যেভাবে ভ্রমণ করবেন মেট্রোরেলে

19

দিনক্ষণ ঠিক, এখন শুধু অপেক্ষার পালা। আর মাত্র ৩ দিন পরই রাজধানীর বুকে যাত্রী নিয়ে চলবে স্বপ্নের মেট্রোরেল। আগামী ২৮ ডিসেম্বর সকালে এই স্বপ্ন যাত্রার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
উদ্বোধন শেষে তিনি মেট্রোরেলে উঠবেন। আর এরপর থেকেই যাত্রী চলাচল শুরু করবে মেট্রোরেল।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। টিকেট, স্টেশনে প্রবেশ-বাহির, ওঠা-নামা, এমআরটি কার্ড রিচার্জ ইত্যাদি কাজের মহড়া চলছে। তারা বলছেন, দেশের সাধারণ মানুষ এ ধরনের পরিবহনে যাতায়াত করতে অভ্যস্ত নন। তাদের চলাচলে সুবিধার্থে ভিডিও টিউটোরিয়াল, মাইকিংসহ নানা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
মেট্রোরেলে উঠতে যা করতে হবে : মেট্রোরেলের প্রতিটি স্টেশনই তিনতলা। প্রথম তলা পেরিয়ে দ্বিতীয় তলায় রয়েছে কর্মকর্তাদের অফিস কক্ষ, টিকেট কাউন্টার এবং ওয়েটিং রুম। এটাকে বলা হয় ‘কনকর্স লেবেল’। এখান থেকেই টিকেট সংগ্রহ করতে হবে। গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য টিকেট কাটার দুটি পদ্ধতি রয়েছেÑ সিঙ্গেল বা একক ও পারমানেন্ট। টিকেট সংগ্রেহর আগে যাত্রীকে প্রথমে মনিটরে ভাষা নির্বাচন করতে হবে। ইংরেজি ও বাংলা দুটি ভাষা রয়েছে, যে ভাষায় আপনি স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করবেন সেটা নির্বাচনের পর একক বা পারমানেন্ট (এমআরটি পাস) নির্বাচন করতে হবে। এরপর আসবে গন্তব্যের তালিকা। কোন স্টেশন পর্যন্ত কত ভাড়া সে তালিকা থাকবে। সেখান থেকে যাত্রীকে গন্তব্য স্টেশন নির্বাচন করতে হবে। এরপর কয়টি টিকেট সংগ্রহ করবেন সে তালিকা আসবে। এরপর প্রয়োজনীয় টিকেট, গন্তব্য স্টেশন নির্বাচন করে “ওকে” বাটনে টাচ করলেই মেশিন টাকা দিতে বলবে। টাকা দেওয়ার পর টিকেট বা এমআরটি পাস বেরিয়ে আসবে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে মেট্রোরেলের টিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন। একজন যাত্রী একবারে ৫টির বেশি টিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন না।
অন্যদিকে, এমআরটি পাস পদ্ধতিতে একটি স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে যতবার খুশি যাতায়াত করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে কার্ডটি সময়মতো রিচার্জ করে রাখতে হবে। ২০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত রিচার্জ করে নিতে পারবেন। প্রত্যেক মেট্রো স্টেশনে থাকা টিকেট ভেন্ডরের মেশিনের মাধ্যমেই রিচার্জ করা যাবে।
যাত্রীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে তিন ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে প্রতিটি স্টেশনে। সিঁড়ি, এস্কেলেটরের পাশাপাশি বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য রাখা হয়েছে লিফট।
দ্বিতীয় তলা থেকে টিকেট সংগ্রহ শেষ করে সিঁড়ি বা লিফটের মাধ্যমে পৌঁছাতে হবে তৃতীয় তলায়। টিকেট চেকইনের বিষয়টি দ্বিতীয় তলাতেই শেষ করা হবে। টিকেট চেক হবে ডিজিটালি। সেখানে কোনো কর্মীর প্রয়োজন হয় না। যদি কেউ না পারেন তাহলে নিরাপত্তা কর্মীরা যাত্রীদের সহযোগিতা করবেন।
