রাষ্ট্রচিন্তক শেখ হাসিনা

90

অজিত দাস

শেখ হাসিনা শুধু একজন খ্যাতিমান রাজনীতিক বা বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কই নন, সাম্প্রতিক বিশ্বের তিনি একজন অন্যতম রাষ্ট্রচিন্তকও বটে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম অবদান হলো ‘জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্ব’। জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বটি বর্তমানে ‘বিশ্বশান্তির মডেল’ হিসেবেও পরিচিত। শেখ হাসিনার এই রাজনৈতিক তত্ত্বটি পৃথিবীর বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও সেমিনারে আলোচিত ও প্রশংসিত হয় এবং ২০১২ সালে এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘বিশ্বশান্তির মডেল’ হিসেবে গৃহীত হয়। আলোচ্য প্রবন্ধে শেখ হাসিনার জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবার পূর্বে ‘রাষ্ট্রচিন্তা / রাষ্ট্রচিন্তক’, ‘রাজনৈতিক তত্ত্ব’, ‘রাজনৈতিক দর্শন’ এই শব্দগুলো নিয়ে দু’চার কথা বলা দরকার।

রাষ্ট্রচিন্তা কাকে বলে?
রাষ্ট্র হলো একটি বৃহৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এই রাষ্ট্রের মধ্যেই মানুষ জন্মগ্রহণ করে, বড় হয়, পূর্ণতা লাভ করে এবং এই রাষ্ট্রের মধ্যেই একদিন বিলীন হয়ে যায়। বস্তুত সমাজের সকল মানবিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাষ্ট্রের অবস্থান সবার উপরে।১ তাই তো রাষ্ট্র সৃষ্টির ঊষাকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই মানবিক প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, আলাপ-আলোচনার শেষ নেই। রাষ্ট্র নিয়ে যুগে যুগে তাই মনীষীরা যেসব চিন্তা-ভাবনা করেছেন ইতিহাসে তাকেই রাষ্ট্রচিন্তা নামে অভিহিত করা হয়। সহজ কথায় জ্ঞানী বা প-িত ব্যক্তিদের রাষ্ট্র সম্পর্কিত চিন্তা-ভাবনাই হলো রাষ্ট্রচিন্তা।২ আর যিনি রাষ্ট্র নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকেন তাকেই বলা হয় রাষ্ট্রচিন্তক।
রাষ্ট্রচিন্তা প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি হলো ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তা এবং অপরটি অ-ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তা। ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তা বলতে মূলত প্রাচীন গ্রিসের রাষ্ট্রচিন্তাকে বোঝায়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রচিন্তা বিকশিত হলেও প্রাচীন গ্রিসই হলো এর লালনভূমি। ব্যক্তিস্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, রাষ্ট্র, সরকার প্রভৃতি বিষয়গুলো সর্বপ্রথম প্রাচীন গ্রিসেই জন্মলাভ করে এবং গ্রিসের প-িত ও দার্শনিকগণ যুক্তি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র তৈরি করেন।৩ এছাড়া গ্রিক দার্শনিকগণ রাজনীতিকে স্বতন্ত্রভাবে শুধু বিশ্লেষণই করেননি, এর সাথে তর্কবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, অধিবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়কে সংযুক্ত করে রাষ্ট্রনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলেন।৪
যদিও মধ্যযুগের ধর্মান্ধতা, বিভিন্ন কুসংস্কারের কারণে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় কিন্তু রেনেসাঁ বা নবজাগরণের কারণে আধুনিক যুগের সূচনা হলে হবস, লক, রুশো, ম্যাকিয়াভেলি, কান্ট, হেগেল, মার্কস, এঙ্গেলস, ল্যাস্কি প্রমুখ রাষ্ট্রচিন্তাকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। অবশ্য এক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অপরদিকে অ-ইউরোপীয় বা প্রাচ্যদেশীয় রাষ্ট্রচিন্তা বলতে প্রাচীন মিশরীয়, ব্যাবিলনীয়, পারস্য, ভারত ও চীনের রাষ্ট্রচিন্তাকে বলা হয়ে থাকে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় বিশেষ করে গ্রিসীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিকাশ, সরকারের ধরন ইত্যাদি বিষয়গুলো যেভাবে পরিলক্ষিত হয় তা অ-ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় পরিলক্ষিত হয় না। কারণ এসব দেশের সরকার ছিল মূলত স্বৈরতান্ত্রিক। প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রচিন্তা মূলত স্বৈরতান্ত্রিক রাজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। ফলে এখানে কোনো রাজনৈতিক মতবাদ বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। অধ্যাপক উইলোবি (W.W. Willoughby) তাই বলেন, রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে প্রাচ্যদেশীয় সভ্যতাগুলোর যে অবদান তা নিতান্তই সাম্রাজ্যের ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। রাষ্ট্রচিন্তার মুক্ত বিকাশের জন্য যে প্রতিভার প্রয়োজন তা প্রাচ্যদেশীয় লোকদের মধ্যে ছিল না। তাই রাষ্ট্রচিন্তার জগতে তারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়নি।৫ অবশ্য বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ব্যাপক উন্নতির ফলে সি.সি. ম্যাক্সে প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ-ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।৬ ম্যাক্সে বলেন, ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তায় এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা ভারতবহির্ভূত রাষ্ট্রচিন্তায় আদৌ দেখতে পাওয়া যায় না। ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তা পুরোপুরি নিজস্ব ভাবনাচিন্তা ও ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।৭ প্রাচীন ভারতের রাজারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। সুষ্ঠুভাবে রাজকার্য পরিচালনার জন্য মন্ত্রী নিয়োগ করতেন, বিচারকার্য সম্পাদন করতেন, গুপ্তচর নিয়োগের মাধ্যমে রাজ্যের খবরাখবর সংগ্রহ করতেন, রাজা-প্রজার সম্পর্ক, রাজা-মন্ত্রীর সম্পর্কও নির্ধারণ করতেন। আর এই প্রশাসনসংক্রান্ত বিষয়গুলো তৎকালীন ভারতীয় চিন্তাবিদগণ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলেছিলেন। সেসব রাষ্ট্রচিন্তকের মধ্যে অন্যতম হলেন মনু, কৌটিল্য প্রমুখ। ‘মনুসংহিতা’তে প্রথম রাজকীয় শাসনের অনেক বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়। পরবর্তীকালে কৌটিল্য তাঁর রচিত প্রখ্যাত গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্রে’ সেই আলোচনাকে আরও সুসংহত ও যৌক্তিক রূপ দান করেন। কার্যত ‘অর্থশাস্ত্রের’ বিষয়বস্তুর মধ্যেই প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তা সুসংহত রূপ লাভ করে।৮
মধ্যযুগে ভারতবর্ষ সুলতানি শাসনের আওতায় আসলে শুরু হয় মুসলিম শাসন। গোটা মধ্যযুগ এই মুসলিম শাসন বজায় থাকে। সুলতানি শাসকগণ ভারতবর্ষে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঐক্যবদ্ধতা দান করেন এবং সুদৃঢ় প্রশাসন ব্যবস্থা ও সুসংহত রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলেন। যদিও কোনো কোনো ঐতিহাসিক (ড. ঈশ্বরী প্রসাদ, আর. পি ত্রিপাঠী, শ্রীবাস্তব প্রমুখ) মধ্যযুগীয় ভারতের সুলতানি রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণভাবে একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক আবার সেটার বিরোধিতাও করেন। ড. কুরেশী (I. H. Qureshi), ড. মোহাম্মদ হাবিব, সতীশচন্দ্র প্রমুখ মনে করেন মধ্যযুগের ভারতবর্ষ ধর্মতান্ত্রিক ছিল না বরং সেটা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বা Secular State.
যাহোক, মধ্যযুগীয় ভারতের কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, চিন্তা-চেতনার অন্ধত্ব, সংকীর্ণতার যুগে ভারতবর্ষকে আধুনিক উদার চিন্তাধারায় গড়ে তুলতে এগিয়ে আসেন রাজা রামমোহন রায়। রামমোহন রায় ছিলেন একজন খাঁটি উদারনীতিবাদী চিন্তাবিদ। তিনি ভারতবর্ষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, শিক্ষা সকল ক্ষেত্রেই উদারনৈতিক চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটান। টমাস প্যান্থাম তাই যথার্থই বলেছেন, “He (Roy) appreciated the liberal, scientific, world-affirming attitude of modern western thought…”৯ রাজা রামমোহন রায়ের পর অ-ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তা বিশেষ করে ভারতবর্ষের আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেন স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী, মানবেন্দ্রনাথ রায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ রাষ্ট্রচিন্তক। সাম্প্রতিককালে রাষ্ট্রচিন্তার এই চারণভূমিকে যাঁরা আরও উর্বর করে তোলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অনবদ্য সৃষ্টি হলো ‘জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্ব’।

