হাইব্রিড বীজ উৎপাদনে পিছিয়ে পড়েছে দেশ

151

দেশে হাইব্রিড বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবগুলো প্রতিষ্ঠানই পিছিয়ে পড়েছে। সাড়ে ৮ হাজার টন হাইব্রিড বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন করতে পেরেছে ৬ হাজার ৫০০ টন হাইব্রিড বীজ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কম বীজ উৎপাদন হয়েছে। আগামী মৌসুমে ব্যবহারের জন্য প্রায় দুই হাজার টন হাইব্রিড বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সুপ্রিম সিডস লিমিটেডের। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া ও পোস্ট হারভেস্ট লসের কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। বরং সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ৬০০ টন বীজ উৎপাদন করতে পেরেছে। একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হাইব্রিড বীজ উৎপাদনকারী আরেক প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ হাজার ২০০ টন হাইব্রিড বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও অতিবৃষ্টি ও ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাবে তা সফল হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠানটি মৌসুম শেষে মাত্র ৭০০ টন বীজ উৎপাদন করতে পেরেছে। আর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সিনজেন্টা প্রতিকূল আবহাওয়া ও রোগ-বালাইয়ের কারণে লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২০ শতাংশ কম বীজ উৎপাদন করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে মোট বোরো আবাদের ১২-১৫ শতাংশ হয় হাইব্রিড। প্রতি বছর গড়ে বীজের চাহিদা ৮-১০ হাজার টন। বেসরকারি খাতই হাইব্রিড ধান বীজের ৮০-৮৫ শতাংশই সরবরাহ করছে। আর সরকারিভাবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সরবরাহ করছে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টন বীজ। দেশী-বিদেশী দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান বীজ উৎপাদন ও বিপণনে নিয়োজিত। তার মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে এসিআই, লালতীর, সুপ্রিম সিডস ও ব্র্যাক। সম্মিলিতভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোই সরবরাহ করছে মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ বীজ। হাইব্রিড বীজ সরবরাহকারী অন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইস্পাহানি, গেটকো, আফতাব, বায়ার ক্রপ সায়েন্স, সিনজেন্টা, ইউনাইটেড ও পারটেক্স সিডস। দেশে ১৬৬টি জাতের হাইব্রিড বীজ উদ্ভাবন করা হয়েছে। তার মধ্যে সরকারিভাবে উদ্ভাবন হয়েছে ১৩টি ও বাকিগুলো বেসরকারিভাবে।
সূত্র জানায়, পর্যাপ্ত হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করতে না পারায় বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে। মূলত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলো বীজ উৎপাদন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে চলতি মৌসুমে হাইব্রিড বীজ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে নীতিসহায়তা ছাড়াও আগামী মৌসুমে বীজ উৎপাদনের জন্য সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেও হাইব্রিড বীজ উৎপাদনে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও হেক্টরপ্রতি ফলন কমার কারণে উৎপাদন কমেছে। সূত্র আরো জানায়, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় হাইব্রিড আবাদে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাপান ও চীনে ৮০ শতাংশের বেশি জমি হাইব্রিড চাষের আওতায় এসেছে। কিন্তু দেশে এখন শুধুমাত্র বোরোতে হাইব্রিড আবাদ হচ্ছে। আউশ ও আমনে হাইব্রিডের প্রচলন এখনো সম্ভব হয়নি। আর কয়েক দশক ধরে বেসরকারি খাত ভালোমানের হাইব্রিড বীজ উৎপাদনে প্রতিনিয়ত গবেষণা ও বিনিয়োগ করছে। বাজার চাহিদা তৈরিসহ কৃষকদের হেক্টরপ্রতি ফলন বাড়াতে হাইব্রিড বীজের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতি ছাড়াও বীজ খাতে পর্যাপ্ত নীতিসুবিধার অভাব রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভর্তুকিসহ নানাবিধ সহযোগিতা করা হলেও বেসরকারি খাত পিছিয়ে রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় বীজ খাতের উন্নয়নে অর্থায়ন সুবিধা ছাড়াও সরকারিভাবে নানা সুবিধা দেয়া হয়। বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। দেশের বীজ উৎপাদনে ট্রাইজেনিক জাত ও মলিকুলার ব্রিডিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। এদিকে হাইব্রিড ধান আবাদে কৃষকদের উত্সাহিত করতে নানা প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে জানিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক আশ্রাফ উদ্দিন আহমেদ জানান, বেসরকারি খাতে জাত উদ্ভাবনসহ বিপণনে সহায়তা করা হচ্ছে। তবে বীজের উৎপাদন কমার তথ্য এখনো মন্ত্রণালয়ে আসেনি। বেসরকারিভাবে বীজ উৎপাদন কম হলেও সরকারিভাবে হাইব্রিড বীজের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। প্রয়োজনে আগামী মৌসুমে সরবরাহ বাড়ানো হবে।