বিদায় বেলায় কাঁদলেন, কাঁদালেন রেডিও মহানন্দা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বন্ধু এরিকো আন্দো

128

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বন্ধু এরিকো আন্দোঅশ্রুসীক্ত নয়নে চলে গেলেন, রেডিও মহানন্দায় কর্মরত জাইকা স্বেচ্ছাসেবক এরিকো আন্দো। তিনি মঙ্গলবার ঢাকার উদ্দেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়েন সকাল সাড়ে ৭ টা’য়। ঢাকায় ফিরে ঐদিনই বিকেলে তাঁর কথা হয় গৌড় বাংলার সাথে। এসময় তিনি বলেন, বিদায় বেলায় আমার কষ্ট হচ্ছিল, তবে খুশিও ছিলাম। কারণ, রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও’কে হত্যার পর ঢাকায় চলে এসেছিলাম এবং প্রায় দুই মাস পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফিরেছিলাম, তাই রেডিও মহানন্দার বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ায় আমি খুশি, কিন্তু বিদায় নিচ্ছি তাই কষ্টও হচ্ছিল। বাংলাদেশে আসা ও রেডিও মহান্দায় কাজ করার স্মৃতিগুলো গৌড় বাংলার পক্ষ থেকে জানতে চাইলে, এরিকো বলেন – আমি বাংলাদেশে আসাার আগে জাপানে একটি টেলিভিশনে সংবাদিকতা করতাম। এখানে আসার কারণ হচ্ছে রেডিও মহানন্দা বা বাংলাদেশে নতুন প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি রেডিও’র কর্মীদেরকে দক্ষতা অর্জনে সাহায়তা করার জন্য, জাপান সম্পর্কে আপনাদের জানাতে এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে। তিনি জানান, আমি রেডিও মহানন্দায় ২০১৪ সালের মার্চ মাসের ৫ তারিখে যোগদান করি আর বাংলাদেশে আসি ফেব্রুয়ারীর ৫ তারিখ। আমি রেডিও মহানন্দায় শাপলা সাকুরা নামে একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেছি। যে প্রোগ্রামটি তৈরিতে রেডিও মহানন্দার সকল কর্মী আমাকে খুব সহযোগীতা করেছে। আন্দো জানান, জাপান ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা ও জাপানের জাতীয় ফুল সাকুরার নাম দিয়ে আমার অনুষ্ঠানের নাম দিয়েছিলাম “শাপলা-সাকুরা”। তিনি আরও জানান আমি রেডিও মহানন্দায় যত দিন ছিলাম ততদিন এটিকে আমার পরিবার মনে হত। আমি যখন জাপান থেকে বাংলাদেশে আসি তখন পরিবারকে ছেড়ে আসতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। এখানে আসার পর আমি একটা পরিবার ফিরে পেয়েছিলাম। আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চলে এসেছি ঢাকায়, জাপান ফিরে যাবো ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ তারপরও আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমি বলতে চাই বাংলাদেশের মানুষ অনেক সহজ সরল বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ অনেক ভালো, অনেক ভালোবাসা আমাকে দিয়েছে। আমি জাপান গিয়ে বিয়ে করবো এবং আগামীতে আমার স্বামীসহ আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘুরতে আসবো এবং আম খেতে আসবো। সর্বপোরি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুন্দর মনের মানুষগুলোকে আবার দেখতে আসবো।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের একমাত্র ইলেকট্রনিক গণ-মাধ্যম কমিউনিটি রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএমে জাইকার প্রতিনিধি হয়ে প্রায় দুই বছরের কাজ শেষে মঙ্গলবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছেড়েছেন মহানন্দার বন্ধু এরিকো আন্দো। এসময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইউসুকি ইউসিমুরা, প্রোগ্রাম অফিসার, জাপান ওভারসিজ কো-অপারেশনস ভোলিন্টিয়ার প্রোগ্রাম, জাইকা। প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি কর্তৃপক্ষকে ইউসুকি ইউসিমুরা জানিয়েছেন- নিরাপত্তা জনিত কারণেই তিনি আগেভাগেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছেড়ে গেলেন। ইউসুকি আরও জানিয়েছেন রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও’কে হত্যার পূর্বে বাংলাদেশে ৮২ জন জাপানি ভোলান্টিয়ার কাজ করতো। ঐ হত্যাকান্ডের পরপর ৭৫ জন ভোলান্টিয়ার জাপান চলে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ভালোবাসার টানে এরিকো আন্দোসহ এখনও ৭ জন স্বেচ্ছাসেবক রয়ে গেছেন এদেশে।
