শেখ রাসেল হত্যার পটভূমি

61

ড. অজিত দাস

পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। আমেরিকার প্রথিতযশা রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে শুরু করে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি ও তাঁর ভাই অ্যাটর্নি জেনারেল রবার্ট কেনেডি, মানবতার অগ্রদূত মার্টিন লুথার কিং, কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস লুমুম্বা, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ, ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, সত্তর দশকের পৃথিবীর অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সফল রাষ্ট্রনায়ক ইন্দিরা গান্ধী, তারই যোগ্য উত্তরসূরি তরূণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডসহ আরও অনেক হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের পাতাকে করেছে রক্তাক্ত, সাধারণ মানুষকে করেছে ব্যথিত। কিšতু শেখ রাসেল হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এত নির্মম ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ঘটেনি। এতে নারী-শিশুসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবাইকে অত্যান্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বিশেষ করে শেখ রাসেলকে হত্যার প্রাক্কালে ঘাতকদের প্রতি রাসেলের বেঁচে থাকার যে আকুতি তা শুধু বাংলার কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেনি বিশ্বমানবতাকেও করেছে ভুলুণ্ঠিত, হতবিহ্বল ও চিন্তিত।
কিন্তু প্রশ্ন হল শিশু রাসেলকে ঘাতকরা কেন হত্যা করলো? এই হত্যাকাণ্ডের পটভূমি কী ছিল? রাসেল হত্যাকাণ্ড কি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য নাকি এর পিছনে ছিলকোন গভীর ও সুদূরপ্রসারী নীলনকশা। আলোচ্য প্রবন্ধে সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো।
পৃথিবীর অধিকাংশ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পিছনে যে বিষয়টি কাজ করে সেটি হল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল। সে ক্ষেত্রে তাদের হত্যাকাণ্ডের প্রধান টার্গেট হন সেই সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান, তার পরিবারবর্গ নয়। কিšতু রাসেল হত্যাকাণ্ডের পিছনে ঘাতকদের শুধু ক্ষমতা দখলই প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করা যাতে ওই পরিবারের কোন সদস্য ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারী হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হতে না পারে। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল স্বৈরাচারী মৌলবাদী পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূলে কুঠারাঘাত করে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যারা মেনে নিতে পারেনি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেছিল মূলতঃ সেইসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে; হত্যা করে দশ বছরের শিশু রাসেলকেও। আর এই হত্যাকাণ্ডের পটভূমি গড়ে ওঠে ইতিহাসের বিশেষ কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সেগুলো হলো :

১. লাহোর প্রস্তাব
আমরা সবাই জানি ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি সম্পন্ন হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের পাঠ শেষ করে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সাথে সাথে সাথে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অবশ্য ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরূ করে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব ঘোষিত হলে ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে শুরু হয় ব্যাপক পরিবর্তন ও নতুন মেরুকরণ। মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বি-জাতি তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, ‘… জাতির যে কোন সংজ্ঞা অনুসারে মুসলমানরা একটি জাতি এবং তাদের নিজস্ব বাসস্থান, ভূ-খণ্ড এবং রাষ্ট্র থাকা আবশ্যক।”৫ জিন্নাহর ‘দ্বি-জাতি’ তত্ত্বে কংগ্রেস নেতারা ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। মহাত্মা গান্ধী বললেন, “দ্বি-জাতি তত্ত্ব হলো অসত্য… ভারতে হিন্দু ও মুসলিমরা দু’টি জাতি নয়… হিন্দু ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম দুটি পরস্পর বিরোধী সংস্কৃতি ও নীতি এটা ভাবতে আমার সমগ্র আত্মা বিদ্রোহ করছে।”৬ অনেক মুসলমান নেতাও জিন্নাহর এই দ্বি-জাতি তত্ত্ব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।৭ সীমান্ত গান্ধী খান আব্দুল গাফফার খান, আব্দুল গফুর খান, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, রফি আহমেদ কিদোয়াই, ড. জাকির হোসেন, ড. কাইয়ুম আনসারী প্রমুখ বিশিষ্ট মুসলিম নেতা লাহোর প্র¯তাবের বিরোধিতা করেন।
