স্বপ্ন-লক্ষ্য ঠিক থাকলে সফলতা আসবেই

12
কথোপকথনে প্রয়াসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেন

গৌড় বাংলা : কোন প্রেক্ষাপটে প্রয়াস গঠনে উদ্যোগী হলেন?
হাসিব হোসেন : আপনাদের এ প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে আমি বলতে চাই, দৈনিক গৌড় বাংলা প্রয়াসকে নিয়ে ভাবছে এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ক্রোড়পত্র তৈরি করবে- এটা ভালো লাগার বিষয়। তাই এর (গৌড় বাংলা) সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো জায়গায় বিভিন্ন ইস্যুতে বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করার সাহস জুগিয়েছে একমাত্র দৈনিক গৌড় বাংলা। এজন্য অবশ্যই তারা সাধুবাদ পাবার যোগ্য।
এবার আসছি আপনাদের প্রশ্নের উত্তরে। প্রয়াস মূলত চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় একটি সংগঠন এবং এর জন্ম চাঁপাইনবাবগঞ্জেই। প্রথমে এর নাম ছিল ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সংস্থা’। পরবর্তীতে এটি ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি’ হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাথে তুলনা করলে উত্তর-পশ্চিমের তৃণমূল পর্যায়ের জেলাশহর চাঁপাইনবাবগঞ্জ; যেখানে স্থানীয় উদ্যোগে সামাজিক কাজ করা বা কিছু মানুষের উন্নয়নে স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়াসের আগে অন্য কারো ছিল না বললেই চলে। ১৯৯৩ সালে প্রয়াসের জন্ম হয়। তার আগে প্রয়াসের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সেবামূলক কাজ অনেক আগে থেকেই পরিচালনা করে আসছিলাম।
১৯৮৮ সালে যখন সারা বাংলাদেশে বন্যা হয়, যেখানে ঢাকাসহ অনেক অঞ্চল ডুবে গিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে এই অঞ্চলে মানুষের কথা চিন্তা করে প্রয়াস গঠনের কথা ভাবা হয়েছে। এর সাথে সাথে সাংগঠনিক যে ম্যান্ডেট ছিল, সেখানে সারা বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে প্রয়াস গঠন করার চিন্তা করা হয়েছে, যা গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে।

গৌড় বাংলা : প্রয়াসের শুরুর পথচলা সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?
হাসিব হোসেন : শুরুর দিকের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এককভাবে আমাকে লিড করতে হয়েছে। অন্যদেরকে বোঝাতে হয়েছে, কমিটিকে বোঝাতে হয়েছে যে, এটি তৈরি করলে এখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ নাই, কিন্তু এটি করলে কমিটি জনস্বার্থে কাজ করার সুযোগ পাবে। স্থানীয় মানুষের যে আর্থিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন বা মানবিক গুণাবলি তৈরি করা কিংবা বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে বোঝাতে সক্ষম হই। যার ফলে কিছু সহযোগী মানুষ, যারা এলাকার উন্নয়ন চায় জনস্বার্থে কাজ করতে চায়, তারা সংগঠিত হয়।
বেলেপুকুরের হোসেন ভিলাতে ছোট ৮ বাই ৮ ফিটের একটি ঘরে বসে প্রথম প্রয়াসের কাজ শুরু। যেখানে ১টা টেবিল, ৪টা চেয়ার ছিল। আমার মা ইরানী আখতার মাহফুজা আরা হোসেন প্রথম এই চারটা চেয়ার আমাদেরকে দিয়েছিলেন। আর টেবিলটি ছিল আমার ভাইয়ের পড়ার টেবিল। যারা আমাদের সহকর্মী ও কমিটির লোক ছিলেন, তারাও উৎসাহ দেয়ার জন্য এখানে আসতেন, কথা বলতেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতেন। এই পথচলা শুরু করতে গিয়ে দেখা যায় যে, মাঠে কী ধরনের কাজ করব; তারই প্রেক্ষিতে আমরা রাতে বয়স্ক স্কুল শুরু করলাম। এর পাশাপাশি ননফরমাল প্রাইমারি এডুকেশন নিয়ে কাজ করি। এর পাশাপাশি কিছু কিছু সমিতি গঠন করি।
আমরা ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করি। এর আগে থেকে মাঠের সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিল এবং আমরা মানুষের প্রয়োজনটা বোঝার চেষ্টা করেছি, মানুষের সামর্থ্য বোঝার চেষ্টা করেছি। এছাড়াও অন্যরাও মাঠে কী ধরনের কাজ করছে, সেটা জানার চেষ্টা করেছি। তারপর আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে প্রকল্প হাতে নিয়েছি। সেই সময় জনাব নজরুল ইসলাম নামে একজন জেলা প্রশাসক ছিলেন। আমরা তাকে নিয়ে নাধাইয়ের সাঁওতাল পাড়ায় গিয়েছিলাম। সেখানে সাঁওতালরা মাননীয় জেলা প্রশাসককে তীর-ধনুক উপহার দিয়েছিল। এছাড়াও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অর্থাৎ নৃত্য দিয়ে জেলা প্রশাসককে বরণ করে নিয়েছিল। আমরা কিন্তু ওই নাধাইয়ের সাঁওতাল পাড়ায় প্রথম কাজ শুরু করেছি। সেই সময় নাধাই ছাড়াও গোবরাতলা ইউনিয়নের দেলবাড়ী, গনসাপাড়া, আমারক অঞ্চলে যে সাঁওতাল রয়েছে, তাদের সাথে কাজ শুরু করেছি।

গৌড় বাংলা : এমনকি কেউ ছিল, যার সহযোগিতা ছাড়া প্রয়াস গঠন করা সম্ভব হতো না বলে মনে করেন?
হাসিব হোসেন : আমি তো মনে করি আমার মা। প্রথমে আমার মা-ই আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যা পারিস কর, সাথে আছি। পাশাপাশি আমার বাবাও আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। আমার বাবা ও ছোট ভাই জেনারেল কমিটিতে ছিল। সেসময় আমার সহধর্মিণীও সাথে ছিল। এদের সহযোগিতা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। আমার সহধর্মিণী মাঠপর্যায়ে আমার সাথে থেকে বিভিন্ন কাজে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, তখন আমার কোনো ইনকাম ছিল না। তাই সে সময় যে মানসিক সহযোগিতাটা দরকার ছিল, সেটা আমার পরিবারের সবাই আমাকে দিয়েছিলেন। তখন তারা আমাকে বলেছিল, তোমার কাছে আমাদের কোনো চাহিদা নাই; তুমি তোমার মতো সামনের দিকে এগিয়ে যাও।

গৌড় বাংলা : আপনি যে সময় প্রয়াস প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন তো আপনার সুযোগ ছিল অন্য কোথায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার? সেই জায়গা ছেড়ে প্রয়াসকে বেছে নেয়ার কারণ বা প্রেরণাটা কোথায় পেলেন?
হাসিব হোসেন : ছোট থেকে প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার সাথে আমার চেতনা জড়িত ছিল। প্রগতিশীল বলতে সব সিচুয়েশনের সাথে কোঅপ্ট করা এবং মানুষের জন্য কাজ করা, পেছনমুখী চিন্তা না করে সামনে এগিয়ে চলা। সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত থাকাটা আমার ছাত্রজীবন থেকেই ছিল। তাছাড়া আমার পাড়ার যারা বড়ভাই ছিলেন, তারা প্রগতিশীল চিন্তাধারার লোক ছিলেন। একসাথে বসে রেডিওতে আকাশবাণী, বিবিসি, বাংলাদেশ বেতার শুনতাম। একাত্তরে বডভাইয়েরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একসাথে বসে শুনেছেন। বেলেপুকুরের যারা প্রগ্রেসিভ মনের ছিলেন, তাদের সাথে আমার একটা সখ্যতা ছিল। বিধায় এই জায়গাগুলোতে কাজ করার কথা মাথায় আসে।

গৌড় বাংলা : প্রয়াসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কি কোনো বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে?
হাসিব হোসেন : দেখেন, কোনো কিছুই বাধা ছাড়া হয় না। এই বাধা বাইরে থেকে আসতে পারে, আবার ভেতর থেকেও আসতে পারে। তবে ভেতর থেকে অর্থাৎ পরিবার থেকে সেই ধরনের কোনো বাধা পাইনি। অবশ্য এটা পরিচালনা করতে গিয়ে অনেকের তাচ্ছিল্যের স্বীকার হয়েছি। অনেকেই বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। আবার কমিটির মধ্যেই অনেকেই বলেছেন যে, এটা অর্থ উপার্জনের একটি বড় জায়গা। এইসব জায়গা থেকে বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছি। আবার তাদেরকে বুঝিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে গেছি।

