সুঁই-সুতোতেই ‘জয়িতা’ হয়ে উঠলেন সংগ্রামী লিমা

219

শাহরিয়ার শিমুল

প্রথম সেলাই প্রশিক্ষণ প্রয়াসের হাত ধরে

অনেকেই আছেন, যারা দেশের ঐতিহ্যকে ভালোবাসেন। দেশের ঐতিহ্যের মিশেলে কোনো পণ্য হাতে এলেই প্রশান্তি অনুভব করেন তারা। আর এ অনুভবকে কর্মে রূপান্তর করা গেলে নিজের ভালো লাগার জায়গাটা আরো গাঢ় হয়। ঐতিহ্যের অনেক উপাদান আছে। তার মধ্যে একটি বলা যায়, সুঁই-সুতার গল্প।
আর এই সুঁই-সুতাতেই ভর করে সফল হয়েছেন এক নারী। তিল তিল করে এগিয়ে আজ হয়ে উঠেছেন ‘জয়িতা’। হয়ে উঠেছেন অন্যের জন্য প্রেরণা। কাঁথা সেলাই করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। অদম্য ইচ্ছা আর প্রবল আকাক্সক্ষার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। শূন্য থেকে শুরু করে হয়েছেন সফল উদ্যোক্তা। এই উদ্যোক্তা আর কেউ নন, তিনি হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের হুজরাপুর এলাকার লিমা খাতুন।
লিমা খাতুনের গল্পটা আর দশজন থেকে আলাদা। বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সেই। তবে প্রতিভা ছিল তার। আর এ প্রতিভার জেরেই নিজে কিছু করতে চেয়েছিলেন সবসময়, সেই ছোট অবস্থা থেকেই। স্কুলে পড়া অবস্থাতেই সেলাই প্রশিক্ষণ নেন লিমা। প্রশিক্ষণ নেন উন্নয়ন সংস্থা “প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি” থেকে।
এরপর জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন কুশন কভার তৈরির মধ্য দিয়ে। লিমা খাতুন জানান, সেলাই প্রশিক্ষণ নেয়ার পর ঢাকার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে কুশন কভার তৈরির প্রথম অর্ডার পেয়েছিলেন। এর জন্য বিনিময়ে প্রতি কুশন কভারে পেতেন ২০০ টাকা। তিনি বলেন, আমার তৈরি কুশন আশপাশের অনেকেরই ভালো লাগে এবং একটি দুটি করে বানানোর অর্ডার পেতে থাকি।
সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটা এরকমই লিমা খাতুনের। কুশন দিয়েই শুরু। এখন সাধারণ কাঁথা থেকে নকশি কাঁথা পর্যন্ত সেলাইয়ের অভিজ্ঞতা তার। যার কাছ থেকে প্রথম কুশনের অর্ডার পেয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তীতে লিমার কাছে বুটিকস, হাতের তৈরি নকশি কাঁথাসহ বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার দিতে থাকেন।
এভাবেই কেটেছে বেশ কয়েকটা বছর। এর মধ্যে দারিদ্র্যও দূর হয়েছে লিমার জীবন থেকে। এরপর স্বপ্ন দেখেন নিজের প্রতিষ্ঠান খোলার। আর ৮-৯ বছর আগে সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন তিনি। শহরের হুজরাপুর এলাকায় গড়ে তুলেন নিজের মালিকানাধীন ‘স্বপ্ন নকশী কর্ণার’। যেখানে একসময় নকশিকাঁথাই ছিল মূল পণ্য। এখন ২৯ ধরনের পণ্য বিক্রি হয় এ প্রতিষ্ঠান থেকে।
লিমা খাতুন নিজে স্বাবলম্বী হয়ে থেমে থাকেন নি। প্রসার বেড়ে যাওয়ায় স্বামী আরিফ হোসেনকে তার কাজ থেকে ছাড়িয়ে এনে স্বপ্ন নকশি কর্নারে যুক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি গ্রামের হতদরিদ্র নারীদের কাঁথা তৈরির কাজ শিখিয়ে তাদেরকেও স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। অনেক যুব সদস্য তার পণ্য নিয়ে অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করেও স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
একজন দক্ষ কাঁথাশিল্পী হিসেবে এলাকায় তার রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। হুজরাপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষ এক নামে ‘কাঁথা লিমা’ হিসেবেই তাকে চেনে।