তা সত্ত্বেও সে সময় ভারতে হিন্দু আধিপত্যের ভয় ও সাথে সাথে পাকিস্তান প্রীতি পূর্ব বাংলার জনগণকে তা সমর্থন করতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে লাহোর প্রস্তাবে উল্লিখিত প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের বিষয়টি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতি সচেতন মানুষ ঠিকই মাথায় রাখেন। লাহোর প্রস্তাবে বলা হয় : প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস সাপেক্ষে ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন ইউনিটগুলোকে (প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলো) নিয়ে এমনভাবে বিভিন্ন এলাকা গঠন করতে হবে যাতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহ, যেমন-ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল এবং পূর্ব অঞ্চল পৃথক পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র (Independent states) হিসেবে গঠিত পারে, যেখানে অঙ্গীভূত ইউনিটগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হবে।৮
লাহোর প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়, ভারতবর্ষকে ভাগ করে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যগুলোকে নিয়ে একটি রাষ্ট্র এবং দুই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে নিয়ে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হবে এবং এসব রাষ্ট্রের অর্ন্তগত প্রদেশগুলো পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে।১০
কিন্তু ১৯৪৬ সালে মূল লাহোর প্র¯তাব সংশোধন করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তথা ‘পাকিস্তান’ গঠনের কথা বলা হলে অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। এসব নেতাদের মধ্যে ছিলেন আবুল হাশিম, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎ বসু, কিরণ শংকর রায় প্রমুখ। সে সময় বাংলায় মুসলিম লীগের নেতৃত্ব তখন দুটি ধারায় বিভক্ত ছিল। একটি ধারার নেতৃত্ব দিতেন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তাঁর সাথে ছিলেন সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ, অপরদিকে সভাপতি মওলানা আকরাম খাঁর সাথে ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন। সেসময় হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ যারা রাজনীতিতে উদারবাদী গণতন্ত্রমনা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তারা অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে অখ- স্বাধীন বাংলা গঠনের দাবি জানান। অপরদিকে রক্ষণশীল আকরাম-নাজিম গ্রুপ স্বাধীন বাংলা গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং পাকিস্তান প্রস্তাবকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন। । সে সময় হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের একজন সমর্থক হিসেবে শেখ মুজিবও অখন্ড স্বাধীন বাংলা আন্দোলনে অংশ নেন।
কিস্তু ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনকে অবজ্ঞা করে পূর্ব বাংলার জনগণের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ধ্বংস করার জন্য বাংলা ভাষার বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরূ করলে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেন যে মুসলিম লীগের সাথে থেকে বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই তিনি পূর্ব বাংলায় লীগ বিরোধী ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠিত করতে শুরূ করেন এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (যা পরে আওয়ামী লীগ নাম ধারণ করে) প্রভৃতি সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে মহান ভাষা আন্দোলনসহ অন্যান্য আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। এতে করে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ নেতৃত্ব চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তাকে প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর তারা পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে শেখ মুজিবকে উৎখাতের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

২. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা অত্যšত গুরূত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। শুধু তাই না আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাই ছিল পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক টার্নিং পয়েন্ট।১১ এই মামলার মাধ্যমে সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝোলানোর চেষ্টা করা হয়। বলা যায় পাকি¯তানি শাসকগোষ্ঠীর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার এটি প্রথম ট্রায়াল।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বঙ্গবন্ধু ঢাকায় এসে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নড়ে চড়ে বসে এবং বঙ্গবন্ধুর উপর গোয়েন্দা নজরদারি শুরূ করে। তারা বঙ্গবন্ধুর চলাফেরার উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে থাকেন এবং কোথায় কী করছেন, কী বলছেন তা লিপিবদ্ধ করার জন্য নথি খুলেন। শুধু গোয়েন্দা নজরদারি নয় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে নেমে আসে একের পর এক গ্রেফতারী পরোয়ানা ও কারাবাস। জেলখানা থেকেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগেরযুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে শাসক দল মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে তিনি পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও শেরে বাংলার নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভার কৃষি, বন ও সমবায় মন্ত্রী নিযুক্ত হন। কিন্তু দুই মাসের মাথায় কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দিলে বঙ্গবন্ধু আবার গ্রেফতার হন এবং প্রায় আট মাস জেলখানায় বন্দি থাকেন।
১৯৫৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালের মার্চ পর্যšত প্রায় সোয়া তিন বছর বঙ্গবন্ধু জেলখানার বাইরে ছিলেন। এ সময় তিনি দলকে প্রগতিমুখী করার পাশাপাশি (আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেন) প্রায় ১০ মাস খান আতাউর রহমানের পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু ১৯৫৮ সালে সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হলে বঙ্গবন্ধু আবারও কারারুদ্ধ হন ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সে সময় তাঁর বিরূদ্ধে এক ডজন মামলা দায়ের করা হয়। শেষমেষ আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সালের ১৮ জুন জেলখানা থেকে মুক্তি লাভ করেন। জেলখানা থেকে বের হয়েই তিনি কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ (মোজাফফর)-এর সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ নিপীড়ন থেকে মুক্তিলাভের জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার জন্য আলাপ আলোচনা শুরূ করেন। সাথে সাথে ভারত সরকারের সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং দৈনিক ইত্তেফাক-এর সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সাহায্যে পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত ইন্ডিয়ান ডিপ্লোমেটিক মিশনের তৎকালীন রাজনৈতিক অফিসার শশাংক এস ব্যানার্জীর সাথে যোগাযোগ করেন। বঙ্গবন্ধু মি. ব্যানার্জীকে জানান যে, পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সামরিক শাসন থেকে পূর্ব বাংলার জনগণকে মুক্ত করার লক্ষে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের জন্য তিনি মুক্তি সংগ্রাম শুরু করতে চান এবং এ জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরূর সহযোগিতা কামনা করেন। মি. ব্যানার্জীকে তিনি আরো জানান যে, খুব দ্রƒত তিনি এ কাজটি করতে চান এবং লন্ডনে নির্বাসিত থেকে ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৬৩ সালের মার্চের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং অস্থায়ী সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকার গঠন করতে চান।
মি. ব্যানার্জী শেখ মুজিবকে সহযোগিতা করতে সম্মত হন এবং শেখ মুজিবের এ সম্পর্কিত একটি চিঠি তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু চিঠির উত্তর পেতে দেরি হলে শেখ মুজিব ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করার জন্য কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি উপেক্ষা করে খুব গোপনে বিনা পাসপোর্টে আগরতলা যান এবং ত্রিপুরার তৎকালীন মুখমন্ত্রী সচিন্দ্র লাল সিংহ-এর সাথে দেখা করেপ্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সাথে যোগাযোগের জন্য তাঁর সহযোগিতা চান।
প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সাথে যোগাযোগ হলে তিনি শেখ মুজিবকে তার পরিকল্পনার প্রতি সম্মতি রয়েছে বলে জানান এবং বলেন যে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা যেমন লাভজনক নয় তেমনি সুবিধাজনকও নয়। সেক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে দীর্ঘ মেয়াদী কৌশলগত সমর্থন জানানোর কথা বলেন এবং এ সময়ে মুজিবকে জনগণকে সংগঠিত করার পরামর্শ দেন।১৯
আগরতলায় কয়েকদিন অবস্থানের পর শেখ মুজিব ঢাকায় ফিরে আসেন এবং মুক্তি সংগ্রামের লক্ষে জনগণকে সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং এর সমর্থনে জনমত সৃষ্টির জন্য সারা দেশ চষে বেড়ান। ছয় দফা কর্মসূচিকে জনগণ ব্যাপকভাবে সমর্থন করে। এতে করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী চিন্তিত হয়ে পড়ে এবং শেখ মুজিবের বিরূদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরূ করে। তবে শেখ মুজিবের গোপন আগরতলা সফর পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের কাছে বেশি দিন গোপন থাকেনি। তাই পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামী করে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করে। এই মামলার উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাঁর ছয় দফা কর্মসূচি ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীকারের আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করা।