গৌড় বাংলা : আপনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, লক্ষ্যও ছিল- সেসবের বাস্তবায়ন কি পুরোটা হয়েছে নাকি আরো কিছু বাকি আছে?
হাসিব হোসেন : একটা স্বপ্ন এখনো ভালো লাগে। তাহলো, শুরুর দিকে কেউ ছিল না, কোনো কর্মীও ছিল না। তখন আমি নিজে মাঠে কাজ করেছি। সেসময় আমার বাবার একটা পুরোনো সাইকেল চালিয়ে কাজ করেছি। আমার বাবার একটা ভাঙাচোরা মোটরসাইকেল ছিল, সেটা নিয়েও কাজ করেছি। সেই সাইকেল চালাতে গিয়ে আমি অ্যাক্সিডেন্টও করেছি। সেই সময়ের সহর্র্কমীরা আমাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে, আবার হাসপাতাল থেকে বাসায়ও নিয়ে এসেছে।
সেই সময়ে প্রয়াসের তেমন কোনো কর্মী না থাকলেও এখন প্রায় লক্ষাধিক পরিবারের সাথে প্রতি সপ্তাহে কাজ করছি। প্রয়াসে এখন স্থায়ী, অস্থায়ী, স্বেচ্ছাসেবক মিলিয়ে প্রায় ২-৩ হাজার লোক কাজ করছে। স্থায়ী কর্মী রয়েছে ৮শ’র উপরে। এগুলো একেকটা অর্জন। এখন আমরা শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই কাজ করি না, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইস্যুভিত্তিক কাজের ডাক পড়লে কাজ করছি। আগামীতেও ডাক পড়লে আমরা কাজ করব। সরাসরি অফিস নিয়ে রাজশাহী-রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জায়গাতে কাজ করছি, এটা একটা অর্জন বা এটা একটা স্বপ্ন।
আমি যেটা বিশ্বাস করি, তাহলো মানুষের সামাজিক চাহিদা সবসময় পরিবর্তনশীল। এখন যে চাহিদা, কিছুদিন পর সেই চাহিদা আবার নতুন একটা পরিবেশ তৈরি করে এবং মানুষের গতি পরিবর্তন করে আরেকটা চাহিদার সৃষ্টি করে। তবে প্রাথমিক যে চাহিদাটা ছিল, সেটা হয়তো পূরণ হয়েছে; কিন্তু মনের মতো করে সবকিছু যে পাওয়া, সেটি হয়তো হয়নি।

গৌড় বাংলা : গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রয়াস কতটুকু ভূমিকা রাখতে পেরেছে বলে মনে করেন?
হাসিব হোসেন : আমরা যে সদস্যদের সাথে কাজ করি, তাদের কিন্তু মাসিক আয় অনেক কম। আমি তো নিজেই ৫ টাকা নিয়ে বাজারে গিয়েছি। এটা দিয়েই ব্যাগভর্তি করে বাজার নিয়ে এসেছি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই, তখন বাবার কাছ থেকে ৩০০ টাকা নিয়ে গেছি। সেসময় অতিদরিদ্র যে মানুষগুলো ছিল, তাদের ইনকাম হয়তো মাসিক ৫০০ বা ১০০০ টাকা ছিল। আমরা শুরুর দিকে ৫০০ টাকা ঋণ দিয়েছি। আর এখন কাউকে কাউকে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও প্রাইমারি পর্যায়ে ৩০-৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে অনেকে কাজ শুরু বা তার নরমাল চাহিদাগুলো পূরণ করছে। অর্থনৈতিক বা সামাজিক মর্যাদা আনতে পারে এমন যে চাহিদাগুলো তারা (সদস্যরা) পূরণ করছে। যেমন তারা এই ঋণ নিয়ে একটি স্যানিটারি টয়লেট স্থাপন করছে বা নিরাপদ পানি পান করছেÑ এটা কিন্তু আমরা পূরণ করতে পেরেছি।
আমাদের যে ১ লাখ পরিবার আছে, তাদের প্রত্যেকের যদি ৬ জন করে সদস্য হিসাব করি, তাহলে আমরা প্রায় ৬ লাখ মানুষের সাথে কাজ করছি। এই বিষয়গুলো হচ্ছে আমাদের জন্য এক ধরনের সফলতা।

