স্থাপত্য কলার অনুপম নিদর্শন কুসুম্বা মসজিদ

311

3

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নওগাঁ জেলা বরেন্দ্রীর অংশ। সন্ধ্যাকর নন্দীর ভাষায় বরেন্দ্রী হলো ‘বসুধারাশি’ ধরিত্রীর মুকুট-মণি। তাই বরেন্দ্রীর অংশ হিসেবে নওগাঁর গুরুত্ব অনেক। এর আয়তন ১৩৩৭ বর্গমাইল। বিশালায়তন এই জেলা ধারণ করে আছে বহু পুরাকীর্তি। এই ভূখন্ড পূর্বসূরিদের ব্যবহƒত ভবন থেকে শুরু করে ব্যবহার্য জিনিসপত্র অর্থাৎ বিশেষভাবে বলতে গেলে পুরাতত্ত¦ বা প্রতœতত্ত¦ যাই বলি না কেন এসব যেমন ধারণ করে আছে ঠিক পাশাপাশি তাদের সংস্কৃতিও লালন করে যাচ্ছে। এ অর্থে নওগাঁ একটি সমৃদ্ধ জেলা। এ জেলায় অনেক প্রতœতাত্তি¦ক ও ঐতিহাসিক স্থান আছে যার অধিকাংশ পরিচিত হলেও অনেক নিদর্শনের ইতিহাস বা তথ্য আজও উদঘাটিত হয়নি। স্বচ্ছ ¯িœগ্ধ টলমল জলের দীঘির পশ্চিম পাড়ে ধূসর বর্ণের কুসুম্বা মসজিদ নওগাঁ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উজ্জ¦লতম নিদর্শন। জেলার মান্দা থানা সদর থেকে তিন মাইল দক্ষিণে নওগাঁ-রাজশাহী সড়কের পশ্চিম পার্শ্বে কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত এ মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্যকলার এক অনুপম নিদর্শন। কুসুম্বা দীঘির দৈর্ঘ ১২৫০ ফুট এবং প্রস্থ ৯০০ ফুট। এর পাড় অনেক উঁচু। প্রচলিত আছে যে, “দীঘির পানিতে পারদ মিশ্রিত থাকায় কচুরিপানা বা কোন আগাছা এর পানিতে জন্মাতে পারে না। কুসুম্বা মসজিদ উঁচু খিলান করা ভিতের উপর স্থাপন করা হয়েছে। সাধারণত ভূমিকম্প বা বন্যা-প্রবণ এলাকায় এভাবে ভবন নির্মাণ করা হয়ে থাকে। যার ফলে ভবনগুলি বেশীদিন টিকে যায়। সম্ভবত কুসুম্বা মসজিদও এই নির্মাণ কৌশলের জন্য আজও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। জানা গেছে সবর খান বা সোলায়মান নামে জনৈক ধর্মান্তরিত মুসলমান এ মসজিদ নির্মাণ করেন। এর প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে মানুষের মনে সংশয় থাকলেও মসজিদটির কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের শিলালিপি থেকে প্রমান মেলে এই মসজিদ ৯৬৬ হি বা ১৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দে শেরশাহের বংশধর আফগান সুলতান প্রথম গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের শাসনামলে (১৫৫৪-৬০) নির্মিত। বাংলার স্থাপত্য বিশেষ করে গৌড়ীয় স্থাপত্য রীতিতে কুসুম্বা মসজিদ নির্মিত হয়েছে। সমচতুষ্কোণ মসজিদটির ছাদ, বাংলার কুঁড়েঘরের চালার মতো ঈষৎ ঢালু। বহু গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদ দৈর্ঘ্যে ৫৮ ফুট এবং প্রস্থে ৪২ ফুট। নামাজ কক্ষের অভ্যন্তরভাগে দুটি পাথর স্তম্ভ ৬টি সমআকৃতির পরিসর সৃষ্টি করেছে। মসজিদের এ দুটি স্তম্ভের উপরিভাগে সুন্দরভাবে খোদাই করা বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলান আছে যা মুসলিম নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে। কুসুম্বা মসজিদে দুসারিতে ৬টি ছোট অর্ধগোলাকৃতি গম্বুজ আছে। গম্বুজগুলোর কোন ভিত্তিবেদী নেই, যেন ছাদের উপর গুড়ি মেরে বসে আছে। তবে সমচতুষ্কোন মূল কক্ষে অবস্থিত স্তম্ভ দুটির উপরেই এ গম্বুজ গুলোর ভার ন্যাস্ত। কুসুম্বা মসজিদ মূলত ইটের তৈরী। ইটের দেওয়ালের ভেতর ও বাইরে এমনভাবে দানাদার কালো পাথর দিয়ে আচ্ছাদন দেওয়া হয়েছে যে দেখে মনে হবে মসজিদটি পাথরের তৈরী। মসজিদের চার কোণায় চারটি মিনার আছে। প্রতিটি মিনার কারুকার্যময় রেখার দ্বারা একাধিক স্তরে বিভক্ত। যদিও মিনারের চূড়াগুলো অনেক আগেই ভেঙ্গে গেছে। কুসুম্বা মসজিদের পশ্চিম দেওয়ালে সুন্দরভাবে খোদাই করা কালো আগ্নেয় প্রস্তরের তিনটি মেহরাব আছে। মধ্য মেহরাবের ডান পাশ ঘেঁষে আছে একটি মাত্র পাথর খন্ডে তৈরী একটি বড় মিম্বার। মসজিদের ভিতরে উত্তর পাশে উঁচু মঞ্চ আছে। এটাকে জেনানা গ্যালারি বলা হয়েছে। গ্যালারিতে উঠার জন্য পাথরের সিঁড়িও আছে। মসজিদের পূর্ব দিকে আছে ছুঁচালো খিলান বিশিষ্ট ৩টি প্রবেশ পথ। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি করে পাথরের ঝাঁঝরি বা গ্রীল করা জানালা আছে। মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ কেন্দ্রীয় মেহরাবের চিত্তাকর্ষী খোদাই কারুকার্য। শিল্প সুষমায় সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে মেহরাবের জন্য বাছাই করা হয়েছিল দানাদার কালো আগ্নেয় পাথর। কুসুম্বা মসজিদের মিহরাব নির্মাণ ও অলঙ্করণে স্থপতি এবং খোদাইকাররা চরম নৈপূণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। মসজিদের তিনশত গজ পশ্চিমে সোনাবিবির মসজিদ নামে একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আছে। দক্ষিণপাশে মাদ্রাসা ঘরের পেছনে পাথরের একটি নিচু ফটকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যা থেকে অনুমান করা হয় যে, পাশে একটি প্রাসাদ বা দূর্গ জাতীয় ইমারত ছিল। এ মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকার প্রবর্তিত পাঁচ টাকার নোটে কুসুম্বা মসজিদের ছবি ছাপানো হয়েছে। প্রতিদিন দূরদƒরান্ত থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মুসলিম এমনকি ভিন্নধর্মাবলম্বীরাও এখানে আসেন তাদের মনের ইচ্ছার পূর্ণতা চাইতে এবং নিজেদের হীন কর্মের জন্যে অনুতপ্ত হয়ে পরম করুণাময়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনায় মগ্ন হতে। বিশেষ করে শুক্রবার এ মসজিদে পূণ্যপ্রার্থীদের আগমন দৃশ্য অবর্ননীয়।