৩. ১৯৭০ সালের নির্বাচন
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পিছনে যে কারণগুলো কাজ করেছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপক বিজয়কে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মেনে নিতে পারে নি। এ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ দুটিতেই আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ৩১৩ সদস্য সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ আসনের মধ্য ২৮৮টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জনগণের এই রায়কে নস্যাৎ করার জন্য তারা গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করে পরিষদের বাইরে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করার চেষ্টা করেন। ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন এবং পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলেও অভিহিত করেন। আসলে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সেই আলাপ-আলোচনা ছিল কেবল লোক দেখানো ও সময় ক্ষেপণ মাত্র। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল আলাপ-আলোচনার আড়ালে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা। তাই আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে কোন ঘোষণা ছাড়াই ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা ত্যাগ করার সাথে সাথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে নিরস্ত্র জনগণের ওপর ঝাপিড়ে পড়ে এবং গণহত্যায় মেতে ওঠে। তারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখে। উল্লেখ্য যে, ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তারের অব্যবহিত পূর্বেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেন এবং হানাদার বাহিনীর বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ফলে শুরূ হয় মুক্তিযুদ্ধ।
পাকি¯তানি শাসকগোষ্ঠী জেলখানায় বহুবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এমনকি জেলখানার পাশে কবর পর্যন্ত খনন করে কিন্তু ুআন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সমাজের চাপের কারণে সে প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

৪. বাকশাল গঠন
আগস্ট হত্যাকা-ের পটভূমি তৈরিতে যেসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল তার মধ্যে অন্যতম হল বাকশাল গঠন। ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু এক ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ নামে একক ‘জাতীয় দল’ গঠন করেন। ফলে সেদিন থেকে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য সকল দল আইনত বিলুপ্ত হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বাকশালকে একটি ‘গণতান্ত্রিক সিস্টেম’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি বাকশাল কায়েম করেছেন। কিন্তু বাকশালের কার্যক্রম শুরুর অল্পদিনের মধ্যেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন যে, বাকশাল গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তবে বাকশাল গঠনের জন্যই যে শেখ রাসেলসহ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল তা সম্ভবত নয় বরং বলা যায় বাকশাল কর্মসূচি গ্রহণ বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-কে দ্রুত ত্বরানি¦ত করেছিল। উপরে আলোচিত বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু বাকশাল কর্মসূচি গ্রহণ না করলেও তাঁকে হত্যা করা হোত। কারণ হত্যার পরিকল্পনা অনেক আগেই গ্রহণ করা হয়েছিল। ঘাতকচক্র শুধু সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বিভিন্নমুখী ঘটনা ও রাজনৈতিক সংকট সেই হত্যাকাণ্ডের পথকে প্রশন্ত করে দেয়। তারপর বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে সেই সংকটগুলো থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করলেন ঠিক তখনই ঘাতকচক্র সর্বশক্তি দিয়ে শেষ আঘাতটি হানলো। স্বাধীনতা-উত্তর সেই ঘটনাগুলোর দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করলে প্রথমেই তিনি বিরোধী দলগুলোর বিরোধিতার সম্মুখীন হন। নবগঠিত সংবিধান২৯ প্রশ্নে বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে পিকিংপন্থী দলগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের বিরূদ্ধে মাঠে নামে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী), বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, আব্দুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) প্রভৃতির সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ছিল না। এই দলগুলো সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী ছিল। তাই তারা সংবিধানটি প্রত্যাখ্যান করে। নবগঠিত জাসদ, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল যারা নিজেদের রূশপন্থী বা চীনপন্থী বলে পরিচিত হতে অস্বীকার করতো তারাও সংবিধানটির তীব্র সমালোচনা করে। সিপিবি, ন্যাপ (মোজাফফর) মোটামুটিভাবে সংবিধানটি মেনে নিলেও ডানপন্থী ইসলামী দলগুলো নতুন সংবিধানের বিরোধিতা করে এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে বানচালের জন্য উগ্র বামপন্থীদের সাথে হাত মেলায়। ডানপন্থী এই দলগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিশ্বাস করতো না। স্বাধীনতার পরপরই এই দলগুলো নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় তারা বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের সরকারবিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকে এবং সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মধ্যমে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। সে সময় তাদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল মুজিব সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা।
পিকিংপন্থী উগ্র বাম দলগুলো বিশেষ করে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি, আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে) শুধু নতুন সংবিধান প্রশ্নেই নয় তারা জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয় এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে। এই দলগুলো আওয়ামী লীগ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে অভিহিত করে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যর্থ লড়াই করে। দেশ স্বাধীনের পর সর্বহারা পার্টি ঘোষণা করে ‘বাংলাদেশ ভারতের অধীন।’ তাই দলটি ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ কায়েমের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানায়। ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর আবদুল হক পাকিস্তাানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে My dear Prime Minister বলে সম্বোধন করে একটি পত্রে ক্রীড়নক মুজিব সরকারকে উৎখাত এবং পূর্ব পাকিস্তানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ, অস্ত্র এবং বেতার যন্ত্র চান। প্রাক্তন বামপন্থী এবং স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহণকারী মাহমুদ আলীর মাধ্যমে সেই পত্র ভূট্টোর কাছে পৌঁছে। ভুট্টো সেই পত্র গুরূত্বের সাথে গ্রহণ করেন।৩২ জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপি প্রভৃতি ডানপন্থী দল গোপনে ভুট্টোর সমর্থন লাভ করে এবং তারা ‘মুসলিম বাংলা’ স্থাপনের জন্য কার্যক্রম শুরূ করে।৩৩
এ প্রেক্ষিতে ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন “মুসলিম বাংলার জন্য যারা কাজ করছে তাদের আমি দোয়া করি। আল্লাহর রহমতে তারা জয়যুক্ত হবে।” শুধু মুসলিম বাংলা গঠন নয়, উগ্র পিকিংপন্থীদের ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা’ গঠনের দাবির সাথেও তিনি সংহতি ঘোষণা করেন। বস্তুত দেশ স্বাধীনের পর মওলানা ভাসানীর সাথে পিকিংপন্থীদের গড়ে ওঠে এক গোপন আঁতাত।
শুধু বিরোধী দলগুলোর সরকার বিরোধী তৎপরতাই নয়, দেশ স্বাধীনের পর খোদ শাসক দলের অভ্যন্তরে মতাদর্শিক প্রশ্নে সংকট দেখা দেয়। সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগের অপেক্ষাকৃত উদার গ্রুপটি ‘মুজিববাদ’ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করলে অপর রেডিক্যাল গ্রুপটি ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে। এই দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করলে বঙ্গবন্ধু মুজিববাদী ছাত্রলীগকে সমর্থন করেন। ফলে আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বাধীন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী গ্রুপটি ছাত্রলীগ থেকে বের হয়ে গিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করে এবং মুজিব সরকারের বিরূদ্ধে মাঠে নামে। দলটি ব্যাংক ডাকাতি, থানা লুট, রেললাইন উপড়ে ফেলা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও সহ হাজার হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী ও সমর্থকদের হত্যা করে সরকার উৎঘাতের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।৩৬
অবশ্য স্বাধীনতা উত্তর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ প্রতিষ্ঠাকে কেউ কেউ একটি বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশ হিসেবেই দেখতে চান। তাঁদের মতে জাসদের উগ্র কর্মীবাহিনী সরকার বিরোধী যেসব ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালায় সেগুলোতে স্বাধীনতা বিরোধী দলগুলোর যথেষ্ট ইন্ধন ছিল। এ প্রসঙ্গে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, “জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের আবির্ভাব অশুভ ছিল না এবং এর পুরোধায় ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের এক গোষ্ঠী। কিন্তু তাদেরকে বেজন্মা রাজাকাররা একটি মঞ্চ হিসেবে পায় এবং এর ছত্র ছায়ায় তাদের নিজস্ব ধারায় দুষ্কর্ম করে চলে।”৩৮
এছাড়া দেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সরকার জাতীয় রক্ষীবাহিনী নামে যে সশস্ত্র সংস্থা গঠন করে তার বেপরোয়া আচরণের কারণে মুজিব সরকারের বিরূদ্ধে গণঅসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে।৪৩ উপরন্তু রক্ষীবাহিনী গঠনকে সামরিক বাহিনী তাদের পেশাগত গর্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার প্রতি হুমকী হিসেবে মনে করে।৪৪
১৯৭৩-৭৪ সাল নাগাদ মুজিব সরকারের কোন কোন মন্ত্রীর বিরূদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজন প্রীতির অভিযোগ ওঠে। আর স্বাধীনতাবিরোধী ও সরকার বিরোধীরা সেটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করতে থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং মুজিব সরকারের প্রতি আস্থা কমে আসতে থাকে।
এ সময় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমর্থন করায় অপর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অখুশি হয় এবং বিশ্ব ব্যাংকের উপর প্রভাব বি¯তার করে বাংলাদেশকে বৈদেশিক সাহায্য প্রদানে বাধার সৃষ্টি করে। এতে করে দেশের উপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেশের এমন প্রতিকূলতার সাথে এসে যোগ হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জলোচ্ছাস, বন্যা, খরায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানী ঘটে। লক্ষ লক্ষ টন ধান বিনষ্ট হয়। ফলে দেশ এক মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়।৪৫
দেশের উপরোক্ত সংকট সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু হয়তো অবহিত ছিলেন এবং সেই জন্যই ১৯৭৪ সালের জুলাই মাসে ছয় জন মন্ত্রী এবং তিনজন প্রতিমন্ত্রীকে অপসারণ করে দেশের মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।৪৭ এ ছাড়া দেশে সোভিয়েত ও ভারতীয় প্রভাব হ্রাসের জন্য পাশ্চাত্য চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলে বঙ্গবন্ধু মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য সরকারে সোভিয়েতপন্থী হিসেবে কথিত তাজউদ্দীনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেন।
এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ডানপন্থী মৌলবাদী ও উগ্র বামপন্থীদের কার্যকলাপ, জাতীয় ও আšতর্জাতিক ষড়যন্ত্র, আওয়ামী লীগ নেতাদের একাংশের অযোগ্যতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক বিরোধীদের মিথ্যা অপপ্রচার এসব কিছু মিলে দেশ এক মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়।
এ সময় আওয়ামী লীগের একটি অংশ (যার মধ্যে শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন অন্যতম) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করতে থাকে এবং বঙ্গবন্ধুর উপর দেশে সমাজতন্ত্রের উত্তরণের প্রয়াসে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার জন্য চাপ দিতে থাকে।৫৩
বঙ্গবন্ধু দেখেন যে, বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে তিনি “জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির” অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন। সম্ভবত “জাতির জনক” হিসেবে তিনি তাঁর এই ব্যর্থতা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না।”৫৪ তাই তিনি নতুন এক সাংবিধানকি পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা ভাবতে শুরূ করেন। গণতন্ত্রকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করে নয় বরং সাময়িকভাবে বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে সরে এসে শুধু দরিদ্র অসহায় খেটে খাওয়া মানুষের মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্যই তিনি শোষিতের গণতন্ত্র তথা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হন। আর এই কঠিন সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের স্বার্থে।

বাকশাল কায়েমের সাথে সাথে দেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করে। এরপর নীলনকশা প্রণয়নকারীরা সেনাবাহিনীর কিছু সংখ্যক বিপথগামী সদস্যদের মাধ্যমে এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।
উপসংহার
পরিশেষে, শিশু রাসেলসহ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মিশনটি সরাসরি সংঘটিত হয় পাকিস্তানের মদদে এবং পাকিস্তান এই নীলনকশা প্রণয়নে সম্পৃক্ত ছিল বলে মনে করা হয়। কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত মেজর ডালিমের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত বেতার ঘোষণা প্রথম পাকিস্তান থেকেই প্রচারিত হয় এবং সেই প্রচারে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্রে রূপান্তরের ঘোষণা দেয়া হয়। অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরব বিশ্বের কোন কোন দেশ এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত ছিল। এ ছাড়া দেশের সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ অনেক কর্মকর্তাও এ ব্যাপারে অবহিত ছিল।

