সাড়া ফেলেছে ‘ম্যাংগো স্পেশাল’ ট্রেন

43

ভরা মৌসুমে ট্রেনের মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে আম পরিবহনের সরকারি উদ্যোগ, এবার রাজশাহী অঞ্চলের চাষি ও ব্যবসায়ীদের নতুনভাবে উজ্জীবিত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ উদ্যোগ আম পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এরই মধ্যে স্থানীয় আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা এর সুফল ভোগ করছেন। আমের রাজধানী খ্যাত উত্তরের শেষ সীমান্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এখন প্রতিদিনই রাজশাহী হয়ে রাজধানী ঢাকায় চলে যাচ্ছে নানান জাত ও নামের সুমিষ্ট রসালো সব আম। ১৪টি স্টপেজ দিয়ে প্রথমবারের মতো এই রুটে চলাচলকারী ‘ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন’ তাই আশাজাগানিয়া সাফল্য পেয়েছে বলেই মনে করছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এটি রেলওয়ের পণ্য পরিবহনের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বুকিং শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর তিন সপ্তাহ অতিবাহিত করতে যাচ্ছে রাজশাহীর ‘ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন’। চাঁপাইনবাগঞ্জ-রাজশাহী-ঢাকা রুটের এই ট্রেনটিতে আম ছাড়াও কৃষিজাত পণ্য ও অন্যান্য মালামালও পরিবহন করা যাচ্ছে। চালুর পর থেকে ‘ম্যাংগো স্পেশাল’ নামের বিশেষ এই ট্রেন সার্ভিসে চাষি ও ব্যবসায়ীদের আম পরিবহনে আগ্রহ বাড়ছে।
শুক্রবার এই বিশেষ ট্রেন তার চলাচলের তিন সপ্তাহ পূর্ণ করেছে। এই তিন সপ্তাহে ঢাকায় আম গেছে মোট ৫ লাখ ১০ হাজার ৪০৬ কেজি। এর মধ্যে প্রথম সপ্তাহে ট্রেনটি আম পরিবহন করে ১ লাখ ১০ হাজার ৫৩৭ কেজি। দ্বিতীয় সপ্তাহে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৮১ কেজি। এছাড়া তৃতীয় সপ্তাহে ২ লাখ ২৫ হাজার ১৮৮ কেজি আম পরিবহন করেছে। গত ৫ জুন ‘ম্যাংগো স্পেশাল’ ট্রেনটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। ট্রেনটিতে বর্তমানে রাজশাহী স্টেশন থেকে এক কেজি আম ঢাকার বিমানবন্দর, তেজগাঁও বা কমলাপুরে নিতে খরচ পড়ছে সর্বোচ্চ ১ টাকা ১৮ পয়সা। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১ টাকা ৩১ পয়সা।
গত ৫ জুন প্রথমবারের মতো বিশেষ এই ট্রেন চালুর পর অনেকেই বিষয়টি জানতেন না। তবে নামমাত্র মূল্যে আম পরিবহনের বিষয়টি সবার মধ্যে জানাজানি হওয়ার পর ব্যাপক সাড়া পড়ে গেছে। ঝামেলামুক্তভাবে সম্পূর্ণ নিরাপদে আম পরিবহনের জন্য তাই ‘ম্যাংগো স্পেশাল’ ট্রেনটি এরই মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মৌসুম শুরু আগেই আম সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাত নিয়ে গত ২০ মে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সভা হয়। ওই সভায় আম পরিবহনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী হয়ে রাজধানী ঢাকা অভিমুখে একটি বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর আগে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে রাজশাহীর আম, লিচু ও অন্যান্য মৌসুমি ফল বিপণন এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ যেন কোনো অবস্থাতেই বাধগ্রস্ত না হয় বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে গত ১৬ মে ভিডিও কনফারেন্সে সরাসরি রাজশাহীর আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক। সেদিনই ট্রেনে আম পরিবহনের কথা ওঠে। পরে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পশ্চিম রেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এই ‘ম্যাংগো স্পেশাল’ ট্রেন তারই ফসল।
‘ম্যাংগো স্পেশাল’ ট্রেনটি রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকদের আম নিরাপদে পরিবহনের ক্ষেত্রে উজ্জীবিত করেছে বলে মনে করেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (পাকশী) ফুয়াদ হোসেন আনন্দ। তিনি বলেন, এই ট্রেনে আম পরিবহনের চাহিদা ও পরিমাণ প্রতি সপ্তাহেই বাড়ছে। মৌসুমের শেষ দিকে আম পরিবহনের এই পরিমাণ আরো বহুগুণ বাড়বে বলেও তিনি আশাবাদী। ফুয়াদ হোসেন আনন্দ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ উদ্যোগের কারণে এই অঞ্চলের আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি তার সুফল পাচ্ছেন। এই পরিমাণ আম কুরিয়ার সার্ভিসে ঢাকায় পরিবহন করতে হলে ৯৯ শতাংশ খরচ বেশি পড়ত (১৫ টাকা কেজি হিসাবে)।
এদিকে, ‘ম্যাংগো স্পেশাল’ ট্রেন পণ্য পরিবহন সেবায় নতুন মাইলফলক উল্লেখ করে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক মিহির কান্তি গুহ জানান, আগামীতে ‘ম্যাংগো স্পেশাল’ ট্রেনের মতো এমন সার্ভিস তারা অব্যাহত রাখতে চান। তাহলে এই অঞ্চলের কৃষিপণ্য সহজেই রাজধানীতে পরিবহন করা যাবে। এতে রাজধানীর মানুষ সুলভমূল্যে বিষমুক্ত তরতজা কৃষিপণ্য পাবেন। আর কৃষকরাও তাদের পণ্যের ভালো দাম পাবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে আমসহ অন্যান্য পার্সেল পরিবহনের জন্য বিশেষ এই ট্রেনটি প্রতিদিন চলছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-ঢাকা ‘ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন-২’, ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ ‘ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন-১’ নামে চলাচল করছে ট্রেনটি। সাপ্তাহিক বন্ধ নেই। প্রতিদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বিকেল ৪টায় ছেড়ে যাচ্ছে। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাচ্ছে ৫টা ২০ মিনিটে। ৩০ মিনিট বিরতি দিয়ে বিকেল ৫টা ৫০ মিনিট মিনিটে ট্রেনটি আবারো ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করছে। ঢাকায় পৌঁছাচ্ছে রাত ১টায়। ঢাকা থেকে ট্রেনটি রাত ২টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে আসছে। রাজশাহী পৌঁছাচ্ছে সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে। সেখানে ২০ মিনিট থেমে ট্রেনটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌঁছাচ্ছে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে।