সরকার রিজার্ভ থেকে এক পয়সাও নষ্ট করে না : প্রধানমন্ত্রী

4

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বিএনপি নেতাদের অপপ্রচারের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার কখনো রিজার্ভ থেকে এক পয়সাও নষ্ট করে না, বরং দেশ ও জনগণের স্বার্থে এই টাকা ব্যবহার করে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার এ দেশের এক পয়সাও অপচয় করে না। প্রতিটি অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের কল্যাণে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার সকালে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজের উদ্বোধনকালে দেয়া ভাষণে একথা বলেন। তিনি গণভবন থেকে সাভারের আশুলিয়া বাজার সংলগ্ন কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেতারা সব সময় রিজার্ভের টাকা খরচ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘রিজার্ভের টাকা থেকে কোনো অর্থ অপব্যবহার হয় না। বিএনপি নেতারা সব সময় বিষয়টি নিয়ে কথা বলে, কারণ তাদের নেতা তারেক রহমানকে মানিলন্ডারিং মামলায় সাত বছরের কারাদ- এবং ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং তিনি এখন পলাতক আসামি।’
তাদেরকে আমি বলতে চাই বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন রিজার্ভ ছিল মাত্র ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়ে এটি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার হয়। সেই জায়গা থেকে আমরা এই রিজার্ভ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে সক্ষম হই।
সরকারপ্রধান বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে যোগাযোগ, যাতায়াত, আমদানি থেকে শুরু করে সবকিছুই প্রায় বন্ধ ছিল। আর যখনই যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্মুক্ত হয়, তখন আমাদের আমদানি করা, পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থের বাড়তি জোগান ও রিজার্ভ থেকেই দিতে হচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের মতো বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন প্রদান এবং করোনা টেস্টের ব্যবস্থা যেটা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশও করতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাবিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম, পরিবহন খরচ, জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল, গম, ভুট্টাসহ যে সমস্ত পণ্য আমদানি করতে হয়, তার দাম বেড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ চাল উৎপাদন করলেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছু কিছু আমদানি করতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যেটুকু খরচ করেছি তা জনগণের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণে। জনগণের খাদ্য কেনা, ওষুধ কেনা জনগণের মঙ্গলের জন্যই করতে হয়েছে। সার, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ আমাদের ক্রয় করতে হচ্ছে, নগদ টাকা দিয়ে আমরা কিনছি। তাছাড়া আমাদের রিজার্ভের টাকা দিয়ে আমরা কিন্তু বিমান ক্রয় করেছি। নদী ড্রেজিং যেমন নিজেদের অর্থে করছি তেমনি কিছু কিছু বিনিয়োগও আমরা করছি।’ তিনি বলেন, এই টাকা যদি তার সরকার অন্য দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নিত তাহলে সুদসমেত টাকা পরিশোধ করতে হতো। আর আমাদের ব্যাংক থেকে দিলে যেটা সোনালী ব্যাংক থেকে আমরা দিচ্ছি তাহলে ওই সুদসমেত টাকা দেশের টাকা দেশেই থেকে যাচ্ছে এবং সেদিকে লক্ষ্য রেখেই প্রায় ৮ বিলিয়নের মতো আমরা খরচ করছি। এখান থেকে কিছু ডলার শ্রীলংকার অর্থনৈতিক দুরবস্থায় ধার হিসেবে দেয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, ‘কাজেই এখানকার টাকা কেউ তুলে নিয়ে চলে যায়নি, যেটা তাদের মনে সবসময় ভয় থাকে তারা ওইরকম বলে। ‘কাজেই মানিলন্ডারিং যাদের অভ্যাস তারা খালি এটাই জানে যে, টাকা বোধহয় সব নিয়েই যেতে হয়,’ উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বক্তব্য দেন।
সেতু বিভাগের সচিব মো. মঞ্জুর হোসেন এক্সপ্রেসওয়ে সম্পর্কে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
আশুলিয়া প্রান্তে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমানসহ সর্বস্তরের মানুষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
দুর্ভিক্ষের ধাক্কা এড়াতে সবাইকে সাবধান থাকার বিষয়ে আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদেরকে ফসল উৎপাদন করেতে হবে এবং পুষ্টি নিশ্চয়তার ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের সাবধানতা আমাদেরই নিতে হবে।
তার সরকারের সময়ে সড়কপথ, নৌপথ, আকাশপথের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করছি। এসবের জন্য টাকা খরচ হচ্ছে। রিজার্ভের টাকা তো লাগবেই, এটাই হলো বাস্তবতা।
প্রধানমন্ত্রী নির্মাণাধীন এলিভেটেড একাসপ্রেসওয়ে প্রসঙ্গে বলেন, ঢাকা শহরের উত্তরাঞ্চল তথা সাভার, আশুলিয়া নবীনগর, ইপিজেড সংলগ্ন শিল্প এলাকার যানজট নিরসনে এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরিতে তার সরকার ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, ’৯৬ সালেই তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন ঢাকা-আশুলিয়া রাস্তা করে দেওয়ার। এখন সেখানে তার সরকার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে দিচ্ছে। এতে রাস্তাটি যেমন যানজট মুক্ত থাকবে তেমনি যোগাযোগ আরো সহজ হবে। বিশেষ করে শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে ওঠা আশুলিয়ার সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের যোগাযোগও সহজ হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইপিজেড হয়ে নির্মাণাধীন ২৪ কিলোমিটার প্রকল্পটিকে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সংশোধিত আকারে ডিপিপি অনুমোদন করে। কাজেই ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি নির্মিত হলে আমাদের শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন দ্রুততর হবে।
তিনি বলেন, আর এই প্রকল্পটি ঢাকা ইপিজেড থেকে আশুলিয়া, আব্দুল্লাহপুর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকট ঢাকা কাওলা হয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত হবার মাধ্যমে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী হয়ে কুতুবখালী পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৪ কিলোমিটার নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি এটা নির্মিত হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ২১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায় বলেও জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, এটি এশিয়ান হাইওয়ে অ্যালাইনমেন্টের মধ্যে অবস্থিত একটি প্রকল্প এবং ঢাকা এলিভেডেট এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে ৩০টি জেলার সংযোগ স্থাপনকারী আব্দুল্লাহপুর, আশুলিয়া, বাইপাইল, চন্দ্রা, কুড়িল রোডে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে এবং এক্সপ্রেসওয়েটির সঙ্গে সকল জাতীয় মহাসড়কের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। কাজেই তিনি এটি সুষ্ঠুভাবে নির্মাণে নির্মাণ সংশ্লিষ্ট দেশী-বিদেশী সংস্থার সকলের সহযোগিতাও কামনা করেন।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সবসময় বিশেষ অবদান রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী এ সময় চীনের রাষ্ট্রপতিকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।