অন্যদিকে এরিকো আন্দোর বাংলাদেশে আসা এবং রেডিও মহানন্দায় প্রায় দুই বছর কাজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে, রেডিওটির স্টেশন ম্যানেজার আলেয়া ফেরদৌস স্মৃতি কাতর হয়ে বলেন, রেডিও মহানন্দার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাইকার কাছে ন্বেচ্ছাসেবক চেয়ে একটা আবেদন করেছিলেন। এর প্রেক্ষিতে আমরা জানতে পারি আমাদের এখানে একজন জাপানী আসবেন, কিন্তু আমরা তখনও জানতাম না যে যিনি আসবেন তিনি মেয়ে না ছেলে। পরে যখন এরিকো আসলেন তখন আমি খুশি হয়েছিলাম। এরিকো আন্দোর রেডিওতে আসার প্রথম দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিন আমরা তাকে রেডিও মহানন্দার সিইও এর রুমে একটি ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলাম। সেদিন আমাদের মানে আমি লাবণ্য ফারহান মৌসহ রেডিও ও প্রয়াসের কর্মীদের খুবই ভালো লেগেছিল, বাংলায় কথা বলতে পারছিলেন। যদিও আধো আধো বাংলা বলছিলেন। আসলে সে প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন। ২০১৪ সালের মার্চ মাসের ৫ তারিখ তিনি এখানে এসেছিলেন, এরপর রেডিওতে সে অনুষ্ঠান নির্মাণসহ অনেক কাজই করতেন, তার শেখার খুব আগ্রহ ছিল। তিনি এখানে শাপলা সাকুরা নামে একটা ১৪ পর্বের অনুষ্ঠান করেছিলেন, সেখানে দুই দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিষয় উঠে আসে।
আলেয়া ফেরদৌস বলেন, এরিকোর সবচেয়ে একটা বিষয় খুব ভালো লেগেছে তা হলো, তার শিষ্টাচার, বড় ছোট কার সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে, সে ব্যাপারে খুবই যতœশীল ছিলেন। স্টেশন ম্যানেজার আরও জানান, তার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে, সময় জ্ঞান তার খুবই ভালো, সময় মত সকল কাজ শেষ করত, এমনকি অফিসে প্রতিদিন ৮ ঘন্টা কাজ করত, অনেক সময় এর চেয়ে বেশিও করত।
তিনি বলেন, তার জন্মদিনে আমাদের সকলকে সে দাওয়াত দিয়েছিল, সেখানে সে নিজ হাতে বিভিন্ন পদের জাপানি খাবার রান্না করে আমাদের খাওয়ায়। সে দিন ‘করোকে’ নামে একটা খাবার খেয়েছিলাম, ওটা খুবই ভালো লেগেছিল। পরে আমি তার কাছ থেকে ‘করোকে’ রান্না করা শিখেছিলাম। পরে আমি যখন রান্না করেছিলাম, তখন সে ওটা খেয়ে বলেছিল আমার রান্নাটা তার চেয়েও ভালো রান্না হয়েছে। যা আমার কাছে একটা বড় সুখকর স্মৃতি।
রেডিও মহান্দার স্টেশন ম্যানেজার জানান, এরিকো যে দিন চলে গেলেন তাঁর আগের দিন বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফিরে আসে আর সে রাতে আমার বাড়িতে রাতে খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলাম, আমি ওঁর পছন্দের খবারগুলো রান্না করেছিলাম। সকালে (মঙ্গলবার) যখন সে চলে যাচ্ছে, এর আগেই সে আমার বাসায় গিয়ে আমাকে কিছু উপহার দেয়। আর বলে এগুলো আপনার কাছে আমার স্মৃতি হয়ে থাকবে। পরে আমিসহ সকলেই রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে তাকে বিদায় জানায়, এতদিন তিনি আমার কাছে মেয়ের মতই ছিল, বিদায় বেলায় খুবই খারাপ লাগছিল, তখন চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি আমি।
রেডিও মহানন্দা ও জাইকা কর্মীদের আলোচনায় জানা যায়, ন্যাশনাল এক্সসেরসাইজ বা জাতীয় শরিরচর্চা তৈরীর কাজ করছিলেন এরিকো আন্দো। এটি একটি অনেক বড় কাজ ছিল, বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে ন্যাশনাল এক্সসেরসাইজ বা জাতীয় শরিরচর্চা আছে। এটি হল, একটি নির্দিষ্ট সময়ে সকল টিভি ও রেডিওতে সুনির্দিষ্ট সুর বা মিউজিক বাজবে আর তার সাথে সাথে যে যেখানে আছে বাড়ী কিম্বা অফিস কিম্বা রাস্তা বা মাঠে যে যেখানে আছে সুনির্দিষ্ট শারিরিক কষরত করতে থাকবে। এতে সকলকে শারিরিকভাকে সুস্থ্য ও রোগমুক্ত রাখতে সহায়তা করবে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বিকেএসপি, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার, জাইকাকে নিয়ে কাজ করছিলেন আন্দো। অনেকদূর এগিয়েছেনও- চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগোনে বাজেমা দল … গানের মিউজিকের সাথে সুনির্দিষ্ট শারিরিক কষরতে মহাড়া দিয়েছেন বিকেএসপি, বিটিভি ও বেতারে। এখন দেখা যাক কাজটা শেষ হয় কীনা। আমরা আশা করতেই পারি কাজটি সম্পন্ন করেই এরিকো আন্দো জাপানের উদ্দেশ্যে উড়াল দিবেন, আর তিনি হয়ে রবেন অনন্য উদাহরণ।