সিলেটের মায়াময় মায়াবন

129

2প্রকৃতির শোভায় অপরূপ সিলেট। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তর এই জনপদের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে সীমাহীন সৌন্দর্য। প্রকৃতিপ্রেমী কিংবা সৌন্দর্য পিপাসুদের পছন্দের সিলেটে আরেকটি মনকাড়া স্থান ‘মায়াবন’। সিলেটে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো স্পটই গোয়াইনঘাট উপজেলায়। এখানে রয়েছে বিছনাকান্দি, জাফলং, পাংথুমাই, রাতারগুলের মতো পরম সৌন্দর্যের সব লীলাভূমি। এবার ওই এলাকার আরেক মায়াময় সৌন্দর্যপুরীর ‘খোঁজ’ মিলেছে। আর সেটাই হচ্ছে ‘মায়াবন’। যা এতোদিন চোখের আড়ালেই ছিল। স্থানীয় লোকজন এর খোঁজ জানলেও বাইরের লোকজনদের কাছে ‘মায়াবন’ ছিল সম্পূর্ণ অজানা। গোয়াইনঘাটের আলীরগাঁও ইউনিয়নের জুগিরকান্দি এলাকায় এই ‘মায়াবন’। স্থানীয় লোকজনই আশ্চর্য সুন্দর এই নামকরণ করেছেন। চারদিকে থই থই পানি। হরেক পাখির কলতান। এরই মাঝে ভাসমান সবুজ বন ‘মায়াবন’। জলাভূমির মধ্যে কোমর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য হিজল, বরুণ, করচ, জামসহ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ। বৃক্ষরাজি দ্বারা সুশোভিত ঘন এই বনের অনেকস্থানেই গাছগাছালি ভেদ করে সূর্যালোক পৌঁছতে পারে না। প্রায় হাজার একর ভূমিজুড়ে অবস্থান মায়াবনের। ভরা মৌসুমে পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত হয় এ বন। তবে প্রায় সারাবছরই জলের মধ্যে ডুবে থাকে এ বনের বৃক্ষমূল। সৌন্দর্যের মায়াপুরী এই বনে মাছরাঙ্গা, বক, ঘুঘু, ডাহুক, দোয়েল, ফিঙে, বালিহাঁস, টুনটুনি, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির রঙ-বেরঙের পাখপাখালি নির্বিঘেœ অভয়ারণ্যের মতোই ঘুরে বেড়ায়। অন্যদিকে মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, উদবিড়াল, শেয়াল, সাপ, গুইসাপসহ বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণীরও প্রাচুর্য এখানে। ছোট ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে মায়াবনের মায়ার রাজ্যে হারিয়ে যাবার আনন্দটাই আলাদা। নিঃশব্দ প্রকৃতিতে ডিঙ্গির দোলায় দুলতে থাকা মনকে ভরিয়ে দিতে জুড়ি নেই এই মায়াবনের। রূপের মায়াবী ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে রাখা মায়াবনে চোখের সামনে হাতবাড়ানো দূরত্বে দেখা মিলবে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখপাখালির। স্বচ্ছ জলের উপর বৃক্ষরাজির প্রতিচ্ছায়া আর ডিঙ্গির হালকা দোলায় যে আবহ তৈরি হবে, তা কেবল এই মায়াবনেই সম্ভব। মায়াবনের উত্তরে রয়েছে সারি ও পিয়াইন নদীর মিলনস্থল। এখান থেকে নৌকা দিয়ে জাফলং, লালাখাল, রাতরগুল ঘুরে আসা যায়। বনের দক্ষিণে রয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে কাশবন, পূর্বে কুরুন্ডি ও রৌয়া বিলে শাপলা ও পদ্ম ফুলের সমাহার। মায়াবনের পশ্চিমে আছে দেশের অন্যতম বিশাল মূর্তা বাগান। সিলেট থেকে তামাবিল মহাসড়ক হয়ে ৩৭ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছতে হয় সারিঘাটে। সেখান থেকে আরো ৮ কিলোমিটার পেরিয়ে বেখরা ব্রিজ সংলগ্ন স্থানে গিয়ে ভাড়ায়চালিত ছোট ডিঙ্গিতে চড়তে হয়। বেখরা খাল দিয়ে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শুনে আর দু’ধারের সবুজ প্রকৃতি দেখতে দেখতে মিনিট দশেকের মাথায় পৌঁছে যাওয়া যায় মায়াবনে। মায়াবনের মায়ায় যারা সেখানে ছুটে যেতে চান, তাদেরকে বনের আপন পরিবেশের বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত। বনের মধ্যে কোনোভাবেই উচ্চশব্দ করা যাবে না। কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনা, খাবারের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন, প্লাস্টিক এসব ফেলা যাবে না বনের মধ্যে।