শিশু হত্যা : দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

75

sltoday1শিশু অপহরণ ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বেড়ে গেছে। ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে কিছু কিছু মানুষ শিশুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। এ নিপীড়নকারীরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শিশুদের হত্যা পর্যন্ত করছে। আবার নির্যাতনের ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আপলোড করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজশাহী ও নাটোরে পাঁচ শিশু-কিশোরকে নৃশংস নির্যাতন করা হয়েছে। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় পাঁচ দিন আগে নিখোঁজ চার শিশুর লাশ পাওয়া গেছে বিল এলাকায় মাটিচাপা দেয়া অবস্থায়। এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা আর কী হতে পারে। উল্লেখ্য, গত চার বছরে ১২ হাজার ৮৫টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল ২১ হাজার ২২০টি, যা আগের বছরের তুলনায়ও বেশি। এটা নিঃসন্দেহে আতঙ্কজনক ঘটনা। গত বছর চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যার একাধিক ঘটনার পর কয়েকটি মামলায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলেও থামছে না নির্যাতন।
দেশে সম্প্রতি শিশু হত্যা ও অপহরণের ঘটনায় শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে সংস্থার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা বলেন, অপরাধীরা নিজেদের স্বার্থচরিতার্থ করার জন্য ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এ ছাড়া জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় শিশু হত্যার ঘটনা বাড়ছে। তিনি বলেন, শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো অপরাধ প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সচেতনতাই পারে কেবল এ ধরনের সংকট থেকে উদ্ধার করতে।
প্রতিবেদনে প্রকাশ, গেল ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৭ দিনেই হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে অন্তত ১৪ শিশু। আগের মাসে এ সংখ্যা ছিল ২৯। আর গত দেড় মাসে হত্যা করা হয়েছে ৪৫ শিশুকে। দেশে একের পর এক শিশু হত্যার ঘটনা অতীতের যে কোনো সময়কে হার মানিয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়, বেকারত্ব, অনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, অনলাইন প্রযুক্তির কুপ্রভাব, পর্নোগ্রাফির প্রসার, অনৈতিক জীবনযাপন, পাচার, বিরোধ-শত্রুতা, ব্যক্তি স্বার্থপরতা, লোভ, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এর জন্য দায়ী। এ জন্য সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনকে আরো জোরদার, স্কুল পর্যায়ে কাউন্সিলিং, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরো সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।
আমরা মনে করি শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাদের কল্যাণের ব্যাপারে সরকারকে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা উচিত। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে সবার আগে তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ ঠুনকো কারণে যত্রতত্র শিশুদের প্রাণ চলে যাবে কিংবা তারা আনন্দ করতে গিয়ে আহত হবে, এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। অনস্বীকার্য যে, মানবিকতা চর্চার বিষয়টি সমাজ থেকে প্রায় উঠে গেছে। বিশ্বায়নের কুফল পড়তে শুরু করেছে আমাদের সমাজে। শুধু সামাজিক বন্ধন ও মূল্যবোধই নয়, বদলে যেতে শুরু করেছে মানুুষের আচরণও। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজ ও সংসারে। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। সামান্য কারণে ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। সুকুমারবৃত্তির চর্চা উঠে গিয়ে মানবিক বোধশূন্য হয়ে পড়ছে মানুষ। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসততা। সাম্প্রতিক ধারাবাহিক শিশু নির্যাতন ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে এমন ধারণা অযৌক্তিক নয়। ভুলে গেলে চলবে না, আজকের শিশুরাই আগামী দিনে দেশের কর্ণধার, ভবিষ্যৎ কা-ারি। তাদের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যায় এবং রাষ্ট্র যদি তাদের মেধা বিকাশে ও নিরাপত্তাদানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় তবে তা কেবল দুর্ভাগ্যজনকই নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্যও হুমকিস্বরূপ। সামগ্রিকভাবে এসব ঘটনায় মানবিকতার অধঃপতন এবং একই সঙ্গে অর্থের লোভে যে মানুষ কত নিচে নামতে পারে তা-ই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকার যদি এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহলে এ ধরনের অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাই সময় থাকতেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় এবং এর কোনো বিকল্প নেই।