সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে

120

save_deposite_20661সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ দিন দিন বাড়ছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ অতিরিক্ত হলে এই খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার বেশি হয়ে গেলে তাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ সুদ গুনতে হবে, যা ভবিষ্যতে বাজেট ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ১১ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা এবারের বাজেটে পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্র থেকে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ আসে, যা অর্থবছরের পুরো সময়ের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের পুরো সময়ে সরকারের ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তিন মাসেই বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১৫,১১৩ কোটি টাকার। এ সময়ে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধ করে নীট বিক্রি ১১,৬৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের দ্বিগুণ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের এই তিন মাসে ৬,৬৯২ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বিক্রি বেড়েছে ৪,৯৫৮ কোটি টাকা বা ৭৪.০৮ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঞ্চয়পত্র থেকে অন্য বছরের মতো এ বছরও সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ঋণ নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে চলমান অস্থিরতা ও অব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগের জন্য সাধারণ মানুষ এখন সঞ্চয়পত্রকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছেন। অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র বিক্রি রেকর্ড গড়তে পারে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, একক মাস হিসেবে সেপ্টেম্বরে শুধু নীট বিক্রি হয়েছে ৩,৮৫৪ কোটি টাকা। এর আগে জুলাইতে নীট বিক্রি হয় ৩,৪৯৮ কোটি টাকা। আর গত আগস্টে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে চার হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। যা আগের বছরের (২০১৫-১৬) আগস্টে আসা বিনিয়োগ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা বেশি। গত বছরের আগস্ট মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ আসে দুই হাজার ৬৫০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরেও (২০১৪-১৫) সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেড়েছিলো। সেসময় সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিলো ২৮ হাজার ৭৩২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সঞ্চয়পত্রে এ বিনিয়োগ সরকারের তখনকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা বেশি ছিলো। এদিকে, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে এ খাতে নিট বিনিয়োগ আসে তিন হাজার ৪৯৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্র্রতি দিনের সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ থেকে আগের বিক্রি করা সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটাকেই নীট বিক্রি বলে হিসাব করা হয়। গত অর্থবছরের জুলাই মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল এক হাজার ৯৭৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে সাত হাজার ৭৯৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। যা অর্থবছরের পুরো সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের বাজেটে নির্ধারিত ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪০ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরাবরের মতো গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র। এর পরেই রয়েছে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক ও পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র। মূলত এই তিন ধরনের সঞ্চয়পত্রের বিক্রিই বেশি হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে অসংখ্য বিনিয়োগকারী সারি ধরে দাঁড়িয়ে সঞ্চয়পত্র কিনছে। কেউ বা আবার মুনাফার টাকা তুলতে এসেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ গত এক বছর ধরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তোলেননি, এখন একসঙ্গে সেই মুনাফার টাকা তুলে নতুন করে আবার বিনিয়োগ করছেন। এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তাতে প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হলেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। সেখানে দুই মাসেই প্রায় আট হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। এই হারে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়তে থাকলে এ খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ পরিমাণ ছাড়িয়ে যাবে। তাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ সুদ গুনতে হবে, যা ভবিষ্যতে বাজেট ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছে, আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সাধারণ সঞ্চয়ীরা এখন সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। এক দফা কমানোর পরও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এখনো ব্যাংক আমানতের প্রায় দ্বিগুণ। এ কারণে প্রতি মাসেই বেড়ে চলেছে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ। বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ঋণের বোঝা কমাতে ২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমায় সরকার। গত ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের পুরো সময়ে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছিল ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত উেসর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। বিক্রি বাড়ায় সংশোধিত বাজেটে তা প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র বিক্রি সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যায়। অথচ একটা সময় ছিল যখন এক অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে মাত্র ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ আনাই কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। অবশ্য এর পরের অর্থবছর থেকেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়তে থাকে। সর্বশেষ গত আগস্টে একক মাস হিসেবে নিট বিনিয়োগ চার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে ঋণ নেয় সরকার। দেশের ভেতর থেকে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা ও ব্যাংকবহির্ভূত উৎসÑএই দুই উৎস থেকে ঋণ করে থাকে। একটা সময় সরকারকে ঘাটতি মেটাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাংকব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঋণ আসছে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে। আর তা আসছে এই সঞ্চয়পত্র থেকে।