পারে না। অসহায় পশুর মতো হয়ে পড়ে। তার কাছে জীবনের সকল স্বাদ বিস্বাদে পরিণত হয়। কোন ভালবাসার মানুষ যদি জীবন থেকে হারিয়ে যায় অথবা সে ভালবাসা অস্বীকার করে চলে যায় তাহলে সেই ভালবাসার আত্মা হারায় তার গন্তব্য। আর কেউ খুঁজে পায় না। একটু একটু করে ভালবাসার আত্মা গড়ে তোলে এক বিরাট প্রাসাদ। সেই প্রাসাদে বাস করে এক স্বর্গীয় সুখ পাখি। সেই প্রাসাদ ছেড়ে যখন উড়ে যায় পাখি তখন প্রাসাদ হয়ে পড়ে শূন্য এক খাঁচা। সেখানে জীবন পায়না খুঁজে তার সামনে চলার পথ। ভেঙ্গে যায় মন এবং মানসিকতা। কোন কিছুই তখন আর ভাল লাগে না। সেই ভেঙ্গে যাওয়া আত্মাকে ফিরে পেতে কত কাঠ খড়িই না পোড়াতে হয়। তারপরও দেখা যায় জীবনে যে শীত নেমে আসে তা আর কোন দিন ঘুচে না। তাই ভালবাসার বন্ধন আমাদের জীবনে এক চিলতে রোদের মত যুগে যুগে কালে কালে উষ্ণতার পালক হয়ে আমাদের বেঁধে রাখে। বহুদুর থেকে একফোঁটা জল কে যেন ফেলে যায় আমার চোখে। আর সেই অশ্রু তখন বেগ নেয় জলের ¯্রােতে। জীবন ভেসে চলে অশ্রুধারায়। হঠাৎ পাশে বসে কে যেন আমার পিঠে হাত বুলায়। মনে হয় শীতের সকালে এক চিলতে রোদ আমার সারা শরীরে বিদ্যুৎ চমকিয়ে যায়।