রাজনৈতিক তত্ত্ব বা রাষ্ট্রতত্ত্ব (Political Theory)
রাজনৈতিক তত্ত্ব (Political Theory) বা ‘রাষ্ট্রতত্ত্ব’ হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্ব কাকে বলে এবং এর প্রকৃতি ও ভূমিকা কি তা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। সাধারণভাবে রাজনৈতিক তত্ত্ব বলতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই অংশকে বোঝায় যার প্রধান কাজ হলো রাজনৈতিক বিষয়ে কতকগুলো সাধারণ নীতিকে (General principles) সূত্রবদ্ধ করা। রাজনৈতিক তত্ত্ব শুধু রাষ্ট্রের উৎপত্তি, প্রকৃতি, বিকাশ ও লক্ষ্যকে নিয়েই আলোচনা করে না, সেই সঙ্গে তা ব্যাপক দৃষ্টিতে রাজনৈতিক জীব হিসেবে মানুষ এবং রাজনৈতিক প্রণালীসমূহকে (Political process) নিয়েও আলোচনা করে। অবশ্য সাম্প্রতিককালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড ইস্টন (David Easton) বলেন, সাধারণভাবে রাজনৈতিক দর্শন বা রাজনৈতিক মূল্যবোধের আলোচনাই হলো রাজনৈতিক তত্ত্ব। আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোকার (Francis Coker) বলেন, সরকার এবং তার বিভিন্ন রূপ ও কার্যাবলিকে সাময়িক ফলাফলের ভিত্তিতে কেবল বর্ণনা, তুলনা ও পর্যালোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে যখন মানুষের চিরন্তন প্রয়োজন, আশা-আকাক্সক্ষা ও মতামত অনুধাবন ও মূল্যায়নের তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় তখন রাজনৈতিক তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে। অধ্যাপক প্লামেনেজ (Plamenatz) বলেন, রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো এমন এক ধরনের বাস্তব দর্শন (Practical Philosophy) যা বিশেষভাবে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।১০ আর্নল্ড ব্রেখট (Arnold Brecht) বলেন, রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো “as a proposal which is expressed in terms of some data, and support some idea.”১১ সবমিলিয়ে বলা যায়, রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো রাজনীতির মৌলিক ধারণা এবং প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়ের পাঠমাত্র (a study of basic concepts and major issues in politics.)। বস্তুত রাজনৈতিক তত্ত্ব যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা করে, তেমনি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ রাজনৈতিক নিয়োগ ইত্যাদি বিষয়কেও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করে।
ডেভিড ইস্টন রাজনৈতিক তত্ত্বকে দু’ভাগে ভাগ করেছেন, যথা- মূল্যবোধযুক্ত তত্ত্ব (Value Theory) এবং সাময়িক তত্ত্ব (Casual Theory)। যে রাজনৈতিক তত্ত্বে রাজনৈতিক মূল্যবোধ ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেটাই হলো মূল্যবোধযুক্ত তত্ত্ব। প্রধানত সনাতন রাজনৈতিক তত্ত্বগুলো (Traditional Political Theories) তাদের রাজনৈতিক আলোচনাকে মূল্যবোধযুক্ত করে গড়ে তোলে। অপরদিকে যেসব রাজনৈতিক তত্ত্ব শুধু বিভিন্ন প্রকার রাজনৈতিক ঘটনাবলির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে তখন তাকে বলা হয় সাময়িক তত্ত্ব। ডেভিড ইস্টন মনে করেন, রাজনৈতিক গবেষণার ক্ষেত্রে তত্ত্বের ভূমিকা সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। তা না হলে গবেষণা কর্মটি খণ্ড খণ্ড ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়বে।১২
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রোল্যান্ড পেনক রাজনৈতিক তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে একে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করেছেন, যথা- ১. নৈতিক তত্ত্ব (Ethical Theory), ২. কাল্পনিক তত্ত্ব (Speculative Theory), ৩. সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব (Sociological Theory), ৪. আইনগত তত্ত্ব (Legal Theory) এবং ৫. বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব (Scientific Theory)।
১. নৈতিক তত্ত্ব : এ ধরনের রাজনৈতিক তত্ত্বে প্রধানত নীতি, নৈতিকতা, ঔচিত্য ও অনৌচিত্যের বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়। এই তত্ত্বটি আলোচনার সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা অবরোহ পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকেন। মূলত ভাববাদী দার্শনিকগণ যেমন প্লেটো, হেগেল, কান্ট, ব্লুন্টসলি, গ্রিন, বোসাংকোয়েত প্রমুখ এই তত্ত্বের সমর্থক।
২. কাল্পনিক রাজনৈতিক তত্ত্ব : এ ধরনের রাজনৈতিক তত্ত্বে কল্পনার ভিত্তিতে সমাজ বা রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব এর বড় উদাহরণ।
৩. সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব : এই তত্ত্বে রাষ্ট্রকে একটি সামাজিক সংগঠন হিসেবে ধরে তার বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়।
৪. আইনগত তত্ত্ব : এ ধরনের রাজনৈতিক তত্ত্বে রাষ্ট্রকে একটি সামাজিক বা রাজনৈতিক সংগঠন মনে না করে প্রধানত একটি আইনগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রধানত শাসনতন্ত্র, আইন, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদির মধ্যেই এই তত্ত্বের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
৫. বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব : এ ধরনের রাজনৈতিক তত্ত্বে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তথ্যকে যাচাই করে সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়। ম্যাকডুগাল, লেবঁক, গ্রাহাম ওয়ালেস প্রমুখ চিন্তাবিদ এই তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা।

রাজনৈতিক তত্ত্ব নির্মাণের প্রশ্নে আবার দুটি ধারা পরিলক্ষিত হয়, যথা- ১. রীতিবদ্ধ তত্ত্ব (Normative Theory) এবং ২. অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্ব (Empirical Theory)।
১. রীতিবদ্ধ তত্ত্ব (Normative Theory) : এ ধরনের তত্ত্বে যুক্তিতর্ক নয় বরং ভালো-মন্দ বা প্রচলিত রীতিনীতির ভিত্তিতেই সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের উপযোগিতা নির্ণয় করা হয়। প্লেটো, এরিস্টটল, হেগেল প্রমুখ ভাববাদীদের রাষ্ট্রচিন্তায় এ ধরনের তত্ত্বের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
২. অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্ব (Empirical Theory) : অভিজ্ঞতাবাদী রাষ্ট্রতত্ত্ব হলো সেই তত্ত্ব যেখানে নীতি-নৈতিকতা, উচিত-অনুচিত, ভাবাদর্শ- এগুলোকে সরিয়ে রেখে মূলত তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সরকার ও রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করা হয়। নতুন নতুন কলাকৌশল ও পরিসংখ্যানের সাহায্যে রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণাকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে আরও স্পষ্ট ও পরিশীলিত করাই অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্বের মূল লক্ষ্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্ব থেকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে এই প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস ব্রাইস তাঁর ‘American Commonwealth’ (1893) গ্রন্থে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় ঐতিহাসিক-দার্শনিক-আইনগত ভাবধারার পরিবর্তে অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চিন্তা-ভাবনার প্রয়োগের কথা বলেন এবং সেক্ষেত্রে অবরোহ পদ্ধতির পরিবর্তে আরোহ পদ্ধতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।১৩ পরবর্তীকালে অর্থাৎ বিংশ শতকের বিশের দশকে ‘আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরিষদ’ অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্বকে আরও বিকশিত করে। নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের বিশ্লেষণ, নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ ও পরিসংখ্যানের ব্যবহার করে রাজনীতিকে বিজ্ঞানধর্মী করে তোলার ক্ষেত্রে সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অভিজ্ঞতাবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বের এই ধারণা নিয়ে পরবর্তীকালে আরও অনেক আলোচনা হয়। মূলত বিশের দশকে এই তত্ত্বের প্রচার ও প্রসারে যেসব রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তাঁদের মধ্যে জন বার্জেস, এ. এল. লাওয়েল, আর্থার বেন্টলে, চার্লস মেরিয়াম এবং পরবর্তীকালে হ্যারল্ড লাসওয়েল, ডেভিড ট্রুম্যান, ভি.ও.কি, রবার্ট ডাল, হার্বাট সাইমন, ডেভিড ইস্টন, হেইনজ ইউলাও, চার্লস হাইনিম্যান, কার্ল ফ্রেডরিক, লুসিয়ান পাই, আলমন্ড ও পাওয়েল প্রমুখ।

রাষ্ট্রদর্শন (Political Philosophy)
দর্শন হলো এক বিশ্বজনীন দৃষ্টি বা ভাবনা। আর রাষ্ট্রদর্শন বলতে রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে এক বিশ্বজনীন ভাবনা বা চিন্তাকেই বোঝায়। অর্থাৎ রাজনীতির আলোচনায় যখন এই বিশ্বজনীন দৃষ্টি ও নৈতিকতার প্রভাব বড় হয়ে দেখা দেয় তখন সেটা হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রদর্শন।১৪ তবে কোনো রাষ্ট্রদর্শনই সমাজনিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি রাষ্ট্রদর্শনেই উদ্দেশ্যবাদ প্রতিফলিত হয়ে থাকে। দার্শনিক প্লেটো তাঁর রাষ্ট্রদর্শন সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রথমেই ‘একটি আদর্শ রাষ্ট্র’ গঠনকে উদ্দেশ্য হিসেবে স্থির করে সেটাকে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সেভাবে তাঁর চিন্তাকে বিন্যস্ত করেন। অনুরূপভাবে এরিস্টটল, ম্যাকিয়াভেলি, হবস, মিল, মার্কসের রাষ্ট্রদর্শনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রাষ্ট্রদর্শনের প্রবক্তা হিসেবে গ্রিন, বার্কার এমনকি ল্যাস্কির রাষ্ট্রচিন্তায়ও অনুরূপ উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডি.ডি. র‌্যাফেল মনে করেন রাষ্ট্রদর্শনে যে তত্ত্ব বা ধারণা প্রাধান্য পায় তা কার্যত একটি বিশ্বাস বা মতবাদ। আর রাষ্ট্রদার্শনিকরা সেই ধারণার শুধু বিশ্লেষণই নয় সেটাকে গ্রহণ বা বর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তি-তর্কের অবতারণা করে থাকেন। র‌্যাফেলের মতে, সেক্ষেত্রে দার্শনিক শুধু অপরের সমালোচনা করবেন তা নয়, তিনি আত্মসমালোচনার পথেও অগ্রসর হবেন।
রাজনৈতিক তত্ত্বের ন্যায় রাষ্ট্রদর্শনও রীতিবদ্ধ ও আধুনিক- এই দুটি ভাগে বিভক্ত। সনাতন বা রীতিবদ্ধ রাষ্ট্রদর্শন সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি আদর্শ রীতি বা মান সামনে রেখে অগ্রসর হয় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে পর্যালোচনা করে। এক্ষেত্রে যুক্তিতর্ক নয় বরং উচিত-অনুচিতের প্রশ্নটিই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যখন নীতি-নৈতিকতা, উচিত-অনুচিত এগুলোকে বাদ দিয়ে বাস্তব ও যুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করা হয় তখন তাকে বলা হয় আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন। কোঁতের সমাজ বিকাশের বৈজ্ঞানিক সূত্র, হবসের বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ, মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, স্পেনসারের সমাজতাত্ত্বিক ও জীববিজ্ঞানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনকে সমৃদ্ধ করেছে।