কাঁথায় বাহারি আর নতুন ডিজাইনের সেলাইয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন ভিন্ন সব দৃশ্য। প্রতিটি কাঁথাই ভিন্ন ডিজাইনের। কাঁথায় সুইয়ের প্রতিটি ফোঁড়ের সঙ্গে মিশে আছে লিমার জীবনের গল্প। আর এই জন্যই হয়তো সুঁই-সুতার সাথে লিমার অকৃত্রিম মিতালী। উচ্চ মাধ্যমিক পাস এই সংগ্রামী নারী ব্যবসার পাশাপাশি স্বামী, তিন সন্তানের সংসারও সামলাচ্ছেন নিপুণভাবে।
লিমা খাতুনের জীবনের গল্প শুনতে যাওয়া হয় স্বপ্ন নকশি কর্নারে। ২০২১ সালে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার পাওয়া লিমা জানান, আগে বাড়িতে বসেই কাঁথা তৈরি করে বিক্রি করতেন। ৮-৯ বছর আগে বাড়ি-সংলগ্ন মার্কেটে ‘স্বপ্ন নকশী কর্নার’ চালু করেন। শোরুমে নকশি কাঁথাসহ ২৯ রকমের আইটেম আছে। তিনি বলেন, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি থেকে ঋণ নিয়ে আমি আমার প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করিয়েছি। অল্প অল্প করে ঋণ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় করেছি। শোরুমে ৫ জন, কারখানায় ৩০ জন নারী কর্মরত রয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে ৩৫০ জন নারীকে নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
স্বপ্ন এখন আরো বৃহৎ পরিসরে তার প্রতিষ্ঠানকে মেলে ধরার। লিমা খাতুন বলেন, আমার এই পণ্যগুলো বিদেশেও রপ্তানি করতে চাই। প্রতিষ্ঠানকেও আরো বড় করতে চাই। এজন্য অর্থের প্রয়োজন। কোন প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সহায়তা পেলে তিনি আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
লিমা খাতুন বলেন, আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ১৫০০ নারীকে নকশি কাঁথার প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এমনকি জেলখানায় যেসকল কয়েদি রয়েছে, যারা মাদকের সাথে জড়িত ছিল, বর্তমানে তারা আমার প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন।
কথা হয় স্বপ্ন নকশি কর্নারে কর্মরত নিপার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি এখানে প্রায় ৮ বছর যাবত কাজ করছি। এখানে কাজ করে যে আয় করি তা দিয়ে পরিবারের অনেক উপকার হয়। স্বামীর ব্যবসাতেও কিছু টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতে পারছি।
আরেক কর্মী আঞ্জুয়ারা খানম বলেন, প্রায় ৩ বছর যাবত এখানে কাজ করছি। স্বামী নেই, এখান থেকে যে টাকা আয় করি তা দিয়ে সন্তান নিয়ে ভালোই আছি।
লিমা খাতুন প্রথমে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির সহযোগিতায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এরপর বিডা, পিকেএসএফ হতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। বর্তমানে নকশি শিল্পের একজন দক্ষ প্রশিক্ষক তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জেলখানা, এতিমখানা, জাইকা প্রজেক্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।
নকশি কর্নারের ডালপালা বিস্তৃত করার স্বপ্ন দেখছেন লিমা। তার প্রতিষ্ঠানের পণ্য পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখতে চান তিনি। লিমা খাতুন তার এ কর্মসাফল্যের জন্য আমের রাজধানী খ্যাত প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।