শাকসবজিতে ছেয়ে যাচ্ছে ভাগলপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প

72

প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনার বিশেষ ১০ উদ্যোগের প্রথমটি হচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এরই মধ্যে ৪ হাজার ৫৮৯টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ গৃহ নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। আরো ২৩০টি গৃহ নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে; যার ৪৫ ভাগ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে কাঁচা রাস্তা তৈরির পর পাকাও করা হয়েছে। বাকিগুলোও করা হবে বলে জানা গেছে। সেই সঙ্গে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করারও পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
এদিকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় শাকসবজি চাষ করে পরিবারের অনেকটাই চাহিদা পূরণ করছে। তারা কেউ গাভি, কেউ ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করছেন। কেউ বা সেলাইমেশিনে কাজ করছেন। পুরুষরা কেউ রিকশা-ভ্যান তো কেউ বা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের এমনই একটি গ্রাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার ভাগলপুর দক্ষিণা গ্রাম। ওই গ্রামে একটি পুকুর আছে, সেই পুকুরে প্রকল্পের উপকারভোগীরা মাছ চাষ করছেন। পুকুরের এক পাড়ে ৭টি অপর পাড়ে ১৯টি পরিবার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহারের ঘর পেয়েছে। তাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনাও করছে।
এ গ্রামের অনেক পরিবারই ঘরের পাশের ফাঁকা জায়গায় শাকসবজি চাষ করছেন। সবুজ লতাপাতার ফাঁকে পাকা কুমড়োও দেখা গেছে বেশ কয়েকটি বাড়িতে। এখনো যারা শাকসবজি চাষ শুরু করেননি, তারা দ্রুতই করবেন বলে জানান।
হানিফ আলী ও তার স্ত্রী উম্মে হাবিবা সুলতানা বেগম। এই দম্পতি এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন এই গ্রামে। নিজে কৃষিকাজ করেন হানিফ। আশ্রয়ণ প্রকল্পের যে ঘর পেয়েছেন তার সামনে খানিকটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। সেই ফাঁকা জায়গায় তারা শাকসবজি চাষ করছেন। যা দিয়ে সংসারের সবজি চাহিদার অনেকটাই পূরণ হচ্ছে। সরকারি পুকুরে অন্যদের সঙ্গে মাছ চাষ করছেন। পরের জমি চাষাবাদ করে ধান পাচ্ছেন। ছেলেমেয়ে দুটিকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। মেয়ে হানিফা আকতার মেঘলা রহনপুর রাবেয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যায় সে। ছোট ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
সুলতানা বেগম ও স্বামী হানিফ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেনÑ আগে রহনপুরের প্রসাদপুরে রেললাইনের ধারে থাকতাম। নিজের জায়গাজমি ছিল না। এখন ঘর পেয়েছি, মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। অন্যের জমি আধি করে ধান পাচ্ছি। ছেলেমেয়ে দুটিকে পড়াতে পারছি। আগের তুলনায় এখন অনেক ভালো আছি।
রিকশাভ্যানক চালক আমির আলী তার স্ত্রী সালেহা বেগমকে নিয়ে রহনপুরে রেললাইনের জায়গায় ছিলেন। এই গ্রামে ঘর পেয়ে তারাও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন।
আমির আলী ভ্যান নিয়ে সকালেই বেরিয়ে গেছেন। তাদেরও দুজন ছেলেমেয়ে। ৯ বছরের মেয়েটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। স্বামীর আয় দিয়ে ৩৫ হাজার টাকায় কিনেছেন একটি বকনা গাভি। রান্নাবান্নার পাশাপাশি সন্তানদের যেমন লালন করছেন তেমনি বকনাটিকেও লালনপালন করছেন সালেহা।
সালেহা বলেনÑ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জমি ও ঘর করে না দিলে এটা হতো না। আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো আছি।
একই পাড়ায় ঘর পেয়েছেন জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি সাইকেলের মেকারি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার বাড়িতে দেখা গেল শাকসবজির পাশাপাশি ডালিম গাছ। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে ছোট ছেলে মাশরাফি রহমান প্রথম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। তার স্ত্রী শরিফা বেগম বলেনÑ আমরা অনেক ভালো আছি।
এই পরিবারগুলোর মধ্যে সচ্ছলতার ছাপ লক্ষ্য করা গেছে।
এখানে বাস করেন প্রতিবন্ধী তাইস উদ্দিন। তিনি প্রতিবন্ধী হলেও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ডালি বুনিয়ে সংসার চালান। কথা হয় তার স্ত্রী রোসনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেনÑ ছেলেটাও প্রতিবন্ধী। তবুও ভিক্ষা না করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ভ্যান চালায়। সব মিলিয়ে আমরা এখানে অনেক ভালো আছি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর পৌরসভা সদর থেকে আড়াই কিলোমিটার পিচঢালা আঁকাবাঁকা পথ। সেই পথ দিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ল বরেন্দ্রভূমির লাল মাটির বুক চিরে আবাদ হয়েছে আমন ধান। মাঠে মাঠে চলছে সোনালি ধান কাটা-মাড়াইয়ের উৎসব। এমনই মাঠের মধ্যে সরকারি জমিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ ১০ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় দুই ধাপে ২৬টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর করে দেয়া হয়েছে।
পরিবারগুলোর অনেকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, আগে নিজের জায়গা ছিল না, ছিল না ঘর। এখন জায়গাও পেয়েছি, ঘরও পেয়েছি। এখানে আমরা অনেক ভালো আছি। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেনÑ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত আমাদের খোঁজখবর নেয়। তারা বলেন, এখানকার রাস্তা কাঁচা হওয়ায় বর্ষার সময় যাতায়াতে কষ্ট হয়। তারা রাস্তাটি পাকা করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
এ ব্যাপারে কথা হয় গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এ উপজেলায় ইতোমধ্যে ৬৫৮টি ঘর নির্মাণ করে উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তারা সবাই ঘরগুলোয় বসবাস করছেন। আরো ৭৫টি ঘরের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ করেই ঘরগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় বসবাসকারীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সকল বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে, মাদক প্রতিরোধে সচেতনতামূলক উঠান বৈঠকও করা হচ্ছে। প্রধান সড়কের সঙ্গে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারীদের জন্য সংযোগ সড়ক তৈরি ও ড্রেন তৈরি করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়ে কথা হয় জেলা প্রশাসক এ কে এম গালিভ খাঁনের সঙ্গে। তিনি বলেনÑ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ ১০ উদ্যোগের মধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি হচ্ছে প্রথম। এটিকে তিনি পরম মমতায় লালন করেন। সেই প্রকল্পের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এর আগে ৪ হাজার ৫৮৯টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ২ শতক করে জমিসহ ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। আরো ২৩০টির নির্মাণ কাজ ৪৫ ভাগ শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে নির্মাণ শেষে সরাদেশের সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঘরগুলোর উদ্বোধন করবেন। আমরা রাস্তা ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছি। উপকারভোগীদের সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এত সহায়-সম্বলহীন মানুষকে জমিসহ ঘর নির্মাণ করে দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক এ কে এম গালিভ খাঁন।