রাষ্ট্রদর্শন ও রাষ্ট্রতত্ত্বের মধ্যে পার্থক্য
অতীতে রাষ্ট্রদর্শন ও রাষ্ট্রতত্ত্বের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হতো না। তখন রাষ্ট্রদর্শন ও রাষ্ট্রতত্ত্ব ছিল সমার্থক। মূলত ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই রাষ্ট্রদর্শন ও রাষ্ট্রতত্ত্বের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হতে থাকে। কোঁতে, স্পেনসার, মার্কস প্রমুখ দার্শনিক চিন্তাভাবনাকে বৈজ্ঞানিক চিন্তায় রূপান্তরে সচেষ্ট হন। বিংশ শতাব্দীতে এসে জেমস ব্রাইস এবং পরবর্তীকালে মার্কিন আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দার্শনিক ভাবনাকে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, পদ্ধতি ও প্রকরণে সমৃদ্ধ করে তোলেন। ফলে রাষ্ট্রদর্শন ও রাষ্ট্রতত্ত্বের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী র‌্যাফেল নিম্নোক্তভাবে এই পার্থক্য উল্লেখ করেন।
১. উদ্দেশ্যগত পার্থক্য : রাষ্ট্রদর্শনের লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রে একটি সর্বজনীন ও তত্ত্ব সাধারণ গড়ে তোলা। অপরদিকে রাষ্ট্রতত্ত্বের কাজ হলো কোনোকিছুর অনুসন্ধান করা। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাবাদী গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কথা বলা যায়। তাঁরা রাজনৈতিক কোনো বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিচার-বিশ্লেষণ ইত্যাদির মাধ্যমে তত্ত্ব গড়ে তুলতে চান।
২. বিষয়বস্তুগত পার্থক্য : রাষ্ট্রদর্শনে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্য পূরণের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। যেমন দার্শনিক প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়নের জন্য একজন দার্শনিক রাজার কথা বলেছেন কিন্তু রাষ্ট্রতত্ত্বে রাজনৈতিক বিষয়াদি বিচার বিশ্লেষণের জন্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ এবং সমকালীন ঘটনাসমূহ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়।
৩. বৈধতা বিচার বিষয়ক পার্থক্য : রাজনৈতিক তত্ত্বের বৈধতা বিচার করা যায় কিন্তু রাজনৈতিক দর্শনের বৈধতা বিচার করা যায় না। কারণ দর্শন বৈধতা বিচারের ঊর্ধ্বে।১৫
রাষ্ট্রদর্শন ও রাষ্ট্রতত্ত্বের মধ্যে এই পার্থক্যগুলো অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীই মানতে রাজি নন। তাদের মতে দর্শন বলতে শুধু কল্পনা, আবেগ, অনুমানকে বুঝায় না। দার্শনিক হলেন মানবতার প্রচারক, সত্যের উপাসক, সংস্কারের প্রবক্তা। রাষ্ট্রদর্শন মানবিক, সমাজমুখী, সংস্কারমুখী চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে। বস্তুনিষ্ঠ ও প্রগতিশীল চিন্তার সে বিরোধী নয়। লিও স্ট্রস (Leo-Strauss), মাইকেল ওকশট (M. Oakeshott) প্রমুখ আধুনিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিক মনে করেন নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ ইত্যাদির আবেদন আজও রয়েছে। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রতত্ত্ব থেকে যদি দর্শন পরিত্যাজ্য হয় তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান তার গুরুত্ব হারাবে। ডেভিড ইস্টনও স্বীকার করেন যে, রাষ্ট্রতত্ত্বেও মূল্যবোধের প্রভাব রয়েছে। তিনি বলেন, “Every Theory is consciously oriented to values…”
সবমিলিয়ে বলা যায়, রাজনৈতিক দর্শন ও রাজনৈতিক তত্ত্ব একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। একে অপরের পরিপূরক। রাজনৈতিক দর্শনকে উপেক্ষা করে যেমন কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি কোনো দার্শনিক- অঙ্গীকার ব্যতীত কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব ব্যাপক স্বীকৃতি পায় না। বস্তুত রাজনৈতিক তত্ত্ব ও রাজনৈতিক দর্শন হলো রাষ্ট্রচিন্তারই অংশ।

শেখ হাসিনার ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ তত্ত্ব
সাম্প্রতিক বিশ্বের অন্যতম রাষ্ট্রচিন্তক শেখ হাসিনার জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বটি নিয়ে এবার আলোচনায় যাবার পূর্বে পাঠকের সুবিধার্থে ‘ক্ষমতায়ন’ শব্দটি নিয়ে একটু আলোচনা করা দরকার।
‘ক্ষমতা’ (Power) থেকেই ‘ক্ষমতায়ন’ (empowerment) শব্দটি এসেছে। ‘ক্ষমতা’ শব্দটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিক্রমায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান আলোচ্য একটি বিষয়। আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটে তার সবকিছুই মূলত ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। অধ্যাপক ম্যাকাইভার তাই বলেন, “…everything that is happening around us is in some way or the other concerned with power.”১৬ বস্তুত ক্ষমতার উৎপত্তি সমাজ বিবর্তনের মধ্য দিয়েই এবং সমাজের মধ্যেই তা বিকশিত হয়।
সাধারণ অর্থে ক্ষমতা বলতে সমাজে বসবাসকারী মানুষের সম্পর্ক ও আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিকে বোঝায়। অবশ্য বিভিন্ন দার্শনিক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বিভিন্নভাবে ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, “…Power as ‘the capacity to influence the actions of others.”১৭
এডওয়ার্ড শীলস বলেন, “Power is the ability to influence the behaviour of others in accordance with one’s own ends.”১৮
সমাজবিজ্ঞানী আলফ্রেড-ডি-গ্রাজিয়া বলেন, “Power is the ability to make decisions influencing the behaviour of men.”১৯
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী R.C. Agarwal বলেন, “The power is the capacity of an individual, to modifythe conduct of other individuals or group in the manner which he desires.”২০
সবমিলিয়ে মানুষের বস্তুগত, মানবিক, আর্থিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের যে দক্ষতা তাকেই বলা হয় ক্ষমতা।
ক্ষমতায়ন (empowerment) : আর ক্ষমতায়ন বলতে সাধারণত ব্যক্তির (নারী ও পুরুষ) জীবনের সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, অধিকার এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণকে বোঝায়। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ জীবনমান অর্জনই হলো ক্ষমতায়ন। ক্ষমতায়নের মাধ্যমে ব্যক্তি তার একক প্রচেষ্টায় স্বাধীনভাবে কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজ যোগ্যতায় জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
ক্ষমতায়নের দুটি প্রধান দিক রয়েছে যথা : বস্তুগত এবং বুদ্ধিগত। বস্তুগত ক্ষমতায়ন হচ্ছে ব্যক্তির নাগরিক প্রয়োজন পরিপূর্ণভাবে মেটানো যা স্বাধীন উপার্জন বা অর্থসংস্থানের মাধ্যমে হতে পারে। আর বুদ্ধিগত ক্ষমতায়ন হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে ব্যক্তির বুদ্ধিগত সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো।
মোটকথা, একজন মানুষ যাতে তার আবেগজনিত সমস্যাগুলোও কারো ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজে নিজেই সমাধান করতে পারে সেটাও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে।২১ অর্থাৎ নিজের জীবন নিজের মতো করে গড়া, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই তৈরি করা, নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিজের সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিজেই নেয়া সর্বোপরি নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা- এসবই হলো ক্ষমতায়ন।২২ ক্ষমতায়ন মানুষের আত্মবিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে যার মাধ্যমে সে অপরের মুখাপেক্ষী না হয়েই নিজের সমস্যার সমাধান করতে পারে।
প্রকৃত প্রস্তাবে ক্ষমতায়ন হলো এমন এক বিশেষ ক্ষমতা বা আত্মিক শক্তি যার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে প্রস্ফুটিত করতে পারেন নিজস্ব চিন্তাচেতনা আর কৃতকর্মের মাধ্যমে।
ক্ষমতায়ন হলো একটি প্রক্রিয়া যা কার্যকরের ক্ষেত্রে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ধাপগুলো হলো :
১. ব্যক্তিগত ধাপ : এ পর্যায়ে বিবেচিত হবে ব্যক্তির যোগ্যতা, আত্মবিশ্বাস ও সামর্থ্যরে ধারণা।
২. সম্পর্কগত ধাপ : এ পর্যায়ে দেখা হয় ব্যক্তির সম্পর্কযুক্ত ক্ষমতার সামর্থ্য অর্থাৎ ব্যক্তি কতটা মধ্যস্থতাকারী ও অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম।
৩. সামষ্টিক ধাপ : এ পর্যায়ে বিবেচিত হয় ব্যক্তি সামষ্টিক পর্যায়ে কাজ করতে কতটা দক্ষ।২৩
ক্ষমতায়নের উপরোক্ত ধারণার আলোকে এবার আমরা আলোচনা করব শেখ হাসিনার ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ তত্ত্ব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে উপমহাদেশের অত্যন্ত প্রাচীন দল আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং পরপর চারবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এখনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এমন এক পরিবার থেকে এসেছেন, দেশ ও মানবতার জন্য যাদের আত্মত্যাগ অপরিসীম। তাঁর পিতা যিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বছরের পর বছর জেল খেটেছেন এবং আমৃত্যু তিনি একটি শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন।
বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন এমন একটি আদর্শ রাষ্ট্রের যার ভাবাদর্শ হবে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, শান্তি-সমৃদ্ধি এবং জননিরাপত্তা’ যেখানে থাকবে না কোনো ক্ষুধা-দারিদ্র্য, অবিচার, বঞ্চনা, শোষণ-নিপীড়ন। আর এ স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য তিনি কাজও শুরু করেছিলেন কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী দেশী-বিদেশী শক্তি তাঁকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। ঘাতকরা ভেবেছিল ব্যক্তি-মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে তাঁর চিন্তা, তাঁর আদর্শকে বাংলার মাটি থেকে মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু তাদের সেই ভাবনাকে মিথ্যে প্রমাণিত করে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা বাংলার মানুষের মাঝে ফিরে আসেন। বাবার রাজনৈতিক আদর্শকে, রাজনৈতিক চিন্তাকে হৃদয়ে ধারণ করে বাংলার জনগণের সার্বিক কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করেন। বাবার লালিত স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য শুরু করেন এক কঠিন সংগ্রাম, যে সংগ্রামের পরতে পরতে ফুটে উঠেছে জেল, জুলুম, হুলিয়া, নির্যাতন, প্রাণনাশের ঘটনা। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছেন বহুবার। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, চট্টগ্রামের লালদিঘির গণহত্যার মতো ঘটনা যা আমরা পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করেছি। তারপরও তিনি থেমে যাননি। আওয়ামী লীগের বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বাবার মতো দেশের আপামর জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার এবং একটি উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন।
শেখ হাসিনা বাবার মতোই বিশ্বাস করেন জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধনই তার প্রধান দায়িত্ব। জনগণের উন্নত জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষে তাই রাষ্ট্রকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, “যে জনগণ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, সেই জনগণের কল্যাণ করা। তাদের বংশপরম্পরায় সকলেই যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, উন্নত জীবন পেতে পারে- সেটাই নিশ্চিত করা।… এই দেশটাকে ঠিক যেভাবে জাতির পিতা চেয়েছিলেন, সেভাবে গড়ে তোলা। এই একটা দায়িত্বই আমি বুঝি যে, এদেশকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে।”২৪ আর এজন্য তিনি তাঁর সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ও উদ্যোগকে একটি কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। আর সেটা হলো দেশ ও জাতির উন্নয়ন। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষে তিনি গ্রহণ করেন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বহু মেগা ও ছোট-বড় পরিকল্পনা ও কর্মসূচি। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন সেক্টরে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। এতে করে বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রশংসিত হয়। এছাড়া বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, পার্বত্য সমস্যা, বিশ্ব জলবায়ু সমস্যা, খাদ্য সমস্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সমস্যা ইত্যাদি ইস্যুতে তাঁর গৃহীত পরিকল্পনা, নীতি সাম্প্রতিক বিশ্বে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়।২৫ তিনি বিশ্বের কাছে আখ্যায়িত হন ‘মানবতার নেত্রী’ হিসেবে। আর তাঁর বহুল আলোচিত জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বটি হলো সেই বহুমাত্রিক কর্মপ্রচেষ্টারই ফলশ্রুতি।

জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্ব
শেখ হাসিনা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেন যে, আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো হবে জলবায়ু পরিবর্তন, বেকারত্ব, আর্থিক সংকট, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য, পানির অভাব এবং এগুলো থেকে সৃষ্ট হাজারো সমস্যা। তাই তিনি বিশ্বাস করেন এই চ্যালেঞ্জগুলো মানুষ তখনই অতিক্রম করতে সক্ষম হবে যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাবে। আর একেই তিনি বলছেন “জনগণের ক্ষমতায়ন এবং শান্তিকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল” (Peoples Empowerment a Peace-Centric Development Model)। শেখ হাসিনা মনে করেন, জনগণের ক্ষমতায়ন সম্ভব হলে মানুষ সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি, সক্ষমতা এবং কার্যকারিতার সাথে কাজ করতে পারবে। ফলে সবাই সমানভাবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারবে।২৬
শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বের মূল বিষয় হলো সব মানুষকে সমান চোখে দেখা এবং মানবিক সামর্থ্য উন্নয়নের কাজে লাগানো। একমাত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, আমার দৃঢ়বিশ্বাস, শান্তির পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ৭০০ কোটি মানুষের এই বিশ্বকে আমরা পাল্টে দিতে পারব। এমন একটি বিশ্ব গড়তে সক্ষম হব, যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। তিনি শান্তিকে উন্নয়নের সোপান উল্লেখ করে বলেন যে, শান্তি তখনই বিরাজ করে যখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। এ লক্ষে শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্বদেশে এবং বিদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।২৭

