সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান

70

gourbangla logoবাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ এখন পর্যন্ত প্রায় অনাবিষ্কৃত ও অব্যবহƒত। সীমিত পর্যায়ে কিছু পরিমাণ তেল-গ্যাস এবং মৎস্যসম্পদ আহরণ করা হলেও তার পরিমাণ বিপুল বঙ্গোপসাগরের অফুরন্ত সম্পদের তুলনায় খুবই নগণ্য। এমনকি সমুদ্রসম্পদ সম্পর্কে জরিপ চালানোর উপযোগী নৌযান পর্যন্ত নেই। সময়ে সময়ে বাপেক্সসহ বিদেশী সহায়তায় যৎসামান্য জরিপকার্য চালানো হলেও বঙ্গোপসাগরের অমিত ও অপার সম্ভাবনা সম্পর্কে আমরা খুব কম জানি। অথচ বাংলাদেশের রয়েছে সুবিশাল সমুদ্রসীমা। ২০১৪ সালে জুলাইয়ে ভারত এবং ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকায় (টেরিটোরিয়াল সী) অধিকার লাভে সমর্থ হয়। ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ ও অন্যান্য সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার লাভ করে। অথচ এই বিশাল অঞ্চলে কী পরিমাণ মৎস্য ও খনিজসম্পদ রয়েছে, সে সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা নেই। ব্লু-ইকোনমি বা নীল সমুদ্রের অর্থনীতি হিসেবে খ্যাত এই অঞ্চলের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৯টি মন্ত্রণালয়কে একযোগে কাজ করার নিন্দেশ দেয়া হয়েছে। বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ব্লু-ইকোনমি সেল। গভীর সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও মৎস্যসম্পদ আহরণের জন্য ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বহুমুখী প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর আওতায় ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হবে অত্যাধুনিক মাল্টিডিসিপ্লিনারি জাহাজ। বাকি ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে অবকাঠামো উন্নয়নসহ গবেষণার কাজে। জরিপ জাহাজটির মাধ্যমে সুবিস্তৃত ও সুবিশাল বঙ্গোপসাগরের বুকে এবং তলদেশে যাবতীয় মৎস্যসম্পদসহ জলজসম্পদ, তেল-গ্যাসসহ মূল্যবান খনিজসম্পদ অনুসন্ধান এবং এসবের বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা জানা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রের তলদেশে অতি মূল্যবান ইউরেনিয়াম, প্লাটিনাম, থোরিয়ামসহ নানা দুর্মূল্য ও দুর্লভ খনিজ পদার্থ পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। অগভীর সমুদ্রে রয়েছে বিপুল পরিমাণ ঘন কাদা, যা হতে পারে সিমেন্ট তৈরির অন্যতম উপাদান। প্রাপ্তিসাপেক্ষে এসব মূল্যবান খনিজ উত্তোলন ও আহরণ সম্ভব হলে আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে।তবে দুঃখজনক হলো, সমুদ্রসম্পদ আহরণ, রক্ষণাবেক্ষণসহ সার্বিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে কোন নীতিমালা নেই। ফলে সমুদ্র অর্থনীতি বা বু-ইকোনমির আদৌ কোন সুফল ভোগ করতে পারছে না বাংলাদেশ। বিলম্বে হলেও টনক নড়েছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর। দেশের যাবতীয় সমুদ্রসম্পদ আহরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার নিমিত্ত একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। ব্লু-ইকোনমি সংক্রান্ত একটি জাতীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবও করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান, বিশেষজ্ঞ, দক্ষতা ও বাজেট ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের জরিপ জাহাজ পর্যন্ত নেই। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-চীন-রাশিয়া-জাপানের বাইরে হল্যান্ড-সুইডেন-নরওয়ে-পর্তুগাল সমুদ্রসম্পদ আহরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সবিশেষ উন্নয়ন ঘটিয়েছে জাতীয় অর্থনীতির। প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি সহায়তা নেয়া যেতে পারে। বিশ্বায়নের পর্যায়ে সাহায্য-সহযোগিতা চাইলে যে কোন দেশ এগিয়ে আসবে। ব্লু-ইকোনমির অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে সেই পথেই অগ্রসর হতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত এসবই করতে হবে নিজস্ব উদ্যোগে, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন এবং প্রয়োগের মাধ্যমে।