একাত্তরের স্মৃতি

gourbangla logo

দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয় অর্জন করে বাঙালি জাতি। ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রম আর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।
৭১ এর ২৫ মার্চের কালরাত। পাকহানাদার বাহিনী অতর্কিতে ঢাকাসহ সারা দেশে ইতিহাসের সব চেয়ে বরবরচিত হামলা চালায় নিরিহ নিরস্ত্র বাঙালি জাতির উপর। পাকহানাদার বাহিনী এ দেশীয় তাদের দোষরদের সহযোগিতায় গণহত্যায় মেতে ওঠে। শুরু হয় পাকহানাদার বাহিনীর সাথে বাঙালির মুক্তি যুদ্ধ। দেশ মাতৃকার টানে যোগ দিই মুক্তিযুদ্ধে। আমার জীবনে ৯ মাস যুদ্ধের সব চেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হচ্ছে-বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমানের শহীদ হওয়া। এ ছাড়া আমি কাছ থেকে দেখেছি বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের বীরত্ব।
বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর তখন পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ৭১-এর এপ্রিল মাসে একবার তিনি ছুটি পান। ছুটি পেয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর বোনের বাসায় ওঠেন। সেখানে বসে বাংলাদেশে গণহত্যা ও নারী ধর্ষণের ভয়াবহ অবস্থার কথা ভয়েস অব আমেরিকা ও বিবিসি রেডিওর মাধ্যমে জানতে পারেন। দেশের জন্য বিচলিত হয়ে পড়েন তিনি। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে যাবার জন্য পালাবার পথ খঁজতে থাকেন। এমন সময় আরও ৩ জন বাঙালি সেনা কর্মকর্তার খোঁজ পান। তাঁরাও সেখান থেকে পালিয়ে আসার জন্য পথ খুঁজছিলেন। তাঁরা হলেন সেই সময়ের ক্যাপ্টেন আনম, শহীদ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন (বীর উত্তম), মেজর (অব) শাহরিয়ার। দীর্ঘ ৩ মাস সময় লাগে তাঁদের একত্রিত হতে। জুলাই মাসের ৩ তারিখ বাংলা মায়ের এই ৪ বীর সন্তান একত্রিত হয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাড়ি জমান ভারতের উদ্দেশে। দেশ মাতৃকার টানে তাঁরা বহু কষ্টে রাতের অন্ধকারে বৃষ্টিতে ভিজে খরস্রোতা তাবি নদী পার হয়ে প্রথমে দিল্লী, পরে কোলকাতায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী রণক্ষেত্র থেকে কোলকাতায় এসে তাঁদের অভ্যার্থনা জানান। এখান থেকেই আলাদা হয়ে যান তাঁরা। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দায়িত্ব পেয়ে ৭ নং সেক্টরের মহদিপুরে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে যোগদান করেন। ৩ নং সাব সেক্টরের দায়িত্ব প্রদান করা হয় তাঁর উপর। এর পর শুধুই এগিয়ে যাবার পালা।
তদানিন্তন রাজশাহী জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমা শহর দখলের জন্য লে. কর্ণেল কাজী নূরুজ্জামান ৩ টি দল গঠন করেন। প্রথম দলের দায়িত্ব দেন ক্যাপ্টেন (ব্রিগেডিয়ার অব.) গিয়াস উদ্দিনের উপর, দ্বিতীয় দলের দায়িত্ব দেন মেজর (লে. কর্ণেল অব.) রশিদ এর উপর এবং তৃতীয় দলের দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। নির্দেশ অনুযায়ি ক্যাপ্টেন গিয়াস চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার হরিপুর-দ্বায়রাপুর, রাজারামপুর এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে রাজশাহীর সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। মেজর রশিদ উত্তর দিক থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। ৭১-এর ১২ থেকে ১৩ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর পশ্চিম দিক দিয়ে লে. কাইয়ুম, লে. আওয়ালসহ ২ শ’ জন মুক্তি সেনা নিয়ে এগিয়ে আসেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর বারঘরিয়া এলকার আকন্দবাড়িয়া ফেরী ঘাট দিয়ে মহানন্দা নদী পার হয়ে পৌর এলাকার মহোনপুরে অবস্থান নেন। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ছিলেন অসীম সাহসী, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এক সেনা কর্মকর্তা। বাঙালি নিধন আর মা বোনের সম্ভ্রম হানী তাঁকে যুদ্ধ জয়ে আরো দৃঢ় করে তুলেছিল। ১৪ ডিসেম্বর সূর্য ওঠার আগেই শুরু করলেন অভিযান। অস্ত্র হাতে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার মহোনপুর থেকে টিকরামপুর এলাকার মহানন্দা নদীতীর হয়ে বীর বিক্রমে এগিয়ে চলেছেন। পেছনে তাঁর মুক্তি সেনার দল। দখল করছেন একের পর এক শত্রুর ঘাঁটি। লক্ষ্য একটাই, আজকের মধ্যেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ শত্রু মুক্ত করতে হবে। সকাল ৯টার দিকে তিনি বর্তমান মহানন্দা সেতু সংলগ্ন রেহাইচর এলাকয় পৌঁছে যান। কিছুক্ষণের মধ্যে মুক্ত হবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। দলবল নিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। শেষ বাঙ্কারটিও ধংস করে ফেলেন। এমন সময় শত্রুর একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় তাঁর কপালে। মূহুর্তের মধ্যে তিনি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন বাংলা মায়ের বীর সন্তান ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে মুক্তি বাহিনীর অভিযান আরও তীব্র হয়। মরণপণ যুদ্ধ করে মুক্ত করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর। ১৫ ডিসেম্বর লাশ উদ্ধার করার সময় শত্রুর সেলে পাবনার মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব শহীদহন এবং সন্দুরপরের নেফাজ গুরুতর আহত হন।
ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ১৯৪৯ সালে বরিশালের রহিমগঞ্জে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে মুলাদী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এবং ১৯৬২ সালে মুলাদী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্ট পুলে জুনিয়ার বৃত্তি লাভ করেন। একই বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে গণিতে লেটার মার্কসহ এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আবারো গণিতে লেটার মার্কসহ এইচ.এসসি পাস করেন। এর পর তিনি ৬৭ সালে পরিসংখ্যানে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সর্ট সার্ভিস কমিশনে যোগদান করেন।
আমার সেই সময়ের স্মৃতি গুলোর মধ্যে আমার ঘনিষ্ট বন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমানের শহীদ হওয়া। আমার মনে পড়ে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার উপজিরপুর ইউনিয়নে বহু মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ক্যাম্প স্থাপিত হয়। আমি সেই ক্যাম্পের সেকশন কমান্ডার ছিলাম। আমার নেতৃত্বে ১০/১১ জন মুক্তিযোদ্ধা মোল্লাটোলা, চকবহরম, দোরশিয়া, পাগলা নদীর পশ্চিম পাড় এলাকায় আমরা টহল দিতাম। মোল্লাটোলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ছিল আমাদের ট্রুপের ক্যাম্প। এই ইউনিয়নের গঙ্গাধরপুর গ্রামের মরহুম সায়েদ আলীর ছেলে হাবিবুর রহমান আমার বাল্যবন্ধু এবং যুদ্ধের ময়দানে একজন লড়াকু সৈনিক। আমরা দুইজন একসাথে একই ক্যাম্পে যুদ্ধ করেছি।
১৯৭১ সালের ৯ অক্টোবর প্রত্যুষে আমাদের ক্যাম্পের পেছন দিক থেকে প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে গোলাগুলির স্থান ট্রেস করার চেষ্ট করি। একপর্যায়ে সেই আওয়াজ লক্ষ্য করে এগুতে থাকি। আমি মোফাজ্জল, তাজেমুল আর আমার বাল্যবন্ধু হাবিবুর। আনুমানিক ১৫-২০ মিনিট হাঁটার পর গোলাগুলির সেই পয়েন্টটির কাছাকাছি এসে পৌছায় পদ্মা নদীর তীরবর্তী দূর্গম চরাঞ্চল উজিরপুর ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরপাড়া মিনটোলা গ্রামে।
