সম্মিলিতভাবে কাজ করলে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না

10
নাসের উদ্দিন

মনে পড়ে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটিতে যোগদান করি। অথচ দেখতে দেখতে আমার নিজেরই ২৪ বছর হয়ে গেল প্রয়াসে। আর প্রয়াসও পেরিয়ে গেল ৩০ বছর। এ এক অন্যরকম অনুভূতি।
প্রয়াসে যখন যুক্ত হই, তখন এর একটি মাত্র ইউনিট বা শাখা অফিস ছিল। সে সময় বয়স্ক স্কুল, ভিলেজ স্যানিটেশন সেন্টার এবং ওয়াটশন পার্টনারশিপ প্রজেক্টের কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছিল প্রয়াস। এ সময়ে ওয়াটশন পার্টনারশিপ প্রজেক্টের একজন কর্মী হঠাৎ অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় প্রিয় হাসিব ভাই আমাকে কিছুদিনের জন্য তার কাজগুলো এগিয়ে নেয়ার কথা বলেন।
প্রয়াসের নির্বাহী সদস্য হিসেবে আমি হাসিব ভাইয়ের ডাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংস্থার বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করি। প্রজেক্টের কাজের পাশাপাশি মাইক্রো ফাইন্যান্স কর্মসূচিতে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করতে থাকলাম। তখন হাসিব ভাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্যতম বিদ্যাপীঠ শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ কলেজে শিক্ষকতা করতেন। কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি তার নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করতেন তিনি। একার পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব হতো না বিধায় প্রয়াসের নির্বাহী সদস্য হিসেবে হাসিব ভাইয়ের নির্দেশনা অনুয়ায়ী সংস্থার কার্যক্রম সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমি কাজ শুরু করি।
দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। আর সবাইকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে না পারলে সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়, এই সত্যটা তখন অনুধাবন করেছিলেন প্রয়াসের প্রতিষ্ঠাতা হাসিব হোসেন। আর তাই আজ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য, আদর্শ, নীতি এখনো অক্ষুণœ আছে। দেশ ও দশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে প্রয়াস। নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি।
আমার চাকরিজীবনের শুরু প্রয়াস থেকে। যদিও প্রথমদিকে প্রয়াসের কার্যক্রমকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ শুরু করা। কিন্তু তারপর থেকে কখনো মনে হয়নি যে, বাইরে কোথাও চাকরি করতে যাবো।
প্রথম থেকেই চিন্তাভাবনা ছিল যে, প্রয়াসকে কীভাবের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে যেতে আজ আমাদের মাঠপর্যায়ে ৭১টি ইউনিট/শাখা অফিস হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট একটি গ্রাম থেকে শুরু করে প্রয়াস আজকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়াও রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, গাইবান্ধা ও জয়পুরহাটে কাজ করছে।
প্রথমদিকে মাইক্রো ফাইন্যান্সের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়াসে একজন মাত্র কর্মী থাকলেও এখন মাইক্রোক্রেডিট ও প্রজেক্ট মিলিয়ে হাজারখানেকের উপরে কর্মী কাজ করছে। বর্তমানে প্রয়াস ছোট-বড় প্রায় ২০টি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে প্রয়াস। বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।
আমরা একটা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে স্বপ্নটা বড় হওয়ায় পুরোটা এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। আগামীতে সারা বাংলাদেশে কাজ করব, এমন স্বপ্ন নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তবে এটা ঠিক যে, সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য অর্থনৈতিকভাবে আমরা এখনো স্বাবলম্বী হতে পারিনি। আবার এও সত্য যে, এখানে অনেক দক্ষ কর্মী তৈরি করা হলেও তাদের ধরে রাখা সম্ভব হয়নি শুধুমাত্র আর্থিক কারণে।
আমরা আমাদের স্ট্র্যাটিজিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রত্যেক বছরেই আমরা পরিকল্পনা করে থাকি। ‘প্রয়াস’ অর্থ হচ্ছে পরিশ্রমের সঙ্গে চেষ্টা করা। আমরা সবাই আমাদের নিজেদের জায়গা থেকে চেষ্টা করছি।
বাংলাদেশের একটি প্রান্তে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি গড়ে উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ একটি প্রান্তিক জেলা হওয়ায় ভৌগোলিক কারণে আমরা অনেকটা পিছিয়ে আছি। কর্মী বাহিনী, নির্বাহী পরিষদের সকলের পরিকল্পনা ও কাজের মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে আসতে পেরেছি। আমরা যদি আমাদের নিজেদের জায়গা থেকে সম্মিলিতভাবে কাজ করি তাহলে আমাদেরকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।

মো. নাসের উদ্দিন : জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি