শিক্ষানুরাগী ও উজ্জ্বল নক্ষত্রে ভরপুর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষা

7

মোস্তাক হোসেন

শিক্ষা মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশে সহায়ক। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দক্ষতাও বৃদ্ধি করে থাকেন। শিক্ষা মূলত অনুশীলনের দ্বারা সম্ভাবনার পরিপূর্ণতা সাধন করে। জীবনের ত্রুটি এড়াতে অনুশীলনের বিকল্প নেই। আর এই কার্য সাধনের আবশ্যকতা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাগুরুর।
প্রথম দিকে দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলই না বললেই চলে। সেসময় দেশের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্র ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। সেসকল প্রতিষ্ঠান চলত স্থানীয় জোতদার-জমিদারদের আর্থিক সহযোগিতায়। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিকদের উপনিবেশীয় কার্য সাধনের উদ্দেশ্যে তাদের ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। দেশে শিক্ষার প্রসার ঘটে মূলত ইংরেজদের ঔপনিবেশিক আমলে, ১৮৫৪ সালে ‘গ্রান্ট ইন এইড’ প্রথা চালুর পর থেকে। এর মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারিভাবে সাময়িক আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে থাকত। এই প্রথার ফলস্বরূপ স্থানীয় ভূস্বামীরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমনিভাবে গড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’, ‘ভোলাহাট রামেশ্বর পাইলট ইনস্টিটিউশন’ ও ‘কানসাট উচ্চ বিদ্যালয়’ উল্লেখ্য।
বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপকতা পেয়েছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারের রাজস্ব খাতভুক্ত। এছাড়াও রয়েছে বেসরকারি, কিন্ডারগার্টেন (কেজি) ও এনজিও পরিচালিত স্কুল। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হালনাগাদ তথ্যমতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা সরকারি ৭০৬টি, বেসরকারি ২৬, কেজি ১৩১ ও এনজিও পরিচালিত ২৫৯টি।
স্বাধীনতা পরবর্তী অর্থাৎ ১৯৭৭ সালে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি বিধিমালা প্রণয়নের পর ১৯৮০ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার মূল বেতনের ৫০% প্রদান করত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত বিধিমালা দ্বারা গঠিত ‘ম্যানেজিং কমিটি-গভর্নিং বডি’কে বেতনের অবশিষ্ট অংশ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রদানের জন্য সুপারিশ করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত এই বিধিমালার কারণে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে অগ্রসর হতে আরম্ভ করল। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন জেলার ন্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের জনসংখ্যা ও শিক্ষার্থী বিবেচনায় বেসরকারি উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকল। শিক্ষানুরাগী ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের সচেষ্ট উৎসাহ ও উদ্দীপনায় নিজ নিজ আঞ্চলে নির্মাণ হতে লাগল শিক্ষার্থীর দক্ষতা অর্জনের লক্ষে বিদ্যাপীঠ। দেশের শিক্ষার্থীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে এই বিধিমালা সুফল এনে দিয়েছে, বিশেষ করে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে। ধীরে ধীরে বিধিমালাটির পরিবর্তন ও পরিমার্জনের ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার মূল বেতনের শতভাগ প্রদান করছে। সরকারের তদারকির কারণে দেশের সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শাখায় দেশের শিক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
২০২৪ সালের তথ্যানুসারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কলেজ ৫১টি, স্কুল অ্যান্ড কলেজ ১০টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৩৫টি, নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৯টি, মাদ্রাসা ১৩২টি ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৬টি রয়েছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠার পেছনে প্রতিটি অঞ্চলের শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের অবদানকে অবজ্ঞা বা অসম্মান করার উপায় নেই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় শিক্ষার প্রসারণে বিভিন্ন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন। তাঁদের কর্ম ভুলবার অবকাশ নেই। এই জেলার শিক্ষানুরাগী ইদ্রিস আহম্মেদ মিয়া আমাদের বরণীয় ব্যক্তি। তিনি অনগ্রসর গ্রামের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই জেলার গ্রামাঞ্চলের ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা ‘আদিনা সরকারি ফজলুল হক কলেজ’ একটি। ইদ্রিস আহম্মেদ মিয়া ছাড়াও অনেক শিক্ষানুরাগী ছিলেন, যাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। তাঁদের ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমের অবদানকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা না করেও এই শিক্ষায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন, তিনি হলেন ২০০৬ সালে ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জিয়াউল হক। তিনি একজন জ্ঞানপিপাসী ও শিক্ষানুরাগী বরেণ্য ব্যক্তি। তিনি তাঁর এলাকায় অভাবগ্রস্ত, দরিদ্র মেধাবী স্কুল-কলেজের শত শত শিক্ষার্থীর মধ্যে বছরের শুরুতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই (আগে ৬ষ্ঠ থেকে শুরু করে তার উপরের শ্রেণী এবং বর্তমানে একাদশ শ্রেণীর উপরের পাঠ্যবই কিনতে হয়), খাতা, পেন্সিল, কলম ইত্যাদি তুলে দেন এবং বছর শেষে পাঠ্যবইগুলো ফেরত নিয়ে অন্যদের দিতেন। এভাবেই তিনি শিক্ষায় অবদান রেখে চলেছেন।
আরো একজন শিক্ষানুরাগীর নাম না বললেই নয়। তিনি হলেন কানাই চন্দ্র দাস, কানাই মাস্টার নামে অধিক সমাদৃত। এই জেলার বাবুডাইং অঞ্চলের শিক্ষায় সুবিধাবঞ্চিত আদিবাসী শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর ছয়জন শিক্ষার্থী দিয়ে তাঁর শিক্ষাদান শুরু। নিজের শ্রম ও চেষ্টার ফলে নির্লোভ সমাজসেবায় ব্রত কানাই মাস্টারের প্রতিষ্ঠিত সেই ছোট্ট স্কুলটি আজ পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাঙ্গনে রূপান্তরিত হয়েছে। নিরক্ষর আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানোর কঠিন দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ‘সাদা মনের মানুষ সম্মাননা’।
এঁরা বাদেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা শিক্ষায় অবদান রেখেছেন এবং এখনো রাখছেন। এসব ব্যক্তিবর্গের প্রতি শ্রদ্ধা নিরন্তর।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষানুরাগীরাও যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষায় অবদান রেখে এই জেলাকে সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি এই জেলার শিক্ষায় প্রখ্যাত গুণীজনরাও নাম উজ্জ্বল করেছেন। তাঁদের তালিকাও কম নয়। এই জেলার উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করেছেন যে ক’জন, তাঁদের মধ্যে রফিকুন নবী রনবী একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৯৩ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি কার্টুনিস্ট হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন এবং কার্টুনে টোকাই চরিত্র তাঁর অমর সৃষ্টি। তিনি এই জেলারই মানুষ।
ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ হলেন এই জেলার আরেক প্রখ্যাত গুণীজন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং দেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ছিলেন। তাঁর ৪০ বছরের গবেষণা কর্মের কারণে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষজ্ঞ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে প্রখ্যাত ছিলেন। এই বরেণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীকে ১৯৯২ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
এই জেলার আরেক কৃতী সন্তান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মনিরুজ্জামান মিঞা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাষ্ট্রদূত, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ও জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এই জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটিকে মনিরুজ্জাামান মিঞা শিক্ষা কমিশন বলা হয়। এই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ২০০৪ সালে শিক্ষায় একুশে পদক লাভ করেন।
দেশের বরেণ্য শিক্ষক, নাট্যকার, অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক মমতাজউদদীন আহমদ চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরেক কৃতী সন্তান। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন চট্টগ্রাম কলেজে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লেখা নাটক দেশের শিক্ষায় পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে তাঁর লেখা ‘কি চাহ শঙ্খ চিল এবং রাজা অনুস্বরের পালা’ তালিকাভুক্ত হয়েছে। তিনি জাতিসংঘের বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নাটকে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। এই গুণীজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৌরব শ্রীবৃদ্ধি করেছেন।
উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জের গুণীজনের তালিকা আরো সুদীর্ঘ। যাঁরা শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক অবদান রেখেছেন বা রেখে চলেছেন। পত্রিকার পরিসরের কারণে সবার নাম উল্লেখ করা সম্ভব হলো না বলে, আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। সেই সঙ্গে সেইসব উজ্জ্বল ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা চিত্তে স্মরণ করছি।

সহকারী প্রধান শিক্ষক, পলশা উচ্চ বিদ্যালয়

নেটওয়ার্ক শিক্ষক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঢাকা

সভাপতি, উপজেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