তৃতীয় তলাতেই মেট্রোর মূল প্ল্যাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্মে নির্দিষ্ট সময় পর পর ট্রেন এসে থামবে। অটোমেটিক দরজা খুলে যাবে। যাত্রীরা নামবেন, আপনি উঠেবেন। গন্তব্য স্টেশনে ট্রেন থামলে যাত্রীরা নেমে এমআরটি পাস পাঞ্চ করলেই দরজা খুলে যাবে এরপর বেরিয়ে যেতে পারবেন। সিঙ্গেল এন্ট্রির কার্ডে ভ্রমণের মেয়াদ একবার। আর দশ বছর মেয়াদি কার্ডের যাত্রীরা বারবার ভ্রমণ করতে পারবেন। ভ্রমণের দূরত্বে ভাড়া অনুযায়ী অটোমেটিক টাকা কেটে নেবে।
মেট্রোরেলের ভাড়া : মেট্রোরেলে যাতায়াতের জন্য প্রতি কিলোমিটারে ৫ টাকা ধরে সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা। ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, উত্তরা নর্থ স্টেশন থেকে উত্তরা সাউথ স্টেশন পর্যন্ত ভাড়া ২০ টাকা। মিরপুর-১১ নম্বর স্টেশন পর্যন্ত ৩০ টাকা, কাজীপাড়া স্টেশন পর্যন্ত ৪০ টাকা, শেওড়াপাড়া স্টেশন পর্যন্ত ৫০ টাকা, আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত ৬০ টাকা, ফার্মগেট পর্যন্ত ৭০ টাকা, শাহাবাগ পর্যন্ত ৮০ টাকা, সচিবালয় পর্যন্ত ৯০ টাকা এবং কমলাপুর পর্যন্ত ভাড়া হবে ১০০ টাকা।
স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে যাত্রীরা মেট্রোরেলের ভাড়া পরিশোধ করতে পারবেন। তবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা বিনা ভাড়ায় মেট্রোরেলে ভ্রমণ করতে পারবেন। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতিটি সিঙ্গেল ট্রিপের বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
যেভাবে প্রকল্পের শুরু : রাজধানীর যানজট কমানোর পাশাপাশি দ্রুত যাতায়াতের উদ্দেশে মেট্রোরেল প্রকল্প নেয়া হয় ২০১২ সালে। এ লক্ষে ২০১৩ সালে জাপান সরকারের প্রতিষ্ঠান জাইকার সঙ্গে ঋণচুক্তি করে সরকার। এরপর সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়ন শেষে কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। উড়াল ও পাতাল মিলিয়ে মোট ৬ ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-৬, এমআরটি লাইন-১, এমআরটি লাইন-৫ এ দুই রুট রয়েছে নর্দার্ন ও সাউদার্ন, এমআরটি লাইন-২, এমআরটি লাইন-৪।
উত্তরা এলাকার দিয়াবাড়ীতে মেট্রোরেল ডিপো নির্মাণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ভৌত অবকাঠামো নির্মানের কাজ। এমআরটি লাইন-৬ এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১.৭৩ কিলোমিটার মেট্রোরেল পথের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ২৮ ডিসেম্বর। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চালুর কথা রয়েছে।
ডিএমটিসিএল’র প্রতিবেদন অনুযায়ী এই অংশের অগ্রগতি ৮৫.৭৬ শতাংশ। প্রাথমিক পরিকল্পনায় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার নির্মাণের কথা ছিল। পরে সংশোধন করে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১.১৬ কিলোমিটার বাড়ানো হয়।
এমআরটি লাইন-৬ এর আওতায় এই অংশের কাজ শুরু করতে চলতি বছরের ২৮ নভেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে সরকার। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে এই অংশের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল স্থাপনে চলমান এ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এরপর কমলাপুর পর্যন্ত যুক্ত হওয়ায় এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়। এর মধ্যে জাইকা ১৯ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা দিচ্ছে আর সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করবে ১৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। খবর এফএনএস।