রাজধানীতে ভবনে বিস্ফোরণ মৃত্যু ৩ জনের, আহত ৩০

18

ঢাকার মিরপুর রোডের সায়েন্সল্যাব এলাকায় সুকন্যা টাওয়ারের কাছে বিকট বিস্ফোরণে তিনতলা একটি ভবনের আংশিক ধসে পড়েছে। এ ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে তিনজনের; আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।
রবিবার সকাল ১০টা ৫২ মিনিটের দিকে ভবনটির তৃতীয় তলায় বিস্ফোরণ ঘটে বলে ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা জীবন মিয়া জানান। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটিতে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের পলাশী, ধানমন্ডি টহল এবং সিদ্দিকবাজার স্টেশনের চার ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা শাহজাহান মোল্লা জানান, ভবনটির নাম শিরিন ভবন। পাশেই সুকন্যা টাওয়ার এবং ভবন মালিক সমিতির ফটক। বিস্ফোরণে তিনতলা ওই ভবনের একপাশের দেয়াল ধসে পড়ে। আহত ৩০ থেকে ৪০ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে নেয়া হয় কাছের পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। সেখানে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে জানান হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক মোসাদ্দেক হোসেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ জানান, নিহত তিনজন ওই ভবনের তৃতীয় তলায় লায়রা প্রোডাক্টসে কাজ করতেন। তারা হলেনÑ শরীয়তপুরের শফিকুজ্জামান (৪৫), ঢাকার লালবাগের আবদুল মান্নান (৬৫) এবং নরসিংদীর তুষার (৩৫)। শফিকুজ্জামান ও তুষার সেখানে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। আবদুল মান্নান ছিলেন পিয়ন। লায়রার এরিয়া ম্যানেজার শাহিনুর রহমানের সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, মৃত ব্যক্তিদের আত্মীয় স্বজনকে অবহিত করা হয়েছে তারা আসছেন।
এদিকে এ ঘটনায় সড়ক বন্ধ থাকায় ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। রবিবার বেলা ১১টার দিকে ওই ঘটনার পর গাবতলী থেকে নিউমার্কেটগামী মিরপুর সড়কে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে বলে জানান তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার সাহেদ আল মাসুদ।
বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ৪০০ মিটার দূরের ভবনও : ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নিচতলায় কাপড়ের দোকানপাট, দ্বিতীয় তলায় সেলুন ও লন্ড্রির দোকান এবং তৃতীয় তলায় ফিনিক্স ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের অফিস। বিস্ফোরণের পর তৃতীয় তলার ওই অফিসের চেয়ার, দরজার শাটার ও আসবাবপত্রের কিছু সড়কে ছিটকে পড়ে।
ঘটনাস্থলে থাকা শামসুল আলম খোকন নামে এক প্রকৌশলী বলেন, বিস্ফোরণের শব্দ এত বিকট ছিল যে ঘটনাস্থল থেকে ৪০০ মিটার দূরে সায়েন্স ল্যাবে তার অফিসের দরজার গ্লাস ভেঙে গেছে। আমি মনে করেছিলাম, আমার অফিসেই কোথাও বিস্ফোরণ হয়েছে।
বিস্ফোরণের সময় ওই ভবনের নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন একটি বেল্টের দোকানের কর্মচারী কামাল হোসেন। তাকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কামালের ছোটভাই আমির হোসেন সাংবাদিবদের বলেন, বিস্ফোরণের সময় তার ভাইয়ের মাথার ওপর ইট-জাতীয় ভারী কিছু পড়ে। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়।
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম বলেন, বিস্ফোরণের সময় তাদের হাসপাতাল ভবনটিও কেঁপে ওঠে। এরপর শুরু হয় আহত মানুষের ¯্রােত। ৪০ থেকে ৫০ জন তাদের জরুরি বিভাগে ভিড় করেন। তাদের কয়েকজনের পোড়া জখম ছিল। কারো শরীর থেঁতলে গেছে, কারো মাথা কেটে গেছে। তিনি বলেন, ‘ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা হতবিহবল হয়ে পড়ি। চিৎকার, কান্না হৈচৈ চেঁচামেচিতে ভরে যায় জরুরি বিভাগ। চিকিৎসক ও নার্সরা যথাসাধ্য রোগীদের চিকিৎসা দেন। হাসপাতালে আসার আগেই দুজনের মৃত্যু হয়েছে। জরুরি বিভাগে আসার পর মারা গেছেন একজন।
রেজাউল করিম জানান, চিকিৎসা শেষে সেখানে দুজন ভর্তি আছেন। বাকিদের অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন কেউ কেউ।
ঘটনাস্থলে পুলিশের নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত কমিশনার শাহেন শাহ বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভবনের তৃতীয় তলায় এসিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। পুলিশের বম্ব ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থলে কাজ করছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, বিস্ফোরণের পর ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর পূর্ব পাশে একটি আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটা এসির বিস্ফোরণ বলে মনে হলেও সম্ভাব্য অন্য বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হাসপাতলে যারা : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া জানান, ঢাকা মেডিকেল এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে ১৪ জনকে। তাদের মধ্যে একজনকে আইসিইউতে নেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিউটে ভর্তি আছেন নুর নবী (২৩), আকবর আলী (৫২), আশরাফুজামান (৩৬), আশা (২৫), হাবিবুর রহমান (৩২), জহুর আলী (৫২)।
ইনস্টিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, “আমাদের এখানে ভর্তি ৬ জনের মধ্যে কয়েক জনের ইনহেশন বার্ন রয়েছে, এছাড়া কয়েকজন ২০ থেকে ৪০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।”
ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি আছেন জাকির হোসেন জুয়েল (৩৫), মেহেদী হাসান (২৫), তাজ উদ্দিন (৩০), কবির হোসেন (৩০), রাবেয়া খাতুন (২৫), নুর নবী (২৪), অজ্ঞাত (৪০), কামাল হোসেন (৪০)। তাদের বেশিরভাগই পথচারী কিংবা দোকান কর্মচারী।
ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. আলাউদ্দিন বলেন, “এই আটজনের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিদের অধিকাংশই নিউরো সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন। এদের হেড ইনজুরিসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ইনজুরি রয়েছে।”