শিশু শ্রম বন্ধে জনসচেতনতা জরুরী

212

IMG_20161225_113106 (Custom)বংলাদেশের বিভিন্ন পেশায় ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ নিয়োজিত আছে বিভিন্ন কাজে, দিচ্ছে শ্রম। প্রাপ্ত বয়স্কদের পাশাপাশি শিশুদের শ্রম দিতে হচ্ছে। দিনে দিনে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে।
আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষৎ। তাদেরকে সামনের পথে এগিয়ে দেওয়া সমাজেরই দায়িত্ব। কিন্তু পরিবারের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা বাধ্য করছে তাদের কম বয়সে কাজ করতে। যে বয়সে তাদের খাতা কলম নিয়ে স্কুলে যাবার কথা ছিলো, ঠিক সেই বয়সে শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণে আজ তারা শিশু শ্রমিক।
মূলত তাদের নিজেদের খাওয়া আর পরিবারের খাওয়ার জন্য লেখাপড়ার পরিবর্তে বিভিন্ন পেশায় যেমন লেগুনার সহকারী, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহ শ্রমিক, এমব্রয়ডারি, ইট ভাঙা, ইট ভাটা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, রঙ মিস্ত্রিসহ আরো বিভিন্ন ধরণের কাজে নিয়োজিত হচ্ছে শিশুদের।
ইন্টারনেট সুত্র মতে শহর অঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শিশু শ্রমের প্রবণতা অনেক বেশি। শিশু শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১৫ লাখ শিশু শ্রমিক শহরে এবং ৬৪ লাখ রয়েছে গ্রামাঞ্চলে। এই শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৪৫ লাখ শিশু শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত। ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমে নিয়োজিত প্রায় ১৩ লাখ শিশু এক সপ্তাহে ১৬৮ ঘণ্টার মধ্যে কাজ করছে প্রায় ৯০ ঘণ্টা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে গিয়ে দেখা যায় এমন অনেক শিশুকেই। যারা বাল্যকাল থেকেই ঝুঁকে পড়ে শ্রমের দিকে। দারিদ্র্যতার কারণে শিশু অবস্থায় দিতে হয় তাদের কঠোর শ্রম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে ১০ কি.মি দূরে অবস্থিত বালিয়াঘাট্টার রমজান, শাকিল ও শাহীনসহ আরো অনেকের সাথে কথা হয়, যারা শিশু শ্রমের সাথে জরিত। তাদের সাথে কথা বলার সময় শাকিল আলী জানান, তার বাড়ি বালিয়াঘাট্টা। বয়স ১০ বছর। ৪ ভাইবোনের মধ্যে শাকিল সবার বড়। তিনি দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখা-পড়া করে আর পড়া হয় নি। তার বাবা দোকানে দোকানে কাজ করে সংসার চালান। তাতে ভালাভাবে সংসার চলে না। তাই পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের ভার এসে পড়ে শাকিলের উপর। শাকিল জানান, তার পড়াশুনা করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু পরিবারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে আর পড়াশুনা করা হয়ে উঠেনি।এজন্য তিনি চায়ের দোকানে কাজ করেন।
তার পিতার সাথে কথা বললে তিনি বলেন, আমিতো বাইরে বাইরে কাজ করে বেড়াই। মাসে একবার বাড়িতে আসি। তাই জানতেই পারিনি কখন সে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে। আর আমার স্ত্রীও পড়াশুনা জানেনা। তাই সেও তেমন ভ্রুক্ষেপ করেনি। তারপর আমাদের পরিবার চালানোর তাগিদে আর ওকে স্কুলে ভর্তি করা হয়নি।
শিশু রমজান আলী বলেন, “হাঁর বয়স ১৭ বছর। হাঁরঘে বাড়ি বালিয়াঘাট্টা। হামি ২ বছর থ্যাইকা একটা কাঠের দোকানে কাজ করি। হাঁর আম্মা-আব্বা দুজনাই রোগ্যাঠা (রোগে আক্রান্ত)। তাই তারা কোন কাজ করতে পারে না। হাঁরা ৭ ভাই-বোহিন। আর হাঁরঘের সংসার চালানোর লাইগ্যা হামি কাঠমিস্ত্রির দোকানে কাজ করি। হামি পঞ্চম শ্রেণী পাস কর‌্যাছি। তারপর আর স্কুলে ভর্তি হইনি।”
শাহিন নামে আরও একজন বালিয়াঘাট্টার একটি কাঠমিস্ত্রির দোকানে কাজ করেন। তার বয়স ১১ বছর। সে কোন স্কুলে ভর্তি হয়নি। সেও দারিদ্র্যের শিকার। যার কারণে পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন তুলে দিতে নিজেদের স¦প্নকে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে নিজের বুকের মাঝে। অকালেই ঝড়ে পড়ে শাহিন। শাহিন ও রমজান আলীর পিতামাতার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলে তারা কথা বলতে অনিহা প্রকাশ করেন।
তাদের স্কুল শিক্ষকের সাথে কথা বললে তারা জানান, আমরা বাচ্চাগুলোদের পুনরায় পড়া শুরু করার জন্য তাদের বাড়ি গিয়ে তাদের পিতামাতার সাথে কথা বলেছি। কিন্তু আশানুরূপ কোন ফল পাইনি। কিছু কিছু পিতামতার অনিহা এবং দারিদ্র্যতার কারণেই বাচ্চা গুলোর এ দূরাবস্থা।
এ ব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাডভোকেট সাদিকাতুল বারী বলেন, শিশুশ্রম নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। সাধারণত যারা ১৮ বছরের নিচে তাদেরকে জাতিসংঘ শিশু হিসেবে ঘোষণা করেছে। শিশুদের যে সময়টা সার্বিক ভাবে বেড়ে উঠার সময় স্কুলে গিয়ে পড়ালেখা করার সময় সে সময়ে দারিদ্র্যের কাছে হার মানতে হচ্ছে তাদের। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুদের বড় বড় বোঝা উঠাতে হয় যা তাদের বয়সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর এটা অমানবিকতা। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে অনেক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এ আইনের প্রতি এখনও তেমন কোন জোরালো পদক্ষেপ কার্যকর হয়নি। শিশুশ্রম থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য যেমন আইনের প্রতি জোরালো পদক্ষেপ দরকার তেমনি গণসচেতনতা বৃদ্ধি করাও দরকার। যদি প্রত্যেক সন্তানের পিতামাতা তাদের সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল হয় তবে শিশুশ্রম কিছুটা হলেও কমে আসবে। তাই শিশুশ্রম বন্ধের জন্য আইন প্রণয়নের পাশাপাশি গণসচেতনতা খুবই গুরুপ্তপূর্ণ এবং জরুরী।
দারিদ্র্যের কাছে হার মেনে অকালে ঝরে পড়া শিশুদের ছেলেবেলার সাজানো স্বপ্নগুলো থেকে যাচ্ছে স্বপ্নের মধ্যেই। তাদের জন্য সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ঝরে পড়া এবং শিশু শ্রম বন্ধে কাজ করে যাচ্ছে। তবে কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সরকারের ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে জরুরী শিশুদের ঝরে পড়া রোধ করে শিশুশ্রম বন্ধ করে তাদের সোনালী ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

ফেলো রেডিও মহানন্দা