শিক্ষাগ্রহণে বয়স বাধা নয়-প্রমাণ করলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব হান্নান

6

শিক্ষাগ্রহণের নির্ধারিত কোনো বয়স নেই। যে কোনো বয়সে যে কেউই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। তার জন্য প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা ও মনোবল। এরকমই মনোবলের অধিকারী আবদুল হান্নান। বয়স ৫৪ বছর। যে বয়সে সবাই নিজেকে ‘বৃদ্ধ’ ভাবতে শুরু করেন, সেই বয়সে তিনি ২০২১ সালের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ ৪.১১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার এ কৃতিত্বে আনন্দিত গ্রামবাসীও।
আবদুল হান্নানের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের কামাত গ্রামে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই স্বজন ও এলাকাবাসীর শুভেচ্ছায় সিক্ত হচ্ছেন তিনি। এরই মধ্যে এলাকাবাসীর কাছে ‘গর্ব’ হিসেবেও প্রমাণিত হয়েছেন।
আবদুল হান্নান শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের তেলকুপি জামিলা স্মরণী ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট থেকে ২০২১ সালের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেন এবং জিপিএ-৪.১১ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।
মৃত মঞ্জুরের চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে আবদুল হান্নান। কিছুটা বাউন্ডুলে এই মানুষটি ৮ম শ্রেণি পাসের পর পড়াশোনায় ইতি টানেন। প্রতিষ্ঠানিক বিদ্যার দৌড় ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত হলেও জমি-জমার হিসাব বুঝতেন ভালোই। সে সুবাদে এলাকার এ-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আদালতে যাতায়াত তার। আদালত ঘুরতে ঘুরতেই ইচ্ছে জাগে মুহুরি হওয়ার, মাকেও বলেন সে কথা। এটি ২০১০-২০১১ সালের দিককার কথা। কিন্তু বাধ সাধে প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র। মুহুরি হতে হলে এসএসসি পাস সনদ লাগবে।
আবদুল হান্নান ফাঁকি দিয়ে সনদ অর্জন করতে চাননি। চেয়েছেন রীতিমতো পরীক্ষায় অংশ নিতে। তার অদম্য ইচ্ছায় তাকে এসএসসি পাস করিয়েছে। অকৃতকার্য হয়েও দমে যাননি।
২০১৮ সালে তেলকুপি জামিলা স্মরণী ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন আবদুল হান্নান। ভর্তি হয়ে সব পরীক্ষায় অংশ নেন। নিয়মমাফিক এসএসসি পরীক্ষায় বসেন ২০২০ সালে। কিন্তু দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য এবং একটি বিষয়ে অনুপস্থিত থাকায় ২০২১ সালে আবারো এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। এবার আশাহত হননি তিনি। কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ-৪.১১ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।
আবদুল হান্নানের ৩ ছেলে, ২ মেয়ে। মেয়ে দুটির বিয়ে দিয়েছেন, বড় ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকেন। আর ছোট ছেলে দুটি লেখাপড়া করছেন।
ছেলে জাহিদ হাসান জনি বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যলয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। এখন থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন বাবার ফলাফলকে ছাড়িয়ে যাবার। ৫৪ বছরের ‘তরুণ’ বাবা হান্নানের সন্তানের কাছ থেকে চাওয়াটাই এইরকম। আরেক ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে।
জাহিদ হাসান জনি বলেন, আমার আব্বা ৫৪ বছর বয়সেও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪.১১ পেয়ে পাস করেন। আমিও ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিব। আমি চাই, আব্বার থেকে আরো ভালো রেজাল্ট করার।
নতুন করে পড়ালেখার শুরুটা কীভাবে শোনা যাক আবদুল হান্নানের মুখ থেকেই। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় গৌড় বাংলাকে তিনি বলেন, জমি-জমা সংক্রান্ত কাজে প্রায়ই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতে যেতে হতো। এ থেকেই মুহুরি হিসেবে কাজ করার ইচ্ছে জাগে। কিন্তু এ পেশায় যোগদান করে পরিচয়পত্র পেতে হলে ন্যূনতম এসএসসি পাসের সার্টিফিকেট লাগবে। তাই সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য আমি ২০১৮ সালে তেলকুপি জামিলা স্মরণী ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হই। ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হই। আবারো ২০২১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিই এবং জিপিএ-৪ দশমিক ১১ পেয়ে পাস করি। তিনি আরো বলেন, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষাগ্রহণ করতে কোনো বয়স বাধা হতে পারে না। শিক্ষা ছাড়া দেশ ও জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। হান্নান জানান, তার পরীক্ষার ফলাফলে এলাকায় ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। তিনি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাও দিবেন বলে গৌড় বাংলাকে জানিয়েছেন।