ঘটনাস্থলে পৌছে দেখি উজিরপুর দাঁড়া’র পাড় আর পাগলা নদীর পূর্ব পাড়ে পাকহানাদার বাহিনী আর তাদের দোষর রাজকার-আলবদর’রা শক্ত ঘাঁটিতে অবস্থান করছে। সেখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে প্রচষ্ট গুলি বর্ষণ করছে। আমরা জাহাঙ্গীরপাড়া গ্রামের শেষ প্রান্তে অবস্থান নিই। কিছুটা দূরে দক্ষিণ দিকে সুন্দরপুর আঠারোকলাম ঘাট এলাকায় মেজর গিয়াসের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ যুদ্ধ চলছে। এসময় উত্তরের রাধাকান্তপুরের দিকে ইসমাইলও আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে একটি একটি ট্রুপ ঘটনাস্থলে এসে আমাদের সাথে মিলিত হয়। এরপর আমরা পাকহানাদার বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমন শুরু করি। কয়েকঘন্টা এভাবে চলার পর সকাল ৮টার দিকে আমি মোফাজ্জল, তাজেমুল আর হাবিবুর ফায়ারিং বন্ধ করে দিই। কারণ, উভয় পক্ষের দূরত্ব এতো বেশি ছিল যে, আমরা শত্রুকে আঘাত করতে পারছিলাম না। কিন্তু মনের মধ্যে কেমন জানি করছিল। গ্রামের শেষ দিকে একটি ছাউনি ঘর রয়েছে সেই ঘরের পর থেকে খোলা মাঠ। ওই ঘরটি থেকে ২০ গজ এগিয়ে যেতে পারলেই আমরা তাদের প্রতিহত করতে পারবো। এসময় আমরা পরামর্শ করলাম যেকোন একজনকে ২০ গজ ক্রলিং করে যেতে হবে। প্রথমে আমি সেখানে যেতে চাই পরে তাজেমুল। কিন্তু হাবিবুর হাবিবুর ছিল দু:সাহসী। সে আমাদের যেতে না দিয়ে নিজেই ক্লোরিং করে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে যায়। সেখানে পৌঁছে ফায়ার করার জন্য দাঁড়াতেই শত্রু একটি বুলেট তার বাম কানের নিচ দিয়ে ঢুকে ডান কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। হাবিবুর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এসময় তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। একপর্যায়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা ক্রলিং করে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। পরে স্থানীয় গ্রামবাসীর সহায়তায় মোফাজ্জল ও অন্য দুই জন মুক্তিযোদ্ধা খাটিয়াতে করে প্রথমে ভারতের জঙ্গীপুর হাসপাতাল ও পরে বহরমপুর হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু পদ্মা নদী ও দূর্গম চরাঞ্চল পার করে নিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যায়। তবে ভাগ্যক্রমে তখনও হাবিবুর জীবিত ছিল। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শহীদ হয় আমার সব থেকে ঘনিষ্ট বন্ধু ও অকুতোভয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান। পরে স্থানীয় জনগণের সহযোগীতায় তাঁকে পার্শ্ববর্তী সেখানকার একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সেই দিনের সম্মূখ যুদ্ধে রাজাকার, আলবদর ও পাকবাহিনীর প্রচন্ড ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। বাধ্য হয়ে সন্ধ্যার আগে তারা পিছু হটে পালিয়ে যায়। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি ৯ অক্টোবরের সেই যুদ্ধে ১০/১২ জন রাজাকার-আলবদর ও ৬ জন পাক সৈন্য মারা যায়। আমাদের কোন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান। আমরা হারাই একজন বিশ্বস্ত এবং সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুরের বাড়ী পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে আজ তার পরিবার গৃহহীন। তাঁর প্রতিবন্ধী এক বোন অভাবের সংসারে বোঝা হয়ে থেকে দেড় বছর আগে মারা গেছে। তবে তার দুই ভাই এখনও জীবন যুদ্ধে প্রতিনিয়িত সংগ্রাম করে চলেছেন।
হাবিবুর ৭১’র এর মে মাসে ভারতের এনায়েতপুর ইয়ুথ ক্যাম্প ও পরে মালদহ জেলার অদূরে গৌড়বাগান ইয়ুথ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে সেখান থেকে শিলিগুড়ির নিকটবর্তী পানিঘাটা মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষ করে। সফলভাবে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শেষে সে ৭ নং সেক্টরের মোহদিপুর সাব-সেক্টরের কানসাটের নিকটবর্তী কলাবাড়ি প্রতিরক্ষা অবস্থানে যোগদান করে। সেসময় আমাদের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। তিনিই হাবিবুরকে সেখান থেকে উজিরপুর ইউনিয়নে অবস্থিত আমাদের ক্যাম্পে প্রেরণ করেন।
এই মুহূর্ত্তে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা মনে পড়ছে। সুযোগ পেলে অন্য সময় বলবো।