হাসিব ভাইয়ের কষ্টের কথা মনে পড়লে নিজের কষ্ট ভুলেই যায়

8
আবুল খায়ের খান

প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটিতে যোগদানের আগে সাড়ে চার মাস বেকার ছিলাম। প্রয়াসে যোগ দিই ২০০৪ সালের ২২ জুলাই, বিভাগীয় সমন্বয়কারী হিসেবে। তার আগে ছিলাম ব্র্যাকে, যোগ দিয়েছিলাম ১৯৯৬ সালে। পারিবারিক কারণে সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম।
তারপর ইচ্ছে জেগেছিল, একজন ভালো উদ্যোক্তা হওয়ার। কিন্তু কয়েক মাস বাড়িতে থেকে পরিকল্পনা মেলাতে না পেরে অগত্যা পারিবারিক চাপে এবং বেকারত্ব কাটাতে আবারো চাকরি খুঁজতে বেরিয়ে পড়ি। মার্কেটিংয়ে মাস্টার্স করা ব্যক্তি বসে থাকবে, সেটাইবা কেমন দেখায়!
ভাগ্যক্রমে সেই সময় প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ে। ‘বিভাগীয় সমন্বয়কারী’ পদে লোক নিয়োগ দেবে। কালবিলম্ব না করে আবেদন করি এবং নিয়োগও পেয়ে যায়। প্রয়াস চাকরিজীবনের শুরুতে বেতন ছিল মাত্র ৪ হাজার ১০০ টাকা। বলতে দ্বিধা নেই যে, সেই সময়ও এই বেতন দিয়ে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন কষ্টসাধ্য ছিল। তারপরও সেই কষ্ট মেনে নিয়েছিলাম এই কারণে যে, সংস্থাটি স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেনের সুনামের জন্য।
প্রয়াসে যখন যোগ দিই, তখন এর শাখা অফিস ছিল মাত্র ২টি। ভালো লাগার বিষয়, ২টি শাখা নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে দেশের ৬টি জেলায় প্রয়াসের ৭১টি শাখা বিস্তার লাভ করেছে এবং মাইক্রোক্রেডিটের বিভিন্ন কম্পোনেন্ট বৃদ্ধি হওয়ায় সেবার মানও বেড়েছে। আমার বিশ^াস, সুনামের সাথে কাজ করার মাধ্যমে প্রয়াস দ্রুতই সারা বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করবে।
মনে পড়ে, প্রয়াসে যোগ দেয়ার সময় গোবরাতলা ও মহারাজপুরে মাত্র দুটি শাখা ছিল। প্রথম সমিতি পরিদর্শনে দেলবাড়ী যায়। সেই সময় রাস্তা কাঁচা ও বৃষ্টি হবার কারণে মোটরসাইকেল চালিয়ে খুব কষ্টে সমিতিতে উপস্থিত হয়েছিলাম। সমিতির বেশিরভাগ সদস্যই ছিলেন আদিবাসী। তাদের সাথে আলোচনা করতেও ভালো লেগেছিল।
সেই সময় কালেকশন করতেন আমিরুল ইসলাম। তার কাছ থেকে দেলবাড়ী, নাধাই ও গনশাপাড়ায় প্রয়াসের কার্যক্রমের বিবরণ শুনি। জানতে পারি, প্রয়াসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হাসিব ভাই কীভাবে বাইসাইকেল চালিয়ে এসব এলাকায় এসে কাজ করতেন। তখন বুঝেছিলাম, কত কষ্ট স্বীকার করে তিনি প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেছিলেন। আজ পর্যন্ত তার অক্লান্ত পরিশ্রমেই প্রয়াস এগিয়ে যাচ্ছে। হাসিব ভাইয়ের এসব কষ্টের কথা মনে পড়লে তখন নিজের কষ্টটা ভুলেই যায়।
তিন দশক হতে চলল প্রয়াস সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। নতুন নতুন এলাকা সৃষ্টি ও জনবল বৃদ্ধি করে সফলতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ নিয়োজিত কর্মীবৃন্দের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং তাদের মেধার সুষ্ঠু ব্যবহার। এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় যেÑ কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, ক্ষুদ্র ব্যবস্যা, হস্তশিল্প ও অন্যান্য খাতে উপযোগ সৃষ্টি করে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে সুযোগ সৃষ্টি করেছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি।
দেখতে দেখতেই আমারও প্রয়াসে চাকরিতে দেড় যুগ পার হয়ে গেছে। এই লম্বা সময়ে শাখা যেমন বেড়েছে, তেমনি লোকবলও বেড়েছে প্রয়াসে। সকল কর্মীকে যথাযথ বেতনভাতা ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে আসছে প্রয়াস। কোভিডের মহামারির সময় সংস্থার আয় না থাকলেও কর্মীদের বেতনভাতাসহ প্রয়োজনীয় ছুটির ব্যবস্থা করেছে।
প্রয়াসের প্রত্যেকের সঙ্গেই মিলেমিশে কাজ করে আসছি। আগামাীতেও তাই চাই। আর দীর্ঘ সময় চাকরি করার ফলে এখন কেবলই মনে হয়, প্রয়াসে থেকেই চাকরিজীবন শেষ করার। দুই মেয়েসহ পরিবার নিয়ে ভালোই আছি। এই তো বেশ।
আজ আমাদের প্রিয় সংস্থাটি দেখতে দেখতে ৩০ বছর অতিক্রম করে ৩১ বছরে পদার্পণ করল। ৩১তম জন্মদিনে সকলকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আর প্রত্যাশাÑ যে প্রয়াস শুরু থেকে এ পর্যন্ত সকল চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে দারিদ্র্য হ্রাস ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, সেই উন্নয়ন ধারা যেন কখনোই থেমে না যায়।

আবুল খায়ের খান : জ্যেষ্ঠ সহকারী পচিালক (অডিট)