হাত না পেতে ভরসা রেখেছেন রিকশাভ্যানের প্যাডেলে : অদম্য প্রতিবন্ধী যুবক কাদের

330

শাহনেওয়াজ দুলাল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের বালিগ্রাম। এই গ্রামেই ছোট্ট দুই রুমের টিনের চালার বাসায় বাস করেন পঁয়ষট্টি বছর বয়সী রুহুল আমিন। সম্পত্তি বলতে বসতভিটার ৬ ছটাক মাটিটুকুই। পেশায় চিকিৎসক চেম্বারের নৈশপ্রহরী, নিয়োজিত দীর্ঘদিন থেকেই।
স্ত্রী সবিরন (৫৫) গৃহিণী। ৪ সন্তান তাদের। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় দুটি সন্তানই অর্থাৎ এক মেয়ে ও এক ছেলে জন্মের ১০ বছর বয়স থেকে প্রতিবন্ধী। একে তো প্রতিবন্ধী তার ওপর আবার সেই ছোট্টবেলায় এক অগ্নি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বড় মেয়ে নাসিমা (৩৫)। সে ক্ষত এখনো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
নৈশপ্রহরীর সামান্য বেতনে ৭ সদস্যের সংসার চালাতে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় বাবা রুহুল আমিনের পক্ষে তাই উন্নত চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি এই দুই সন্তানের। এখনো সে কথা মনের মধ্যে ভেসে উঠলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই। উন্নত চিকিৎসা করতে পারলে হয়তো দুই সন্তান প্রতিবন্ধিতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারত, এ ভাবনা তাদেরকে প্রতিনিয়ত পীড়া দেয়।
কষ্টের মধ্যেও কিছুটা সুখ আছে এই দম্পত্তির। কেননা অভাবের মধ্যেই ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন শহরের বিদিরপুরে। বড় মেয়েকে তাদের প্রতিবেশী রাজশাহীতে নিয়ে গিয়ে রেখেছেন, রুহুল আমিনকে সহায়তার উদ্দেশ্যে। ছোট ছেলে ঢাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। অবিবাহিত রহমান মা-বাবাকে দেখাশোনাও করেন।
তবে রুহুল আমিন দম্পত্তির গর্বের জায়গাটা অন্যত্র তাহলো বড় ছেলে কাদের। প্রতিবন্ধী হয়েও প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে তার এগিয়ে চলা মা-বাবাকেই উল্টো অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
প্রতিবন্ধীদের অনেক ধরন আছে, কারো কারো প্রতিবন্ধিতা দেখে বোঝার উপায়ও নেই কথা না বলা পর্যন্ত। কিন্তু কাদের এমনই এক প্রতিবন্ধী, যাকে দূর থেকে দেখলেই প্রতিবন্ধী হিসেবে শনাক্ত করা যায়। প্রতিবন্ধী হলেও মনের জোর ছিল অদম্য। পরাজিত হননি, কারো কাছে হাত পাততেও চাননি। সহজ, সরল প্রাণবন্ত তিরিশ বছর বয়সী এই যুবক প্রতিবন্ধিতাকে জয় করার অদম্য মানসে পনের বছর আগে জীবিকার তাগিদে পায়েচালিত রিকশাভ্যানকে রোজগারের জন্য বেছে নেন। প্রতিবন্ধিতাকে পুঁজি করে অন্যের কাছে হাত না পেতে ভরসা রেখেছেন নিজের প্রতি, ভরসা রেখেছেন রিকশাভ্যানের প্যাডেলে। সেই শুরু, আজ অবধি সেই ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
ভ্যান চালাতে যত না কষ্ট, তার চেয়ে বেশি কষ্ট ছিল প্রথম দিকে ভাড়া না পাওয়া, প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে। ভাড়া নিলেও কেউ কেউ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পয়সা কম দিত। এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছর।
২০১৫ সালে শহরের রাজমহল সিনেমা হল মার্কেটের থাই গ্লাস ব্যবসায়ী মাহবুব হাসান সুইট প্রতিবন্ধী কাদেরকে ভ্যান চালাতে দেখে তার প্রতি সদয় হন এবং তার দোকানে বিক্রীত মালামাল পরিবহনের কাজে তাকে নিয়োজিত করেন। পাশাপাশি পাশের আরেক থাই গ্লাস ব্যবসায়ীর মালামালও পরিবহনের ব্যবস্থা করে দেন কাদেরকে দিয়ে।
কাদের প্রসঙ্গে কথা হয় হাসান ট্রেডার্সের কর্ণধার সুইটের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায় ৭ বছর আগে তাকে আমার দোকানের মালামাল পরিবহনের কাজে নিয়োজিত করি। কাদের খুবই বিশ্বস্ত। তিনি বলেন, তার প্রতিবন্ধিতার কারণে ভ্যান থেকে মালামাল ওঠানামা করতে সমস্যা হলেও আমরা তাকে সহযোগিতা করি।
একই কথা বলেন পাশের জামিল থাই অ্যান্ড এসএস গ্যালারির স্বত্বাধিকারী আবুল বাসার।
বিত্তের সুখ না থাকলেও চিত্তের সুখ আছে কাদেরের জীবনে। প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে রিকশাভ্যানের প্যাডেলে পা রাখার পর জীবনসঙ্গীও বেছে নেন তিনি। পাশের মহল্লার সাধারণ সহজ-সরল জীবনের এক নারীকে বিয়ে করে ঘরে আনেন। তাদের জীর্ণ কুটির আলো করে আসে ফুটফুটে দুই কন্যাসন্তানÑ কারিমা (৮) ও তাহসিনা। কারিমা মাঝপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। তাহসিনা সামনে বছর ভর্তি হবে।
বলাবাহুল্য, কাদেরের স্ত্রী সংসারে কিছুটা সচ্ছলতা আনতে অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করেন। কথা হয় তার সঙ্গে। “ভ্যান চালিয়ে খুব একটা আয় হয় না। তাই সংসারে একটু বাড়তি উপার্জনের জন্য এক চিকিৎসকের বাসায় রান্নার কাজ করি। মেয়েটাকে স্কুলে পড়াচ্ছি, আরেকটাকে তো স্কুলে দিতে হবে,” বলেন তিনি।
স্বামী কাদেরকে নিয়ে স্ত্রীর গর্ব, পরিবারে অভাব থাকলেও কারো কাছে হাত পাতেন না তার স্বামী; পরিশ্রম করেই সংসার চালান। এমন গর্ব করেন কাদেরের মা-বাবাও।
কাদেরের মা বলেন, অভাবের সংসারে প্রতিবন্ধী দুই ছেলে ও মেয়েকে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি; কিন্তু অভাবের কারণে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারিনি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, কাদেরের জন্য প্রতিবন্ধী কার্ডের ব্যবস্থা হলেও অবিবাহিত বড় মেয়ে নাসিমার জন্য আজও কার্ডের ব্যবস্থা করতে পারিনি। তার কার্ডটা হলে মরেও শান্তি পেতাম।
সমাজে কোনো কোনো প্রতিবন্ধী যখন নিজেকে অভিশপ্ত ভেবে অন্তর্দহনে ভুগছেন, সেখানে কাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে তিনি তার জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বপ্ন দেখছেন দুই কন্যাসন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার। সবার বলা কথা বুঝলেও, অন্যকে বোঝানোর মতো সক্ষমতা তার নেই। তারপরও ২০ বছরের নিরন্তর পথ চলা প্রতিবন্ধী কাদেরের।