“রেডিও মহানন্দা সচেতন করে তুলছে – আইনগত সহায়তা নিতে এলাকার মানুষকে”

118

Hasib PP new Pic copyমো: হাসিব হোসেন

কি শিক্ষিত-কি নিরক্ষর, অনেকেই আমরা আইন সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি আবার জানিনা বা ওয়াকিবহাল নই। তবে যারা আইন বিষয়ে বা বিশেষ ইস্যূতে/বিষয়ে আইন সম্পর্কে পড়া-লেখা করেন বা জানার চেষ্টা করেন কেবল তাঁদেরি আইনি ধারণা পরিস্কারভাবে রয়েছে। একজন মানুষ পৃথিবীর সকল বিষয়ে সমান ধারনা রাখতে পারবেন তাও নয় কিন্তু। আবার আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ অনেক বিষয়ে অসচেতন রয়েছেন। এ জন্য দায়ি শিক্ষার অভাব এবং দারিদ্রতা। তাইতো আমাদের দেশের নিরক্ষর, দরিদ্র ও অসচেতন মানুষেরা অধিকার সচেতন নই এবং সংগত কারনে অধিকার বঞ্চিত। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে অধিকার দেয়া আছে যে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী”। এই সাংবিধানিক অধিকারটি বাস্তবায়নের জন্যে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালের ২৬ জানুয়ারি “আইনগত সহয়তা প্রদান আইন-২০০০” জাতীয় সংসদে পাস করেন। এই আইনের আওতায় আইন সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে সরকার “জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা” নামে একটি সাংবিধানিক সংস্থাও প্রতিষ্ঠা করে। আসলে এর পরেও কি আমরা সকলে এমন অধিকার ভোগ করছি? উত্তর এক কথায়, ‘না’। তাই অধিকার আদায়ে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আর এ কাজটির জন্য দরকার একটি মাধ্যমের।
কোন দেশের উন্নয়নে, তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে, অধিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে বা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে গণমাধ্যম বা মিডিয়া। আমাদের দেশে জাতীয় পর্যায়ে অনেকগুলো প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া কাজ করছে। জাতীয় পর্যায়ের এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলি কাজ করে চলেছে নিরন্তর – নিজেদের স্বক্ষমতা অনুযায়ী। তবে স্থান ভেদে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগহীন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ, নিরক্ষর এবং দরিদ্র মানুষরা তথ্য প্রবাহের আলো বা উন্নয়ন ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত। এমন এক অবস্থায় সরকার তৃণমূল এলাকার মানুষের কাছে তথ্য ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য, অধিকারহীন মানুষের কাছে অধিকারের তথ্য দেয়ার জন্য তৃণমূলের গণমাধ্যম কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত-নেপালসহ বিশ্বের অন্যান্য কোন কোন দেশে ৭০/৮০ বছর আগেই কমিউনিটি রেডিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনগোষ্ঠিভিত্তিক উন্নয়নের লক্ষ্যে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে ২০১১ সালে আমাদের দেশের কমিউনিটি রেডিওগুলো সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে। ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জেও প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের কমিউনিটি রেডিও “রেডিও মহানন্দা”। এর উদ্যোক্তা সংস্থা হল ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি’। জাপান সরকারের সহায়তায় স্থাপনের শুরু থেকেই বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক উন্নয়ন প্রচারনা ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে শুরু করে রেডিও মহানন্দা। শ্রোতা জনপ্রিয়তা পেতে থাকে, এক বছর পূর্তিতে হাজার শ্রোতার আর্থিক সহায়তায় ও কলকাকোলিতে অনুষ্ঠিত হয় শ্রোতা সমাবেশ, বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দা গার্ডিয়েন’ এ প্রকাশিত হয় রেডিও মহানন্দাকে নিয়ে ফিচার, রেডিও মহানন্দা পরিদর্শন করেন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদুত ড্যান ডাবলু মজিনা, দেশ-বিদেশের অতিথীরাও দেখে যান রেডিও মহানন্দার কার্যক্রম।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির সিদ্ধান্তে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এর লিখিত আহব্বানে সাড়াদিয়ে লিগ্যাল এইড কমিটি কার্যক্রম সম্পর্কে রেডিও মহাননন্দা ২০১২ এর শুরুর দিক থেকেই মানুষের কাছে ধারণা দিতে শুরু করে। রেডিও মহানন্দার সম্প্রচার এলকার একজনও মানুষ যেন আইনি সহায়তা বঞ্চিত না হয় এমন প্রত্যয়কে সামনে নিয়ে পূর্ণ উদ্যোমে পাবলিক সার্ভিস এ্যানাউন্সমেন্ট দিয়ে শ্রোতাদের আইনি সহায়তা নেয়ার জন্য সচেতন করার চেষ্টা করতে থাকে। সাড়াও মিলে শ্রোতাদের কাছ থেকে। দরিদ্র অসহায় মানুষ আইনি সহায়তা নিতে আসতে শুরু করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় জেলা ও দায়রা জজের নেতৃত্বে গঠিত জেলা লিগ্যাল এইড কমিটি’র কাছে।

“আমার মোবাইল আছে। আর আমি আমার মোবাইলে রেডিও মহানন্দা শুনি। আর ওখানেই আমি একটা গানে গানে বলতে শুনেছি যে জজকোর্টে বিনামূল্যে গরীবদের আইনী সহায়তা দেয়া হয়। তখন আমি আমার স্বামীর বিরুদ্ধে জজকোটের আইনি সহায়তা নিয়ে মামলা করি।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো: রবিউল আলম জানান, “আর্থিকভাবে অস¦চ্ছল, সহায় সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থিক সামাজিক কারণে ন্যায় বিচার পেতে অসমর্থ মানুষকে আইনগত সহায়তা দেবার জন্যে উল্লেখিত আইনটিকে ২০০৬ সালের ১৩ জুলাই কিছু সংশোধন করে আরো গতিশীল ও বাস্তবমুখী করা হয়। আইনটির বিভিন্ন ধারায় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কাঠামো, সংস্থার দায়িত্ব ও কার্যাবলি, জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটির বিবরণ, আইনগত সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতা, আবেদন প্রক্রিয়া ইত্যাদি বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। এর বিধান অনুসারে মধ্যস্থতা বা মধ্যস্থতাকারী বা সালিশকারীকে সম্মানী প্রদান, মামলার প্রাসঙ্গিক খরচ প্রদানসহ অন্য যে কোন সহায়তা প্রদান এবং প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত হারে আইনজীবীকে সম্মানী প্রদান করার ব্যবস্থা রয়েছে। এই আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই সংস্থাটি একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। এর স্থায়ী ধারাবাহিকতা, সাধারণ সীল মোহর এবং উহার স্থাবর ও অস্থাবর উভয় প্রকার স¤পত্তি অর্জন, অধিকারে রাখা এবং হস্তান্তর করার ক্ষমতা আছে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো: রবিউল আলমের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন রেডিও মহানন্দার প্রযোজক (খবর) সামিয়া আখতার।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো: রবিউল আলমের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন রেডিও মহানন্দার প্রযোজক (খবর) সামিয়া আখতার।

অসচ্ছল, সহায় সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ সামাজিক কারণে বিচারলাভে অসমর্থ বিচারপ্রার্থীদের আবেদন বিবেচনাক্রমে যতদূর সম্ভব আইনগত সহায়তা প্রদান করার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনে স্থাপিত লিগ্যাল এইড অফিস কাজ করে চলেছে। জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে স্থানীয় কমিউনিটি রেডিও’র মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদানের তথ্য ব্যাপক প্রচার করার আহব্বান জানায় এই কমিটি। যেন স্বীয় অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও মামলা পরিচালনায় অসমর্থ ব্যক্তিকে আইনগত সহায়তা গ্রহণে উৎসাহিত করা যায়। আর এ কাজটি বাস্তবায়ন করার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের কমিউনিটি রেডিও, ‘রেডিও মহানন্দা’ লিগ্যাল এইড এর উপর একটি প্রমো  (প্রমোশনাল বিজ্ঞাপন) তৈরী করে এবং রেডিওতে সম্প্র্রচার করে যাচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ লিগ্যাল এইড অফিসার মো: রবিউল আলম মনে করেন, এলাকার মানুষ রেডিও শুনে আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। তিনি তথ্য দিয়ে জানান যে, “২০০০ সাল থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই সেবা প্রদান করা শুরু হয়, ২০১১ সালে আইনী সহায়তা গ্রহণের জন্য ৭৮টি আবেদনপত্র জমা হয়, কিন্তু ২০১২ সাল থেকে এর প্রতিফলন ভালোমত দেখা দেয়, ২০১২তে ১৭৯টি, ২০১৩তে ২২১টি, ২০১৪তে ২৪৬টি এবং ২০১৫ সালের জানুয়ারী থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৪ মাসে ১০৯টি আবেদন জমা হয়। আর ২০১১ সালের পর এই আবেদন বৃদ্ধির পেছনে রেডিও মহানন্দার প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে”। উদাহরণ হিসাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন “বারঘোরিয়া এলাকার হালদার পাড়ার কাঞ্চন রাণী যৌতুক নিরোধ আইনের আওতায় তিনি তার স্বামী নিতাই দাস এর উপর মামলা করেন। তার নিবন্ধন নাম্বার ২৩৮/১৪, তিনি ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪ তে মামলা করেন। অন্যদিকে আমনুরা এলাকার মিনারুলের স্ত্রী রুনা বেগম, যিনি বর্তমানে তার স্বামী মিনারুলের বিরুদ্ধে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মামলা করেছেন। রুনার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন যে “আমার ৬ মাসের এক ছেলে আছে, তাকে আমার স্বামী নিয়ে নিয়েছে। আমার মামা রেডিও মহানন্দার নিয়মিত শ্রোতা। তিনি রেডিও মহানন্দায় শুনেন যে, জজকোর্টের নিচতলায় লিগ্যাল এইড অফিসে অসহায় ও দরিদ্রদের বিনামূল্যে আইনী সহায়তা দেয়া হয়। সেই কথা শুনে আমার মামা বিষয়টি আমার সাথে আলোচনা করেন। তারপর আমার মামা আমাকে সাথে করে নিয়ে যান এবং আমি ছেলেকে ফেরত পাওয়ার জন্য স্বামীর বিরুদ্ধে এ মামলা করি। পাশে এমন কেহ ছিলনা যে আর্থিক সহায়তা করে, তাই জজকোটের সহায়তা নিয়েছি”। রুনা বেগমের মত আরও একজন ভূক্তভোগী বিনামূল্যে আইনী সেবাগ্রহীতা বেহুলা মহিপুরের শফিকুল আলমের স্ত্রী নূরপেষণ নেসা। তিনিও তার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, যৌতুকের থাবা থেকে মুক্তি ও ভরণ-পোষন পাওয়ার আশায়। লিগ্যাল এইড অফিসে বিনামূল্যে আইনী সহায়তা পাওয়া যায়, এই কথা আপনি কিভাবে জানলেন? এই প্রশ্নের জবাবে নূরপেষণ বলেন, “আমার মোবাইল আছে। আর আমি আমার মোবাইলে রেডিও মহানন্দা শুনি। আর ওখানেই আমি একটা গানে গানে বলতে শুনেছি যে জজকোর্টে বিনামূল্যে গরীবদের আইনী সহায়তা দেয়া হয়। তখন আমি আমার স্বামীর বিরুদ্ধে জজকোটের আইনি সহায়তা নিয়ে মামলা করি।” সব কথার মধ্যেও সুখের কথা হলো যে, মানুষ এখন অনেকটাই সচেতন হচ্ছে। বারঘোরিয়া এলাকার আব্দুস সালাম যিনি একজন সচেতন ব্যক্তি এবং তিনি রেডিও মহানন্দার নিয়মিত শ্রোতা। তিনি বলেন “আমি রেডিও মহানন্দার প্রায় সকল অনুষ্ঠান শুনি এবং আমার এলাকার মানুষকেও শুনতে উদ্বুদ্ধ করি। লিগ্যাল এইডের যে প্রমো রেডিও মহানন্দায় প্রচারিত হয় সেটা আমি শুনে আমার এলাকার অনেক মানুষকে এ বিষয়ে জানায় এবং অনেক ভুক্তভোগী জজকোট হতে আইনী সহায়তা নিয়েছে।”
আজ হতে ১৫ বছর পূর্বে সরকার আইন সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছিল। যা এখন হাটি হাটি পা পা করে জনকল্যাণকর ও দরিদ্র বান্ধব এক কর্মসূচীতে পরিণত হয়েছে, আজ তা অসহায় দরিদ্র মানুষের জন্য ভরসার এক বটবৃক্ষ। প্রতিবছর ২৮ এপ্রিল জাতীয় আইন সহায়তা দিবস পালিত হয়, ২০১৫ এর এই দিবসের শ্লোগান “সরকারি আইনি সহায়তা পাবার উন্মক্ত হলো দ্বার, বিকল্প বিরোধ নিস্পত্তি সংযুক্ত হলো সবার”। আমাদের দেশের অসহায়, অসচ্ছল ও অসচেতন জনগোষ্ঠীকে আইনী সহায়তা প্রদান করে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিঃসন্দেহে এটিকে সরকারী মহান উদ্যোগ বলা যেতে পারে। আর এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে রেডিও মহানন্দার প্রচারণা চাঁপাইনবাবগঞ্জে অন্য এক প্রাণের সঞ্চার করেছে বলা যায়।
আইনি সহায়তা কার্যক্রম এগিয়ে যাক, জয় হোক অধিকার বঞ্চিত মানুষের।

লেখক পরিচিতি:
নির্বাহী পরিচালক, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, রেডিও মহানন্দা

তথ্য সহায়তায়:
মোমেনা ফেরদৌস ও সামিয়া আখতার।