রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি ও জাদুঘর

83

3রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তাজহাট নামক স্থানে অবস্থিত ‘তাজহাট জমিদারবাড়ি’। বৃহত্তর রংপুরে যতগুলো প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে, তার মধ্যে তাজহাট জমিদারবাড়ি অন্যতম। অনেকের কাছে সেটি তাজহাট রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিত। শতবর্ষের পুরনো এ রাজবাড়ির দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য শৈলী যে কাউকে মোহিত করে। জমিদারবাড়ি দর্শনে দেশী-বিদেশী অনেক পর্যটক ছুটে আসেন। কালের আবর্তে আমাদের দেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হারিয়ে গেছে, যে কয়েকটা অবশিষ্ট আছে তাজহাট জমিদারবাড়ি তার অন্যতম। এরশাদ সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপিত হয়েছিল, তখন এই জমিদারবাড়িটি রংপুর হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখন এটা জাদুঘর। তাজহাট জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা মান্নালাল রায় ছিলেন একজন রতœ ব্যবসায়ী। তিনি ১৭০৭ সালে বিহারের পাটনা থেকে মাহিগঞ্জে আসেন। সে সময় মাহিগঞ্জ ছিল একটি ব্যবসাসমৃদ্ধ এলাকা। মান্নালাল রংপুরের মাহিগঞ্জে এসেছিলেন হীরা, জহরত ও স্বর্ণ ব্যবসার জন্য। প্রথমে তিনি নানা ধরনের নামি-দামি হীরা, মানিক ও জহরত খচিত তাজ বা পাগড়ির ব্যবসা করতেন। এখানে তার লোকজন রাজমুকুট অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের মাথার তাজ তৈরি করে ভারতের বিভিন্ন রাজা-বাদশা ও ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করতেন। সে সময় তাজ বিক্রির জন্য এখানে হাট বসতো যা পরবর্তীকালে প্রসিদ্ধি লাভ করে। মান্নালাল এক সময় প্রচুর অর্থের মালিক হন। তাজের ব্যবসা করে এলাকাটি প্রসিদ্ধ হয়েছিল বলে এক সময় ওই এলাকার নামকরণ হয় তাজহাট। মান্নালাল বসবাস করার জন্য তাজহাটে একটি ভবন নির্মাণ করেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এ ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে তিনি আহত হয়ে পরবর্তীকালে মারা যান। এরপর তার দত্তক ছেলে গোপাল লাল রায় বাহাদুর (১৮৮৭-১৯৫৫) জমিদারির দায়িত্ব পান। মহারাজা গোপাল লাল ছিলেন শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী শাসক। তিনি প্রজাদের ভালো-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণ করে সব সময় তাদের পাশে থাকতেন। তার জমিদারিতে কোনো প্রজাই অসন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি ব্রিটিশদের অনুগত জমিদার থাকলেও প্রজাদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল। প্রজাদের অনুরোধে রাজা গোপাল লাল রায় একটি স্থাপনা তৈরি করতে সম্মত হন। সেই জমিদারবাড়িটিই বর্তমানে তাজহাট জমিদারবাড়ি হিসেবে সুপরিচিত। বাড়িটি নির্মাণ করতে ওই সময়ে ব্যয় হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা। এ জন্য দক্ষ নকশাকার ছাড়াও সবমিলিয়ে কাজ করেন প্রায় দুই হাজার রাজমিস্ত্রি। তাজহাট জমিদারবাড়ির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯১৭ সালে। এ বংশের জমিদাররা রংপুরের শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তখনকার সেই অবকাঠামোটি এখনও পর্যন্ত সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সে সঙ্গে রংপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে করেছে সমৃদ্ধ। ১৯৫২ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর জমিদারবাড়ির ৫৫ একর জমিসহ মূল ভবনটি চলে যায় কৃষি বিভাগের অধীনে। জমিদারবাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই পিচঢালা রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ। সবুজে ঘেরা সুন্দর মনোরম পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের খুব সহজেই কাছে টানে। কিছুদূর যেতেই এ বাড়ির মূল ভবন। ভবনের সামনে বাহারি গাছ-গাছালি ঘেরা ৪টি পুকুরের দৃশ্য খুবই মনোরম।