শেখ হাসিনা জনগণকে ক্ষমতায়িত করার জন্য আন্তঃসংযুক্ত ৬টি উপাদান বা চলকের কথা বলেন। সেগুলো হলো :২৮
১. ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্তি : মানুষের ক্ষমতায়ন হবে চরম ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্তি হলে;
২. কর্মসংস্থান সৃষ্টি : প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মানুষ যখন নিজেরাই কর্মসংস্থান বা উপযুক্ত চাকরির ব্যবস্থা করবে তখন ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে;
৩. বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসান : বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসান হলে জনগণের ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে;
৪. সন্ত্রাস নির্মূল : সন্ত্রাস নির্মূল করে একটি নিরাপদ জীবন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে;
৫. ঝরেপড়া মানুষদের সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি : এতদিন যারা উন্নয়ন ও মূল জীবনধারার বাইরে ছিল তাদের অন্তর্ভুক্ত করলে জনগণের ক্ষমতায়ন হবে এবং
৬. ভোটাধিকার নিশ্চিত ও শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ : জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে ক্ষমতায়ন সম্ভব।

বিশেষজ্ঞ মহলের প্রতিক্রিয়া
শেখ হাসিনার জনগণের ক্ষমতায়ন তথা শান্তি তত্ত্বটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপনের আগেই সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনার এই রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে সেমিনার, আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনার রাষ্ট্রচিন্তা ও দর্শন নিয়ে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে। এরপর সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটি, জাপানের ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটি জনগণের ক্ষমতায়ন মডেল নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানগণও জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেন। যেমন- ২৯
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মহাপরিচালক ড. মার্গারেট চেন বলেন, শেখ হাসিনার শান্তি তত্ত্বের ৬টি বড় উপাদানের মধ্যে মানুষের সুস্বাস্থ্য বিষয়টি স্পষ্ট। এ শান্তি তত্ত্বের সর্বজনীনতা আছে কারণ এ তত্ত্ব মানুষকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিস্থাপনপূর্বক মানুষের ক্ষমতায়নের কথা বলে।
আইএলও (ILO) মহাপরিচালক ড. জুয়ান সোমাভিয়া বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে ‘প্রবৃদ্ধি’ তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন তবে সেক্ষেত্রে নিশ্চিত হতে হবে সামাজিক ন্যায্যতা এবং বণ্টন ন্যায্যতা। আর এখানেই শেখ হাসিনার শান্তি-উন্নয়ন তত্ত্বের জোর। তাঁর তত্ত্বে অসমতা (unequality) দূর করে যে নতুন ভারসাম্যের (balance) কথা বলা হয়েছে তা অত্যন্ত শক্তিশালী।
ই ইউ পার্লামেন্ট (EU Parliament) সদস্য জে্যাঁ ল্যামবার্ট (Jean Lambert) বলেন, “শেখ হাসিনা একজন শান্তিকামী নেতা। এটা যেমন তাঁর শান্তি তত্ত্বে দেখা যাচ্ছে তেমনি তা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়নচিত্রে যেমন- একটি সুসংহত ও দায়িত্বশীল সরকার গঠনের কাজে, নারীর ক্ষমতায়নে, মেয়েদের শিক্ষার উন্নয়নে। এসবই শেখ হাসিনার শান্তি-উন্নয়ন তত্ত্বের অন্তর্নিহিত শক্তির লক্ষণ।”
বিশ্ব শিশু সংস্থা (Unicef)-এর ডেপুটি প্রধান নির্বাহী ড. হিলদে জনসন বলেন, যদিও এ সংস্থায় আমরা সরাসরি অশান্তি দূর অথবা শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে কাজ করি না কিন্তু আমাদের কাজটি preventive কাজের মধ্যেই পড়ে। আমরা বর্তমানে ‘অ্যাপ্রোচ’ নিয়ে কাজ শুরু করেছি যার নাম ‘ইক্যুইটি অ্যাপ্রোচ’ এবং এই অ্যাপ্রোচটি শেখ হাসিনার শান্তি তত্ত্বের মধ্যেই আছে। যেমন দারিদ্র্য ও বঞ্চনা হলো অশান্তির উৎস আর যে কারণে শেখ হাসিনার শান্তি তত্ত্বের প্রথম উপাদানেই বলা হচ্ছে ‘দারিদ্র্য ও ক্ষুধা উচ্ছেদ করা’। তাই শেখ হাসিনার এই তত্ত্বটি জাতিসংঘ সদর দফতরে উত্থাপনে সচেষ্ট হওয়া।
এফএও (FAO)-এর মহাপরিচালকও এই তত্ত্বের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “…আমি শেখ হাসিনার শান্তি তত্ত্বের দার্শনিক ভিত্তিগুলো মোটামুটি অনুধাবন করি এবং বিশ্বাস করি যে, ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া শান্তি নিশ্চিত হবে না, ‘মানুষের ক্ষমতায়ন ছাড়া শান্তি নিশ্চিত হবে না,’ বিজ্ঞানকে মানবকল্যাণের কাজে না লাগাতে পারলে শান্তি নিশ্চিত হবে না।”
জাতিসংঘের (UN) ডেপুটি মহাসচিব ড. আশা-রোজ মিগিরো বলেন, শেখ হাসিনার শান্তি তত্ত্বটি জাতিসংঘের শান্তি-নিরাপত্তা-উন্নয়ন সম্পর্কিত কর্মকা-ের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। আমার মতে, এ মডেলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই যে- এ মডেলটি এমডিজিসহ (Millennium Development Goals) জাতিসংঘের অন্যান্য সকল সংশ্লিষ্ট কর্মকা- পরিচালনে দর্শনগত প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই এটি জাতিসংঘে Resolution আকারে উপস্থাপিত ও পাস হওয়া উচিত।

জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্ব জাতিসংঘে উত্থাপন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ মডেলটি যা ‘বিশ্বশান্তির মডেল’ হিসেবেও প্রচলিত ২০১১ সালের আগস্টে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাতিসংঘে প্রস্তাবনা আকারে জমা দেন। এরপর ২০১১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৬তম অধিবেশনে ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ মডেলটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। এই অধিবেশনে তিনি তাঁর বক্তৃতায় ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ তত্ত্ব/মডেলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।৩০ এরপর ২০১১ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সভায় ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ মডেলটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয় এবং ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এটি পাস হয়। এরপর ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৭তম অধিবেশনে ১৯৩টি দেশ সর্বসম্মতভাবে ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ বিশ্বশান্তির মডেল হিসেবে রেজ্যুলেশন আকারে A/RES/67/107, এজেন্ডা নং ২৯ গৃহীত হয়।৩১

জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বের প্রয়োগ
শেখ হাসিনার ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ তত্ত্বটি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই তত্ত্বটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তত্ত্বটি প্রয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। বিশেষ করে ২০১২ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শেখ হাসিনার এই ক্ষমতায়নের নীতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দ অনুমোদন করেন। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘে বাংলাদেশের তৎকালীন স্থায়ী প্রতিনিধি (বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ড. এ.কে. আব্দুল মোমেন বলেন,
শেখ হাসিনার ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ ধারণাটি জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনসহ সদস্য রাষ্ট্রসমূহের নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনুরণিত হয়েছে। ২০১২ সালে ব্রাজিলের ‘রিও+২০ বিশ্ব সম্মেলনে’ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ‘যেমন ভবিষ্যত চাই’ শীর্ষক দলিল গ্রহণ করেন, যার মধ্যে শেখ হাসিনা প্রণীত জনগণের ক্ষমতায়ন নীতিমালা এবং তার সঙ্গে জড়িত আদর্শ অনুসৃত হয়। উক্ত সম্মেলনে দারিদ্র দূরীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়, যার মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে সকলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা অর্জন।৩২
এছাড়া জাতিসংঘ ২০০০ সালে মানব উন্নয়ন সংক্রান্ত যে এমডিজি (Millennium Development Goals) বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং ২০১৬ সালে এসডিজি (Sustainable Development Goals) বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে সেখানেও জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়।

এমডিজি (Millennium Development Goals) :৩৩
দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, শিশুমৃত্যু, জটিল রোগব্যাধি হলো পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ দেশেরই প্রধান সমস্যা আর এসব সমস্যার সমাধান না হলে বিশ্বব্যাপী মানব উন্নয়ন সম্ভব নয়, সম্ভব নয় বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা। আর এই ব্যাপারটি অনুধাবন করে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের ১৮৯টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানগণ সম্মিলিতভাবে একটি অঙ্গীকার করেন। আর তা হলো ২০১৫ সালের মধ্যে তারা নিজ নিজ দেশে আটটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবেন। লক্ষ্যগুলো হলো :
১. চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলকরণ (Eradicate extreme poverty and hunger)
২. সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন (Achieve universal primary education)
৩. নারী-পুরুষ সমতা অর্জন এবং নারীর ক্ষমতায়নে উৎসাহ দান (Promote gender equality and empower women)
৪. শিশু মৃত্যুহার হ্রাসকরণ (Reduce child mortality)
৫. মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন (Improve maternal health)
৬. এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগব্যাধি দমন (Combat HIV/AIDS, Malaria and other diseases)
৭. পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ (Ensure environmental sustainability)
৮. সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা (Develop a global partnership for development)
জাতিসংঘের এই লক্ষ্যগুলোই হলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা Millenium Development Goals সংক্ষেপে MDGs.
২০০০ সালে জাতিসংঘ MDG ঘোষণা করে এবং এটি শেষ হয় ২০১৫ সালে।
এমডিজির উক্ত ৮টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার অনুসরণীয় সাফল্য দেখায়।
বস্তুতপক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন চিন্তা এবং জনগণের কল্যাণের লক্ষে তাঁর অবিচল প্রতিজ্ঞার কারণেই বাংলাদেশের এই অগ্রগতি সাধিত হয়। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কেবল নেতৃত্বের বিচক্ষণতা, দৃঢ়তা আর দিকনির্দেশনার কারণেই বাংলাদেশ আজ এই লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়। এজন্য বাংলাদেশকে বলা হয় এমডিজির ‘রোল মডেল’।

এসডিজি (SDGs-Sustainable DevelopmentGoal বা টেকসই উন্নয়ন) :৩৪
মানুষকে কেন্দ্রে রেখে পরিবেশ সংরক্ষণ করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নই হলো এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন। MDG-এর ন্যায় SDG হলো একগুচ্ছ লক্ষ্যমাত্রা। ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ MDG-এর মেয়াদোত্তীর্ণ হলে একই বছরের ২৫-২৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে UN Sustainable Development Summit-এ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানগণ আলোচনার মাধ্যমে এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। SDG-এর মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল নির্ধারণকরা হয় এবং এতে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা ও ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত হয়।
লক্ষ্যমাত্রাসমূহ হলো :
১. দারিদ্র্য বিমোচন : সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্য নির্মূল করা;
২. ক্ষুধামুক্তি : ক্ষুধামুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টির লক্ষ্য অর্জন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা চালু;
৩. সুস্বাস্থ্য : সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা;
৪. মানসম্মত শিক্ষা : অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা;
৫. লিঙ্গ সমতা : লিঙ্গ সমতা অর্জন এবং সকল নারী ও মেয়ের ক্ষমতায়ন করা;
৬. সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা : সবার জন্য পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সহজপ্রাপ্যতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা;
৭. নবায়নযোগ্য ও ব্যয়সাধ্য জ্বালানি : সবার জন্য ব্যয়সাধ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি সুবিধা নিশ্চিত করা;
৮. কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি : সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল ও উপযুক্ত কাজের সুবিধা নিশ্চিত করা;
৯. উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো : দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শিল্পায়ন করা এবং উদ্ভাবনে উৎসাহিত করা;
১০. বৈষম্য হ্রাস: দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈষম্য হ্রাস করা;
১১. টেকসই নগর ও সম্প্রদায় : নগর ও মানব বসতিগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করে তোলা;
১২. সম্পদের ব্যবহার : টেকসই ভোগ ও উৎপাদন রীতি নিশ্চিত করা;
১৩. জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ : জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
১৪. টেকসই মহাসাগর : টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার করা;
১৫. ভূমির টেকসই ব্যবহার : পৃথিবীর ইকো সিস্টেমের সুরক্ষা ও টেকসই ব্যবহার, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ করা;
১৬. শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান : শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরি, সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ প্রদান এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা;
১৭. অংশীদারিত্ব : টেকসই উন্নয়নের জন্য এসব বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণ ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতা আনয়ন।
এসডিজির ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা কম নয়। এসডিজি-র উপরোক্ত লক্ষ্যমাত্রাগুলো (যেমনÑ দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, জনগণের অংশগ্রহণ, আইনের শাসন, সুশাসন ইত্যাদি) শেখ হাসিনা প্রণীত জনগণের ক্ষমতায়ন নীতিমালার আলোকেই নির্ধারিত হয়।৩৫

জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বের প্রতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া
শেখ হাসিনা জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষে অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন, চিকিৎসা, সন্ত্রাস নির্মূল প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন তাতে করে বিশ্বনেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন তাই যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশ হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেল’ এবং ‘নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল নক্ষত্র’। আর আমেরিকার প্রভাবশালী ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ভাষায়, বাংলাদেশ হচ্ছে ‘দক্ষিণ এশিয়ার আলোকবর্তিকা’। সাথে সাথে বিশ্বখ্যাত নিউইয়র্ক টাইমস মনে করে, যদি উগ্র সন্ত্রাসবাদ কোথাও মাথাচাড়া দেয় তাহলে সেটা দেবে পাকিস্তানে, কখনো বাংলাদেশে নয়। কারণ এখানে সম্পন্ন হয়েছে নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও নারীর ক্ষমতায়ন।
শেখ হাসিনা তাঁর আলোচিত জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বের জন্য শুধু বিশ্বনেতাদের প্রশংসাই কুড়াননি ভূষিত হয়েছেন একাধিক পদকে। ২০১০ সালে এমডিজি-র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তিনি লাভ করেন ‘এমডিজি-৪’ পুরস্কার। ২০১৩ সালে দেশজুড়ে ১৩ হাজার ৮০০ কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়া এবং ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির সংযোগের আওতায় নিয়ে আসার স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেন ‘সাউথ সাউথ পুরস্কার’। ২০১৪ সালে দক্ষিণের দেশগুলোতে নেতৃত্বের দূরদর্শিতাস্বরূপ লাভ করেন ‘সাউথ সাউথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’। এছাড়া ২০১৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সাফল্যের জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ এবং টেলিযোগাযোগ খাতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘আইটিইউ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।৩৬

উপসংহার
পরিশেষে একথা বলা যায় যে, ২০০০ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো যখন এমডিজি বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে সেসময় সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আবার ২০১৫ সালে যখন জাতিসংঘ এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে তখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বসভায় (UNO) উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তিনি ২০০০ সালের এমডিজি সম্মেলনে বিশ্বনেতৃবৃন্দের সামনে ঘোষণা দেন যে, তাঁর দেশ এমডিজি-র লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে সক্ষম হবে। তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়। আবার এসডিজি গ্রহণের সময় শেখ হাসিনা বিশ্বনেতৃবৃন্দের সামনে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাঁর দেশ এমডিজি-র ন্যায় এসডিজি-র লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করবে। উক্ত সভায় আরো ঘোষণা দেন যে, ২০২১ সালের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ একটি উন্নত দেশে পরিণত করবেন। রাষ্ট্রচিন্তক শেখ হাসিনা তাঁর জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্বের মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

তথ্যনির্দেশ
১. R.C. Agarwal, Political Theory (Principles of Political Science) (New Delhi : S. Chad and Company Ltd., 1996), PP. 64-65
২. বিস্তারিত দেখুন, J.C. Johari, Contemporary Political Theory, (New Delhi : Sterling Publisher Private Limited, 1979), PP. 17-18
৩. প্রাণ গোবিন্দ দাশ, রাষ্ট্রচিন্তার ইতিবৃত্ত (কলকাতা : সেন্ট্রাল : ১৯৮৬), পৃ. ১
৪. ঐ
৫. মুহাম্মদ আয়েশ উদ্দীন, রাষ্ট্রচিন্তা পরিচিতি (ঢাকা : আইডিয়াল লাইব্রেরি, ১৯৭৬), পৃ. ১৮
৬. বিস্তারিত, মুহাম্মদ আয়েশ উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯
৭. কল্যাণ কুমার সরকার, ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস (কলকাতা : শ্রীভূমি পাবলিশিং কোম্পানি, ২০০১), পৃ. ৮
৮. ঐ, পৃ. ৬
৯. ঐ, পৃ. ১৪২
১০. J.C. Johari, Ibid, P. 3
১১. N. Jayapalan, Comprehensive Modern Political Analysis (New Delhi : Atlantic Publishers and Distributors), PP. 61-62
১২. F. W. Coker, Recent Political Thought (New York : Appleton-Century-crofts, 1934), P. 3
১৩. দেবাশিষ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রতত্ত্ব ও প্রতিষ্ঠান (কলকাতা : সেন্ট্রাল, ১৯৯৬), পৃ. ১০৩
১৪. বিস্তারিত দেখুন, Richard G. Stevens, Political Philosophy An International (New York : Cambridge University Press, 2011) P. 52; দেবাশিষ চক্রবর্তী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৬

১৫. ড. অনাদি কুমার মহাপাত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৫
১৬. R.C. Agarwal, Ibid, P. 433
১৭. Bertrand Russell, Power : A New Social Analysis (London : George Allen and Union, 1937)
১৮. Ibid
১৯. ড. এ কে মহাপাত্র, বিষয় সমাজতত্ত্ব (কলকাতা : ইন্ডিয়ান বুক কনসার্ন, ১৯৯৪), পৃ. ৭৯৯
২০. R. C. Agarwal, Ibid, P. 434
২১. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, “নারীর ক্ষমতায়ন”, Bangla Insider, ৮ মার্চ ২০১৮
২২. মোঃ সাখাওয়াত হোসেন, “নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা”, দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৩ মে ২০১৮
২৩. সেলিনা হোসেন, “জেন্ডার, ক্ষমতায়ন ও বাংলাদেশ”, www.bangladesherkhabor.net; মোঃ সাখাওয়াত হোসেন, প্রাগুক্ত।
২৪. মোঃ নজরুল ইসলাম (সম্পা), নির্বাচিত ভাষণ (২০১৪-২০১৭), শেখ হাসিনা, (ঢাকা : জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ২০১৮),পৃ. ৩৬৬
২৫. বিস্তারিত দেখুন, Dipanjan Roy Chaudhury, “Sheikh Hasina’s leadeship skills : Unique combination of exemplary courage and vision”, Economic Times, 30 January, 2019.
২৬. ড. এ.কে. আব্দুল মোমেন, ‘শেখ হাসিনার বৈশ্বিক নেতৃত্ব বিশ্বশান্তি ও উন্নয়ন প্রসঙ্গ” দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬
২৭. প্রথম আলো, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১
২৮. ড. এ.কে.এম. আব্দুল মোমেন, প্রাগুক্ত
২৯. সংগ্রাম ঐতিহ্য ও গৌরবময় ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী শীর্ষক পত্রিকা, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ২০১৩, পৃ. ১৭-২৬
৩০. পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য
৩১. The Daily Star, 19 December, 2012; বিস্তারিত দেখুন, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, সংগ্রাম ঐতিহ্য ও গৌরবময় ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পুনর্মিলনী ২০১৩ শীর্ষক ম্যাগাজিন, পৃ. ২৭
৩২. ড. এ.কে. আব্দুল মোমেন, প্রাগুক্ত, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
৩৩. হারুন অর রশীদ, “এমডিজি থেকে এসডিজি : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ” https://m.dw.com, ১৪ মার্চ ২০১৬
৩৪. বিস্তারিত দেখুন,কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে অংশীদারিত্ব জরুরি”, দৈনিক সমকাল, ১৪ নভেম্বর ২০১৫; দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫
৩৫. ড. এ.কে. আব্দুল মোমেন, প্রাগুক্ত।
৩৬. বিস্তারিত দেখুন, Sheikh Hasina on the International Stage, CRI, Dhaka, PP. 11-13.

ড. অজিত দাস : চেয়ারম্যান, বঙ্গবন্ধু তরুণ লেখক পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি; সহসভাপতি, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি; সরকারি কলেজের সিনিয়র লেকচারার