সাত খুন মামলায়

61

Captureনারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলায় সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামির ফাঁসির রায় দিয়েছেন আদালত। এ মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে বাকি নয়জনকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদ-। নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন গতকাল সোমবার সকাল ১০টা ৫ মিনিটে জনাকীর্ণ আদালতে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। তিন বছর আগে নারায়ণগঞ্জে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর হত্যার পর লাশ শীতলক্ষ্যায় ডুবিয়ে দেওয়ার ওই ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়। ওই হত্যাকা-ে এলিট বাহিনী র‌্যাবের কয়েকজনের জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে এলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও শিরোনাম হয়। বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন বহু প্রতীক্ষিত এ মামলার রায় ঘোষণা করতে সময় নেন মাত্র কয়েক মিনিট। আসামিদের সাজার অংশটিই কেবল তিনি পড়ে শোনান। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নূর হোসেন; ওই হত্যাকা-ের সময় র‌্যাব-১১ এর অধিনায়কের দায়িত্বে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন; লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানাসহ ২৩ আসামি রায়ের সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকি ১২ জন পলাতক রয়েছেন। রায় ঘোষণার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলামের সমর্থক এবং আইনজীবী চন্দন সরকারের সমর্থকরা আদালতের বাইরে উল্লাসে ফেটে পড়েন। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু আমরা চাই, এই রায় দ্রুত কার্যকর হোক। হাই কোর্টে যাতে এই রায় বহাল থাকে। চন্দন সরকারের মেয়ে সুস্মিতা সরকারও রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনিও বলেন, আসামিদের সাজা দ্রুত কার্যকর হোক-এটাই তাদের চাওয়া। চন্দন সরকারের পরিবারের হয়ে এ মামলা লড়েন আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান, যিনি গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এই রায়ে আমরা আনন্দিত। আমরা খুশি হয়েছি। ৩৫ জন আসামির মধ্যে সবার মৃত্যুদ- হলে আরও বেশি খুশি হতাম।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। একই সময়ে একই স্থানে আরেকটি গাড়িতে থাকা নারায়ণগঞ্জ আদালতের প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার চালককে অপহরণ করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর বন্দর উপজেলা শান্তির চর এলাকায় শীতলক্ষ্যা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাত জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রত্যেকের পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন; প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তায় বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নিহত ৭ জন হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। লাশ উদ্ধারের পর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল দুটি মামলা করেন, যার তদন্ত চলে একসঙ্গে। দুই মামলার তদন্ত শেষে নারায়ণগঞ্জের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ ম-ল। অভিযোগপত্রে বলা হয়, এলাকায় আধিপত্য নিয়ে বিরোধ থেকে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে হত্যার এই পরিকল্পনা করেন আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেন। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে র‌্যাব সদস্যদের দিয়ে ওই হত্যাকা- ঘটানো হয়। অন্যদিকে নজরুলদের অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় ঘটনাচক্রে আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালককেও হত্যা করা হয় বলে তার জামাতা বিজয় কুমার পালের ভাষ্য। আসামিদের মধ্যে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ১৭ জন এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেনের পাঁচ সহযোগীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। ঘটনার ১৭ মাস পর মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, আসামিদের মধ্যে ২১ জন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তদন্ত চলাকালে নূর হোসেন ভারতে থাকায় তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পায়নি পুলিশ। গ্রেফতার র‌্যাব সদস্যরা আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তারা জানান, অপহরণের পর সাতজনকে চেতনানাশক ইনজেকশন দিয়ে অচেতন করা হয়। পরে মুখে পলিথিন পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় শ্বাস রোধ করে। লাশগুলো শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়ার সময় ডুবে যাওয়া নিশ্চিত করতে বেঁধে দেওয়া হয় ইটের বস্তা।
জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন ২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার আসামিদের বিচার শুরু করেন। ৩৮টি কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৬৪ জনের সাক্ষ্য শোনেন আদালত; যাদের মধ্যে ৬০ জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জবানবন্দি দেন। দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে গত ৩০ নভেম্বর বিচারক ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি রায়ের জন্য দিন ঠিক করে দেন।
এদিকে এ রায় ঘিরে গতকাল সোমবার সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শফিউদ্দিন জানান, আদালত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাঁচ শতাধিক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। সাইনবোর্ড এলাকা থেকে আদালত চত্বর পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার বলয় গড়ে তোলা হয়। আদালতে ঢোকার মুখে বসানো হয় আর্চওয়ে; সেখানে সবাইকে তল্লাশি করা হয়। আইনজীবী এবং বাদী ও আসামিপক্ষের স্বজনদের ছাড়া কাউকে আদালতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গ্রেফতার ২৩ আসামির মধ্যে ১৮ জন ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে। সকাল ৯টার দিকে তাদের প্রিজন ভ্যানে করে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে আসা হয়। আর নূর হোসেন, তিন সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচজনকে তিনটি প্রিজন ভ্যানে করে কাশিমপুর কারাগার থেকে নারায়ণগঞ্জ আদালতে নিয়ে আসা হয় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে। ঘড়িতে ১০টা বাজার ঠিক আগে আগে আসামিদের আদালত কক্ষে নিয়ে কাঠগড়ায় তোলা হয়। সাত খুনের ঘটনায় দুটি মামলা হলেও বিচার চলে একসঙ্গে। বিচারক একটি মামলা হিসেবে বিবেচনা করেই রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের অপরাধের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ অংশ বাদ দিয়ে কেবল সাজার অংশটি মাত্রা কয়েক মিনিটের মধ্যে পড়ে শোনান বিচারক। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় ৩৫ আসামির সবাইকে দোষী সাবস্ত করেছেন আদালত, এর মধ্যে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামির সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হয়েছে। রায়ের নথি অনুযায়ী এ মামলার মোট ৩৫ আসামির মধ্যে যে ২৬ জন ফাঁসি দ- পেয়েছেন তাঁরা হলেনÑনূর হোসেন, মো. মিজানুর রহমান দীপু, চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, চাকরিচ্যুত মেজর মো. আরিফ হোসেন, চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এম রানা, মো. মোখলেছুর রহমান, মো. মহিউদ্দিন মুন্সী, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, সিপাহি আবু তৈয়ব, সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহ জাহান, জামাল উদ্দিন, আসাদুজ্জামান নূর, পুর্ণেন্দু বালা, আরওজি আরিফ হোসেন, সৈনিক আল আমিন, তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবির, বেলাল হোসেন, শিহাব উদ্দিন, মোর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, আবুল বাশার, রহম আলী ও এমদাদুল হক। এই ২৬ জনের মধ্যে পলাতক রয়েছেন নয়জন। তাঁরা হলেনÑমোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনসী, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবির, নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, ম্যানেজার শাহজাহান ও ম্যানেজার জামাল উদ্দিন। এ দুই মামলার মোট ২৩ আসামি কারাগারে আছেন। পলাতক আছেন ১২ জন। নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন গতকাল সোমবার এই রায়ে বাকি নয় আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদ- দিয়েছেন।