স্বাগত ১৪২৩

55

gourbangla logoগতকাল সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে বিদায় হলো ১৪২২ বঙ্গাব্দ, একটি বছর। গত বছর বিভিন্ন কারণে বহুল আলোচিত ছিল। তবে আজকের সূর্যোদয়ের সঙ্গে গত বছরের ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা সরিয়ে’ শুরু হলো একটি নতুন দিনের, নতুন একটি বছরের। আজ পহেলা বৈশাখ। ১৪২৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। কী বার্তা বয়ে এনেছে এ নতুন বছর, তা কারো জানা নেই। তবু প্রত্যাশাথ হে রুদ্র বৈশাখ, কালবোশেখির তীব্র থাবায় যেভাবে ধ্বংস কর আবর্জনা, উড়িয়ে নাও জীর্ণ মলিন রিক্ততার দিন, ধ্বংসের ওপর সৃষ্টি কর নতুন বসতি, সেভাবেই এবার যেন ধ্বংস হয় যাবতীয় সংকীর্ণতা আর সাম্প্রদায়িকতা-মানবতাবিরোধী সব অপশক্তি। আজ প্রতিটি বাঙালি গত বছরের সব জীর্ণতা মুছে আপনাপন সংস্কৃতির নবায়নের প্রত্যয় নিয়ে পালন করছে বাংলা নববর্ষ। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাঙালিরাও পালন করছে এ দিনটি। সবার মনে আজ একটাই সুর, ‘যাক পুরাতন স্মৃতি/যাক ভুলে যাওয়া গীতি,/অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।’
বাঙালি উৎসব প্রিয় জাঁতি হিসেবে সুবিদিত। বাঙালির গানে-কবিতায়, নানা লোকাচারে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দূর অতীত থেকেই বয়ে চলেছে নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। স¤্রাট আকবরের শাসনামলে কৃষিনির্ভর বাংলায় বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন চালু হয়েছিল, নানা বিবর্তনেও তা আজো বহমান। এ দেশের বৃহত্তম অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। চৈত্রসংক্রান্তির নানা লোকাচার আর নববর্ষ বরণে কৃষিজীবী সমাজের বিচিত্র আয়োজন লোকায়ত উৎসব হিসেবেও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও বৈশাখের গুরুত্ব যথেষ্ট। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মমাস বৈশাখ। তার সৃজনে বৈশাখ নানা মাত্রিকতায় উদ্ভাসিত যে, সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর হৃদয়ের আকুতিই যেন তাতে ধ্বনিত। চৈত্রের প্রচ- তাপদাহে চৌচির মাঠ-ঘাট বৃষ্টির আশায় উন্মুখ হয়ে থাকে। উন্মুখ বাংলার কৃষিজীবী সমাজও। নতুন বছরের কাছে তাদের প্রত্যাশা বৃষ্টিস্নাত মৃত্তিকায় বীজ ছড়িয়ে দেয়ার অনুকূল পরিবেশ প্রাপ্তির। বৈশাখ যেমন নব সৃষ্টির, তেমনি কালবৈশাখীর ছোবলে ধ্বংসাত্মকও। বাঙালির লোকবিশ্বাস যে, প্রকৃতির এ ধ্বংস ক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে সব নবীন সৃষ্টির বীজ।
অস্বীকারের সুযোগ নেই, বৈশাখের সঙ্গে বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষ উপলক্ষে অন্যান্য বছরের মতো এবারো রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে দিনটির শুরু হবে। অনুষ্ঠানটি এখন বাঙালির ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। ঐতিহ্য এ কারণে যে, পাকিস্তানি শাসনামলে নববর্ষ উদযাপনকে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট রমনার বটমূলে বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করেছিল। এতে হাজার হাজার বাঙালি যোগ দিয়েছিল। আজ রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানেও মানুষের ঢল নামবে। এবারো অনুষ্ঠান এলাকায় প্রশাসন কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। বাঙালির এ প্রাণের উৎসব নির্বিঘœ হোকথ এটিই আমাদের প্রত্যাশা।
বাংলা নববর্ষের এই প্রথম দিনের চাওয়া হোকথ ‘মুছে যাক সব গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ তবে দুঃখজনক বাস্তবতা যে, বাঙালির নববর্ষ উৎসবকে ঘিরে মৌলবাদী আস্ফালন এখনো তীব্র। এ অশুভ শক্তিই ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে পহেলা বৈশাখে বোমা হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছিল। আজকের দিনে আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই। দেশ থেকে অপশক্তির মূলোৎপাটন ঘটিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ে তুলুন। সেই সঙ্গে প্রগতিশীল প্রত্যেকের কাছে আহ্বান জানাই, মনুষ্যত্বের পক্ষে মেধা, মনন ও শক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়ান। গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করুন। সংকীর্ণ ক্ষুদ্র স্বার্থ ও আত্মস্বার্থ যেন পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন থাকুন। পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।
বঙ্গাব্দের এই শুভ দিনে আমরা দেশবাসীকে শুভকামনা জানাই। নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাই অগণিত পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের। নববর্ষের সূর্যোদয়ে নতুন সম্ভাবনা সবুজ পাতার মতো অঙ্কুরিত হোক আমাদের জীবনে, সমাজে। এই প্রত্যাশায় স্বাগত জানাই নতুন বঙ্গাব্দকে। নতুন বছর কল্যাণ বয়ে আনুক সবার প্রাণে।