সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক বিদেশ সফর ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে সরকার

76

bd-logoসরকারি নির্দেশ অমান্য করে প্রভাবশালী কর্মকর্তারা ঘন ঘন বিদেশ সফরে যাচ্ছে। আর বছরের শেষ সময়ে তো সরকারি কর্মকর্তাদেও বিদেশ ভ্রমণের হিড়িক পড়ে। মূলত সরকারি ও দাতা সংস্থার টাকাতেই তারা ওসব সফর করে। গত দুই মাসে সরকারি কর্মকর্তাদের অন্তত ২৫টি দল বিদেশ সফর করেছে। বর্তমানে ১০টি দল বিদেশ সফরে রয়েছে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৬ জন সচিবই দেশের বাইরে। কোনো কোনো সময় এক সাথে ১০ জন সচিবও বিদেশ সফরে থাকেন। ফলে একদিকে যেমন সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে অপচয় হচ্ছে কর্মঘণ্টার। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক চিঠিতে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর কমানোর পরামর্শ দেয়া হয়। পাশাপাশি নীতিমালাও সংশোধন আনা হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিদ্যমান বিদেশ সফরের নীতিমালায় স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় যে যার ইচ্ছামতো বিদেশ সফর করছে। তাতে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দাফতরিক কাজকর্মেও ধীরগতিদেখা দিয়েছে। আর তা রোধ করতেই নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই তা সচিব কমিটির বৈঠকে পাঠানো হবে। পাশাপাশি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক ঘন ঘন বিদেশ সফরের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করায় তাদের বিদেশ সফর সীমিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের লাগাম টেনে ধরার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সেজন্যই বিদেশ সফরের নীতিমালায় সংশোধন আনা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব থেকে সচিব পর্যন্ত বিদেশ ভ্রমণের বিষয়েই বেশি আগ্রহী। তবে সেক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন মন্ত্রী, সচিবের পিএস ও এপিএসরা। মূলত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে যে কোনো সফরের ফাইলে সম্মতি পেতেই পিএস ও এপিএসদের হাতে রাখেন কর্মকর্তারা। এই সুযোগে এমনও দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসেই সরকারি টাকায় একজন কর্মকর্তা একাধিকবার বিদেশ সফর করছেন। আর এসব ঘটনা বেশি ঘটছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন, ত্রাণ ও দুর্যোগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে। একজন সচিব সরকারি খরচে গত ১১ মাসে ১৬ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের একসাথে বিদেশ সফরের বিধিনিষেধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। কোনো মন্ত্রণালয়ে দেখা যাচ্ছে,মন্ত্রীর স্নেহভাজন হওয়ায় কোনো কর্মকর্তাকে এক মাসেই একাধিকবার বিদেশে প্রশিক্ষণ ও সভা-সেমিনারে পাঠানো হচ্ছে। সেক্ষেত্রে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি এড়ানোরও অভিযোগ রয়েছে। যেহেতু যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত বিদেশ সফরের অনুমতি দেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু অনুমতি নেয়ার সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয় না আগে ওই কর্মকর্তা কয়বার বিদেশ গেছেন। বিগত ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর নাগাদ প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন। তার মধ্যে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত ৩শ’ কর্মকর্তা, ২০১৫ সালে ৪শ জন, ২০১৪ সালে ৪৫০ জন, ২০১৩ সালে আড়াইশ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন দেশ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
সূত্র আরো জানায়, প্রশিক্ষণসহ দাফতরিক ও ব্যক্তিগত কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ওপর সংশোধিত নীতিমালায় কঠোর শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। নীতিমালা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগত কারণে তিন বছর পর ৩০ দিন এবং দাফতরিক কাজে বছরে চারবারের বেশি বিদেশ সফর করতে পারবেন না। বিদেশ সফরের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান থাকছে। দাফতরিক কাজে বিদেশ গেলে তার সর্বোচ্চ সময়সীমা হবে ১০ দিন। বিদ্যমান বিধিমালায় বছরে ৬ বার সরকারি খরচে বিদেশ সফরের নিয়ম রয়েছে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী জানান, কর্মকর্তারা শুধু বিদেশ সফরে ব্যস্ত কথাটি ঠিক নয়। প্রশিক্ষণ বা সরকারি কাজে কর্মকর্তারা বিদেশে যাচ্ছেন। তবে ওই সুযোগ কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি নেন তাহলে তা হবে খারাপ দৃষ্টান্ত। কর্মকর্তারা যত দক্ষ ও অভিজ্ঞ হবেন, যত বেশি প্রশিক্ষণ পাবেন, প্রশাসনে তার বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।