গৌড় বাংলা : ৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করলেন, আর এখন ৩০ লাখ পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছেন। হিসাব করলে তো তা প্রায় ৬০০০ গুণ…
হাসিব হোসেন : ঠিকই বলেছেন। এখন হাজার হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে প্রথমে আমরা যখন ৫০০ টাকা দিতাম, তখন খেয়াল করতাম যে সেটা ওভারল্যাপিং হচ্ছে কিনা। কিন্তু এখন মানুষের চাহিদা বাড়ছে। একসাথে বিভিন্ন জায়গা থেকে সে ঋণ নিয়ে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ একটা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একজনের সম্পূর্ণ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

গৌড় বাংলা : ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি প্রয়াসের অনেক সামাজিক কার্যক্রম চোখে পড়ার মতোÑ এসব বিষয়ে কিছু বলবেন কী?
হাসিব হোসেন : আমরা ভিক্ষুক পুর্নবাসন, নবীন-প্রবীণ ও নারী-শিশুদের সাথে কাজ করেছি। এমনও হয়েছে একজনের অন্য জ্ঞান নাই, কিন্তু তার কৃষিতে অভিজ্ঞতা আছে; সেখানেও আমরা কাজ করেছি। এছাড়াও আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আর্সেনিক, ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, ননফরমাল প্রাইমারি এডুকেশন, রাইট বেজ বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ করেছি। প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি বিভিন্নমুখী কাজের সাথে যুক্ত হয়েছে। প্রয়াস নিরাপদ আম নিয়েও কাজ করছে। অর্গানিক ফুড নিয়েও কাজ করছে।
এছাড়া স্থানীয় উদ্যোগ সৃষ্টি, ই-কমার্স, আইটি, তথ্যপ্রবাহের জন্য একটি কমিউনিটি রেডিও, রেডিও মহানন্দাও আছে আমাদের। একটা কালচারাল টিম প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে আমরা মানুষের তথ্যের বিকাশ বা সরবরাহে কাজ করছি। আমরা জলবায়ুর প্রতিঘাত নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি। জলবায়ুর যে প্রতিঘাত, সেটা থেকে বের হয়ে সেটার সাথে কোঅপ্ট করে কিভাবে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এবং তার অর্থনৈতিক শক্তিকে ধরে রাখা যায়, তার জীবন প্রবাহকে সুন্দর করা যায়, সে জায়গাগুলোতে আমরা কিছুটা হলেও কাজ করার চেষ্টা করছি। আমরা জেলার স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন ঘটাতে প্রয়াস হসপিটাল তৈরি করেছি। এর বাইরেও আমরা সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্ট, স্মার্ট প্রজেক্টের মাধ্যমে নিরাপদ আম উৎপাদনের কাজ করছি। আম শুষ্ককরণ বা আমের ভ্যালুচেইনে কাজ করছি। আমরা লাইভস্টক, কৃষি ও মৎস্য সেক্টরে কাজ করছি। আর এগুলোর জন্য আমাদের দক্ষ কর্মী বাহিনী আছে।

গৌড় বাংলা : বর্তমানে তো প্রয়াসের ৭১টি শাখা আছে। এখানে প্রায় ১-২ হাজার কর্মী আপনার ওপর নির্ভরশীল এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
হাসিব হোসেন : প্রতি মাসের শেষে আমার মাথায় একটা চাপ থাকে যে, সবাই ঠিকমত বেতন পাচ্ছে কিনা সেটা নিশ্চিত করা। সেটা আমাদের কর্মীরাই আয় করে। সকলের বুদ্ধি দিয়েই আমাদের সে আয় করতে হচ্ছে। সেখান থেকে তার বেতন নিতে হচ্ছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক যে চাহিদা, সেটাও পূরণ করতে হচ্ছে। এছাড়া সময়ের সাথে সাথে তাদের বেতন বৃদ্ধি করা, প্রোগ্রাম তৈরি করা, ইনভেস্ট করা এগুলোতে আমাদের কাজ করতে হয়। এগুলো চিন্তার বিষয় সবসময় থাকে। সেখানে অনেকেই ব্যর্থ হয়। তারপরও আমরা এখন পর্যন্ত সফল আছি। সেখানে আমার বিশ্বাস যে, আমার সহকর্মীরা বা আমরা যদি সেটা ‘আমি’ হিসেবে বিবেচনা না করি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা সেখানে সফল হবো।
বলতে পারি, এখন পর্যন্ত এই চিন্তাধারা আমরা ধরে রেখেছি। আমার বিশ্বাস, এত বড় পরিবার এত সহজে ভেঙে পড়বে না। আমি ভুল করলেও আমার ভুলটা কেউ না কেউ ধরিয়ে দিবে এবং আমাকে সঠিক পথে যেতে সহায়তা করবে।

গৌড় বাংলা : শূন্য থেকে শুরু করে আজ ১-২ হাজার কর্মীর দায়িত্ব আপনার ওপরÑ এ নিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকে কিছু বলবেন?
হাসিব হোসেন : আমি তো বলি যে, প্রথমে ১৫০ টাকা বেতন দিয়েছি আর এখন একজনকেই আড়াই লাখ টাকা বেতন দিচ্ছি। সেটি গর্বের জায়গা। আর এই সক্ষমতা তৈরি হয়েছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির। আমার দায়িত্ব আমি কতটুকু পালন করতে পেরেছি, সেটা আমার কর্মীরই মূলায়ন করবে। সেখানে আমার এই কাজকে কেউ সমালোচনা করতে পারে, আবার কেউ সাধুবাদ দিতে পারে। এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কেউ পাশে দাঁড়াতে পারে, আবার কেউ কাঁটা হয়েও সামনে আসতে পারে। এগুলো থাকবে, এগুলোকে মোকাবিলা করেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
ভালো লাগার জায়গা হলো শূন্য থেকে ১-২ হাজার হয়েছে। এ নিয়ে সন্তুটি থাকবেই, আবার সেই সাথে আকাক্সক্ষাও থাকতে হবে। অর্থাৎ স্বপ্ন এবং লক্ষ্য ঠিক থাকলেই সফলতা আসবেই। তবে ১ হাজারকে ২ হাজার করতে না পারলে গতিশীলতা থাকবে না।

গৌড় বাংলা : স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রয়াস শুরু করার। এখন ৩০ বছর পর আবার কোন স্বপ্নটা দেখেন বা প্রয়াসকে কোন অবস্থানে দেখতে চান?
হাসিব হোসেন : আমি প্রত্যাশা করি, প্রয়াস সারা বাংলাদেশে কাজ করুক। সারা বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের অবহেলিত অনেক দেশ আছে, সেখানেও কাজ করুক প্রয়াস। আমি নিজে এবং আমার অনেক কর্মী প্রয়াসের হয়ে বিদেশে গিয়েছে, সেটি গর্বের জায়গা।

গৌড় বাংলা : প্রয়াসের ৩১তম জন্মদিন উপলক্ষে কোনো বার্তা…
হাসিব হোসেন : আমার সহকর্মীরা সবসময় পজিটিভ ভাবুক। নেগেটিভটা যেন তাদের গ্রাস করতে না পারে। ব্যর্থতা থাকতে পারে; কিন্তু ব্যর্থতা জয় করার সক্ষমতা প্রত্যেকটা মানুষের আছে, সে যেন নিজেকে সেভাবে ভাবে। আমাদের যে লক্ষ বা আমাদের যে দায়িত্ব সেটা যেন পজিটিভ মনোভাব নিয়ে জনস্বার্থে প্রয়োগ করি। আমাদের যে নির্বাহী কমিটি, সাধারণ কমিটি, প্রশাসন, সরকার, বিভিন্ন নিবন্ধনকারী কর্তৃপক্ষ, সহযোগী যারা আছে, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তারা প্রয়াসের পাশে থাকবে, প্রয়াসকে বুঝবে এবং প্রয়াসকে পরামর্শ দিয়ে সবাই সামনের দিকে আরো সুন্দরভাবে এগিয়ে নিবে। সবার কাছে এই আশা করছি, সবাই যেন প্রয়াসের পাশে থাকে। বাংলাদেশের জনগণের পাশে থাকে। আর প্রয়াসকে নিয়ে যেন গর্ব করতে পারে।

গৌড় বাংলা : আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
হাসিব হোসেন : আপনাদেরও ধন্যবাদ।