তথ্যসূত্র
১. ড. নিতাই দাস, মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ (ঢাকা : জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৯৮), পৃ. ১২৭
২. ড. বরূণ মুখোপাধ্যায়, হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলন ও সুভাষ চন্দ্র বসু নেতাজী জন্মশতবর্ষ স্মরণিকা (কলকাতা : লোকমত প্রকাশনী, ১৯৯৭), পৃ. ৩-২৩
৩. ড.মৃণালকাšিত চট্টোপাধ্যায়, জাতীয়তাবাদী জিন্নাহ : চিন্তার ক্রমবিবর্তন (কলকাতা : প্রগেসিভ পাবলিশার্স, ২০০১), পৃ. ১৬।
৪. 4. R.N. Agarwal,National Movement and Constitutional Development of India, (Delhi : Metropolitan Book Co, ১৯৬২), চ. ২৫৯
৫. নর্মান ডি পামার, ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা (কলকাতা : পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ১৯৯০), পৃ. ১১৫।
৬. 6. C.H. Philips, The Evolution of India and Pakistan 1884 to 1947, London, pp. 354-355; Karl Von Vorys, Political Development in Pakistan (U.S.A : Princeton University Press, 1965), P. 89; Rounaq Jahan, Pakistan : Failure in National Integration (New York : Columbia University Press, 1972), p. 22
৭. ড. আবুল ফজল হক, বাংলাদেশের রাজনীতি : সংঘাত ও পরিবর্তন (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনা বোর্ড, ১৯৯৪), পৃ. ১৮।
৮. প্রফেসর ড. সুনীল কাšিত দে, “বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ভারতীয় সহযোগিতার সূচনা পর্ব : একটি অনুসন্ধান”, ড. অজিত দাস (সম্পা.), বঙ্গবন্ধু : এই প্রজমের ভাবনা (ঢাকা : বঙ্গবন্ধু তরূণ লেখক পরিষদ, নভেম্বর ২০১৫), পৃ. ৫৫-৫৬।
৯. খোকা রায়, সংগ্রামের তিন দশক (ঢাকা : জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৬) পৃ. ১৮২
১০. 10. Sashanka S. Banerjee, India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation &Pakistan(A Political treatise), Bangladesh edition, Narayangonj, December, 2011, p. 15
১১. ড. অজিত দাস, বঙ্গবন্ধু ও পাকিস্তান আন্দোলন, অনিন্দ্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০২২।
১২. মিজানুর রহমান চৌধুরী, রাজনীতির তিনকাল (ঢাকা : অনন্যা, ২য় সংস্করণ, ২০০১), পৃ. ৯০-৯১।
১৩. ডা. এস. এ. মালেক, “যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিতে হল”, তপন কুমার দে (সম্পা.) রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ (ঢাকা : তাম্রলিপি), ফেব্রƒয়ারি ২০১০, পৃ. ৪৫৩
১৪. 14. Stanly Wolpert, Zulfi Bhutto of Pakistan : His life and times (London : Oxford University Press, 1993), P.248
১৫. ড. এম. আমিনুর রহমান, “বাংলাদেশের প্রথম ও দ্বিতীয় পার্লামেন্টের কার্যকারিতা (১৯৭৩-১৯৮২) : একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা”, সামাজিক বিজ্ঞান জার্নাল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, অষ্টম সংখ্যা, ২০০৩, পৃ. ৬৬।
১৬. মুনতাসীর মামুন ও জয়šতকুমার রায়, বাংলাদেশে সিভিল সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই (ঢাকা : অবসর প্রকাশনী, ১৯৯৫), পৃ. ৬৫।
১৭. আবুল মাল আবদুল মুহিত, “আগস্ট : ষড়যন্ত্রের পটভূমি বাংলাদেশের অ¯িতত্ব এবং আমাদের করণীয়” তপন কুমার দে (সম্পা.) প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৮।
১৮. ড. অজিত দাস, বঙ্গবন্ধু কেন বাকশাল গঠন করেন, অনিন্দ্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০২২।
১৯. Rangalal Sen, Political Elites in Bangladesh (Dhaka : University Press Limited, 1986), P. 298.
২০. তারেক শামসুর রেহমান, সোভিয়েত বাংলাদেশ সম্পর্ক (ঢাকা : একাডেমিক পাবলিশার্স, ১৯৯৩), পৃ. ৭৯
২১. বিস্তারিত দেখুন, অজিত কুমার দাস, “বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি : অতীত ও বর্তমান”, অপ্রকাশিত এম. ফিল অভিসন্দর্ভ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৯, পৃ. ৫৮-৬০।
২২. 22. Moudud Ahmed, Bangladesh : Era of Sheikh Mujibur Rahman (Dhaka : University Press Limited, 1983), PP. 227-231.
২৩. দৈনিক বাংলা, ২৬ জানুয়ারি, ১৯৭৫; দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ জানুয়ারি, ১৯৭৫।
২৪. ড. অজিত দাস, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভূদ্যয়ের ইতিহাস, অনিন্দ্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০২২।
২৫. ড. অজিত দাস, শেখ রাসেল কুঁড়িতেই ঝড়ে যাওয়া ফুল, ঢাকা, ২০১৪।

ড. অজিত দাস; চেয়ারম্যান, বঙ্গবন্ধু তরুণ লেখক পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি; সহ-সভাপতি, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি; সরকারি কলেজের সিনিয়র লেকচারার।