জাদুঘরে যা রয়েছে : প্রাসাদ প্রাঙ্গণের সামনে রয়েছে মার্বেল পাথরে নির্মিত সুদৃশ্য পানির ফোয়ারা। নিচতলা থেকে সরাসরি দ্বিতীয় তলায় ওঠার জন্য রয়েছ প্রসারিত সিঁড়ি। সিঁড়ির রেলিং সজ্জিত করা হয়েছে অলংকৃত বাতি দানি দিয়ে যা সুন্দর মসৃণ সাদা ও ছাই রংয়ের পাথর দ্বারা মোড়ানো। পূর্বমুখী এ দ্বিতল ভবনের সামনে ৭৬২০ মিটার দীর্ঘ। ইটালি থেকে আমদানি করা শ্বেতপাথরে তৈরি চওড়া একটি সিঁড়ি ওপর তলার বারান্দা পর্যন্ত উঠে গেছে। ছাদের মাঝখানে অর্ধ গোলাকার একটি গম্বুজ রয়েছে। এ ভবনে কক্ষের সংখ্যা ২৮টি। নিচতলায় ৪টি বড় কক্ষ এবং ১১ জোড়া কপাটবিশিষ্ট দরজা রয়েছে। প্রধান কক্ষটির আয়তন ১৪৫/১২৩ ফুট। প্রাসাদের উত্তর ও দক্ষিণ কোণে ২টি গোলাকার পিলার রয়েছে। এ বাড়ির দোতলায় ওঠার বিশাল শ্বেতপাথরের সিঁড়িসহ ৪টি সিঁড়ি রয়েছে।দোতলায় ৬টি কক্ষে সজ্জিত রয়েছে ৫ শতাধিক প্রাচীন কীর্তির নিদর্শন। এর মধ্য উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- আকাশ থেকে পড়া উল্কা পি-, যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের শঙ্খ, একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর অলংকৃত পাথর খ-, কালো পাথরের নবগ্রহ প্যানেল, একাদশ শতাব্দীর হর-গৌরী, শিব-পার্বতীর মূর্তি। কালোপাথরের লক্ষ¥ী নারায়ণ, ত্রাণকর্তা বিষ্ণু ইত্যাদি। এ ছাড়াও জাদুঘরে রয়েছে ১৩৩১ সালের ৯ অগ্রাহয়ণে প্রকাশিত রঙ্গপুর দর্পণ (সম্পাদক শ্রী চন্দ্র কমল লাহেড়ী সম্পাদিত) পত্রিকা। শ্রী রামচন্দ্রের মহাভারত পর্ব, ১৯শ’ শতকের বরাহ পুরাণ, কালিকা পুরাণ, আদ্য শ্রাদ্ধ পুঁথি। কালো মৃৎ পাত্রের টুকরো। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী হতে ১৬শ’ শতাব্দী পর্যন্ত মাটির বিভিন্ন সামগ্রী। পোড়ামাটির অলংকার, দ-ায়মান নারী মূর্তি, মাটির দোয়াত-কলম, শ্বেতপাথরের হাতির মাথা, কালো পাথরের গণেশ, মার্কেন্দ্র পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, চৈতন্য চরিতামৃতা, হরিভত্তি ইত্যাদি প্রাচীন গ্রন্থ। এ ছাড়াও রয়েছে ৮ম ও ৯ম শতাব্দীর সাঁওতালদের ব্যবহƒত তীর-ধনুক। মুসলিম নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে- ১৭শ’ শতকের পোড়ামাটির ফলকে আরবি হরফে লেখা লিপিকা (লিখেছেন হজরত সৈয়দ ইয়াছিন সাহেব)। ১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চ মূল ভবনসহ কিছু এলাকা হাইকোর্ট ডিভিশনকে দেয়া হয়। সে সময় পূর্ণাঙ্গ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ চালু হয় এখানে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও রাজধানীকেন্দ্রিকতার কারণে রংপুর থেকে হাইকোর্ট বেঞ্চটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৫ সালে তাজহাট জমিদারবাড়িটির দায়িত্ব ‘সংরক্ষিত প্রাচীন কীর্তি’ হিসেবে ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইনের অধীনে প্রতœতত্ত¦ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন থেকেই প্রতœতত্ত¦ বিভাগ বাড়িটির দেখভাল করে আসছে। ২০০২ সালে তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী রংপুর এসে জমিদারবাড়িটি পরিদর্শন করে এটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করার নিন্দেশ দেন। এতে ২০০৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জমিদারবাড়িটি জাদুঘর হিসেবে যাত্রা শুরু করে। জমিদারবাড়িটিসহ ১৬ একর ৬ শতাংশ জমি জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৫ সালের আগে জমিদারবাড়িটি তাজহাট রাজবাড়ি হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত ছিল। ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাড়িটি জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী এই বাড়িটি পরিদর্শন করতে আসেন। বাড়িটি জাদুঘরে রূপান্তরিত হওয়ার পর থেকে রংপুরবাসীর কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিভাবে যাবেন : আগমনী এক্সপ্রেস, এসআর ট্রাভেলস, টিআর ট্রাভেলস, গ্রীন লাইন, নাবিলসহ বেশ কয়েকটি বাস গাবতলী, মহাখালী ও কল্যাণপুর থেকে রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ভাড়া ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। রংপুর শহর থেকে তাজহাটের দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। অটোরিকশা, রিকশা অথবা গাড়িতে করে যেতে পারেন তাজহাট জমিদারবাড়ি।
কোথায় থাকবেন : শহরের প্রাণকেন্দ্র জাহাজ কোম্পানি মোড়ে রয়েছে বেশকিছু আধুনিক আবাসিক হোটেল। এ ছাড়াও পর্যটন মোটেল এবং রংপুর মহানগরীর স্টেশন রোড ও সেন্ট্রাল রোডে বেশকিছু ভালোমানের হোটেল গড়ে উঠেছে। এ সব হোটেলে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে।