শুভ হোক গৌড় বাংলার পথচলা

300

Zahir

২০১৫ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে গৌড় বাংলা’র আত্মপ্রকাশ। দেখতে দেখতে পত্রিকাটির এক বছর কেটে গেছে। এক বছর একটি পত্রিকার জন্য বেশি সময় নয় এবং এক বছরে একটি পত্রিকার ভালো মন্দ বিবেচনা করাও সহজ নয়। একটি জেলা শহর থেকে একটি দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা অতটা সহজ কাজ নয়। তারপরও গৌড় বাংলা নিরবিচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলেছে, অবশ্যই এটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
সংবাদপত্রকে জাতির দর্পণ বলা হয়ে থাকে। সমাজ পরিবর্তনে যার ভূমিকা অপরিসীম। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি জনমত। এই জনমত প্রকাশের অবাধ অধিকার থাকতে হবে। সরকারের পক্ষে বিপক্ষে যেন মত প্রকাশ করতে পারে। কোন ব্যক্তি/রাজনৈতিক দল/সরকার ভুল করলে সংবাদপত্র সেই ভুলকে শুধরে দিতে ভূমিকা পালন করে। জাতীয় জীবনে সরকারি বেসরকারি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সঠিক বেঠিক ভুল ত্রুটি সবকিছুই দর্পণের মত পত্রিকায় ভেসে উঠে। এই সংবাদপত্রের ইতিহাসও অনেক পুরনো। বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষের প্রথম ছাপানো সংবাদপত্র বেঙ্গল গেজেট ইংরেজি সাময়িকপত্রটি জেমস আগাস্টাস হিকি ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকাশ করেন। সংবাদপত্রের ইতিহাসে কখনোই শাসক শ্রেণী কিংবা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সমাজের দর্পণ হিসেবে খ্যাত সংবাদপত্রকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। বেঙ্গল গেজেট প্রকাশের বিষয়টিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে পারেনি। এটি কোম্পানির বিঘোষিত নীতি ও শাসন পদ্ধতি এবং কর্তৃপক্ষীয় ব্যক্তিদের কার্যকলাপকে ক্রমাগত আক্রমণ করে চলছিল। ফলে লর্ড ওয়েলেসলি সংবাদপত্র শাসনের উদ্দেশ্যে ১৭৯৯ সালে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সঙ্কোচন করে কঠোর সেন্সর ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থায় সকল সংবাদপত্র সেক্রেটারি কর্তৃক পরীক্ষিত হয়ে প্রকাশিত হতো এবং নিয়ম লঙ্ঘনকারীকে ইউরোপে নির্বাসন দেওয়া হতো। পরে গভর্নর জেনারেল লর্ড হেস্টিংস ১৮১৮ সালের আগস্ট মাসে এই ব্যবস্থা রহিত করেন। এর তিনমাস পূর্বে প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র সমাচার দর্পণ প্রকাশিত হয়।
প্রথম বাংলা সংবাদপত্র সমাচার দর্পণ, যা জে. সি. মার্শম্যানের সম্পাদনায় শ্রীরামপুর খ্রিষ্টান মিশন থেকে ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় নিয়মিত সাতটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হতো। যথা- সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংবাদ, সরকারি বিজ্ঞপ্তি, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সংবাদ, জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহের সংবাদ, নতুন নতুন বিষয়াবলী এবং ভারতের ইতিহাস-ঐতিহ্য। এটা ভারতের হিন্দুদের সংবাদ এবং ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক বিষয়াবলী এবং সাহিত্য সংক্রান্ত বিষয় প্রকাশ করতো। ফলে পত্রিকাটি শিক্ষিত সমাজের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। সে আমলে প্রগতিশীল পত্রিকা হিসেবে এর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। সমাচার দর্পণের ভাষায় সরলতা ছিল এবং লেখায় তথ্যবোধ ও মাত্রাজ্ঞান লক্ষ্য করা যেত। ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পত্রিকাটি অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল।
যতদূর জানা যায়, বাংলাদেশে (পূর্ববঙ্গে) ১৮৪৭ সালের আগস্ট মাসে (ভাদ্র, ১২৫৪) রংপুর থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম সংবাদপত্র ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ নামে। এ প্রসঙ্গে ব্রজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় তাঁর এক বইয়ে লিখেছেন, রংপুরের কু-ী পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায়ের ‘আনুকূল্যে’ পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ প্রতি মঙ্গলবার ‘বার্তাবহ যন্ত্রালয়’ থেকে প্রকাশিত হতো। এর প্রচার সংখ্যা ছিল একশো কপি এবং চাঁদার হার ছিল, বাৎসরি ছয় রুপি (অগ্রিম দিলে চার রুপি)।
প্রায় এক দশক পর ১৮৫৬ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকা থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রথম সাপ্তাহিক ‘ঢাকা নিউজ’ প্রকাশিত হয়। প্রথমে পত্রিকাটি ছিল এক পাতার। ১৩ নম্বর সংখ্যা থেকে পত্রিকার পাতা বৃদ্ধি পেয়েছিল ৪ পৃষ্ঠায় এবং সঙ্গে থাকতো সাপ্লিমেন্ট, যেখানে চলতি বাজার দরই ছিল মুখ্য। দ্বিতীয় খন্ড পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ৮ পৃষ্ঠায়। ঢাকা নিউজ প্রকাশিত হতো প্রতি শনিবার এবং বার্ষিক চাঁদার হার ছিল ২ রুপি ৮ আনা এবং তা পরিশোধ করতে হতো অগ্রীম। প্রতি সংখ্যার দাম ছিল দু’আনা। ১৮৬০ সালের এপ্রিলে কাকিনীয়ার জমিদার শম্ভুচন্দ্র রায় চৌধুরীর উদ্যোগে ও আর্থিক সহায়তায় এবং মধুসুদন ভট্টাচার্য’র সম্পাদনায় রংপুর থেকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দ্বিতীয় সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ‘রঙ্গপুর দিক্প্রকাশ’। ১৮৬১ সালে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় ঢাকা থেকে সাপ্তাহিক ‘ঢাকা প্রকাশ’ প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি প্রতি বৃহস্পতিবার বাবুবাজারের ‘বাঙ্গলা যন্ত্র’ থেকে আট পৃষ্ঠার ২৫০ কপি প্রকাশিত হতো। এভাবেই যুগে যুগে সংবাদপত্র আমাদের সমাজে প্রবেশ করেছে এবং সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে শোষিত, নির্যাতিত, অবহেলিত মানুষের পক্ষে কাজ করে চলেছে। বিশেষ করে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংবাদপত্র আর রেডিও’র ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ তখন থেকেই সংবাদপত্রকে আপন করে ভাবতে শিখেছে।
অধিকাংশ সংবাদপত্র রাজধানীকেন্দ্রিক হলেও রাজধানীর বাইরে থেকে যেসব মফস্বল সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, সেসবের গুরুত্বও কম নয়। মফস্বল সংবাদপত্রগুলো নিজ নিজ এলাকার অবহেলিত, অনুন্নত, উন্নয়ন-বঞ্চিত জনপদের মুখপাত্রের মতো কাজ করে চলেছে। তারা মফস্বলের মানুষের সমস্যা, দুঃখ-বেদনা, সুখ-সমৃদ্ধি, আনন্দ-উল্লাস সব কিছু নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে পারে। সুতরাং ঢাকার বাইরের সংবাদপত্রগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর যাঁরা এসব সংবাদপত্রে কাজ করেন, তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথ চলেন আর কাজ করেন। সমালোচনামূলক নানা খবরের পাশাপাশি মফস্বল সংবাদপত্রগুলোতে ইতিবাচক অনেক খবরও আসে। জাতীয় সংবাদপত্রের থেকে মফস্বল সংবাদপত্রের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। সংবাদ সব সময়ই সংবাদ। আঞ্চলিক ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বিষয়াদি মফস্বল সংবাদপত্রগুলো যত বেশি তুলে ধরতে পারে কেন্দ্রীয় সংবাদপত্রগুলো তা পারে না। যখন জাতীয় ইতিহাস লেখা শুরু হয়, তখন আবার আঞ্চলিক ইতিহাসেরও প্রয়োজন হয়। এর প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে মফস্বলের সংবাদপত্র ও মফস্বল সাংবাদিকরা। মফস্বল পত্রিকাগুলো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করে।
মফস্বলের সংবাদপত্রগুলোরও রয়েছে নানা সমস্যা। পর্যাপ্ত বিজ্ঞাপনের অভাব, বিজ্ঞাপনের হার কম, পত্রিকা প্রকাশনার খরচ বেশি প্রভৃতি কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক মফস্বলের পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এসব সমস্যায় যেসব আনুকূল্য পাবার কথা তা সরকারি বেসরকারি কোন মহল থেকেই পাওয়া যায় না। পত্রিকাগুলোকে সব সময় আর্থিক টানা পোড়েনের মধ্যে থাকতে হয়। এ কারণে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মীসহ অন্যান্য কর্মীরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। এসব সমস্যা দূর করা সম্ভব হলে মফস্বল সংবাদপত্রের সুফল পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশের সব জেলা থেকেই দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক কিংবা মাসিক হিসেবে অনেক সংবাদপত্র বের হয়। তবে অনেক পত্রিকা দীর্ঘদিন প্রকাশ করা সম্ভব হয় না নানা কারণে। আবার কিছু কিছু পত্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে পাঠকের আস্থা অর্জন করে টিকে আছে। যতদূর জানা যায়, ’৮০’র দশকের শেষ দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে সদ্যপ্রয়াত সৈয়দ নাজাত হোসেনের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ বার্তা প্রকাশিত হয়। পরে পত্রিকাটি দৈনিক হিসেবে ‘দৈনিক নবাব’ নামে প্রকাশিত হয়। এরপরে ডিএম তালেবুন নবী সম্পাদিত সাপ্তাহিক চাঁপাই সংবাদ, গোলাম মোস্তফা মন্টু সম্পাদিত সাপ্তাহিক মহানন্দা, মিজানুর রহমান কুটু সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিশেষ প্রতিবেদন, জাফরুল উল আলম সম্পাদিত সাপ্তাহিক সীমান্তের কাগজ, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক রাজু সম্পাদিত সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ সংবাদ, শহীদুল্লাহ সম্পাদিত সাপ্তাহিক বীরবার্তা, শুকমার প্রামাণিক সম্পাদিত বরেন্দ্র কাগজ, প্রকৌশলী মাহ্তাব উদ্দিন সম্পাদিত সাপ্তাহিক গৌড় সংবাদ, প্রয়াত এসএমজি ফারুক স্বপন সম্পাদিত সাপ্তাহিক চাঁপাই কণ্ঠস্বর, মোহাঃ জোনাব আলী সম্পাদিত সাপ্তাহিক সোনামসজিদ ও রফিকুল আলম সম্পাদিত সাপ্তাহিক চাঁপাই প্রতিদিন। এসবের মধ্যে বর্তমানে সাপ্তাহিক সোনামসজিদ ও সীমান্তের কাগজের প্রকাশনা অব্যাহত আছে। বর্তমানে মুদ্রিত সংবাদপত্রের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক সংবাদপত্রও বেড়েছে। বর্তমানে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলা থেকেও বেশ কয়েকটি অনলাইন পত্রিকা বের হচেছ।
দৈনিক নবাব-এর পথ ধরে ইতোমধ্যে জেলা থেকে আরো কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়। দৈনিক চাঁপাই দৃষ্টি, দৈনিক চাঁপাই দর্পণ, দৈনিক চাঁপাই চিত্র ও দৈনিক গৌড় বাংলা। আগামী পহেলা ফেব্রুয়ারি দৈনিক গৌড় বাংলা’র ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। হাসিব হোসেন-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক গৌড় বাংলা ইতোমধ্যে পাঠক সমাজে স্থান করে নিয়েছে নিয়মিত প্রকাশনা আর বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনার মাধ্যমে। একটি পত্রিকায় সাধারণত স্থান পায় খবর, তথ্য, বিজ্ঞাপন, ছবি প্রভৃতি।
একটি পত্রিকা থেকে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা আর বিনোদনে সুস্থতা সচেতন পাঠকমাত্রই কামনা করে। আশা করি, গৌড় বাংলা কর্তৃপক্ষ নীতিতে অবিচল থেকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনার মাধ্যমে পাঠকদের আস্থা ধরে রাখবে। এ জন্য অবশ্যই সংবাদকর্মীদের সৎ ও পেশাদারি মনোভাব বজায় রেখে সংবাদ করতে হবে। পেশাদারিত্বের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাও থাকতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সমাজকে সচেতন করার কাজটি সংবাদ মাধ্যমগুলো খুব সহজেই করতে পারে। এ ধরনের সামাজিক কাজের মাধ্যমে পাঠকদের আস্থা আর ভালোবাসা অর্জন করতে হবে।
ভালো কাজে বাধা বেশি- বিষয়টি মাথায় রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো দল বা সরকারের মুখপাত্র না হয়ে জনগণের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতে হবে।
ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছেন, ‘তোমার মতামতের সঙ্গে আমি একমত নাও হতে পারি কিন্তু তোমার মতামত প্রকাশের অধিকার আমি জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করব।’ মতামত প্রকাশের অধিকার সংবাদ মাধ্যমের রয়েছে। মতামত প্রকাশের নামে যাতে কোনোভাবেই সাদাকে কালো বা কালোকে সাদা বলা না হয়। পথ চলা যেন হয় মানুষের পক্ষে মানবতার পক্ষে সত্যের পক্ষে ন্যায়ের পক্ষে আর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। সাফল্য আর সম্ভাবনার কথা ছড়িয়ে দিন সবখানে। শুভ কামনা। আগামীর পথচলা সুন্দর হোক।

লেখক: প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক,
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সমিতি, ঢাকা