যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানির প্রশ্নের কড়া জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী

139

Captureবাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের এক নাগরিকের তোলা এক প্রশ্নের ‘কড়া জবাব’ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সুইজারল্যান্ডের কংগ্রেস সেন্টারে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ৪৭তম বার্ষিক সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ায় নিয়ে একটি সেশনে মতবিনিময়কালে এ জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সেশনে অংশ নিয়ে পাকিস্তানের সুশীল সমাজের এক প্রতিনিধি অভিযোগ করে বলেন, যুদ্ধাপরাধের নামে বাংলাদেশে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যাঁদের আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক বলে সম্বোধন করছেন, তাঁরা সকলেই ১৯৭১ সালে অপরাধ সংগঠনের সময়ে নবীন ছিলেন এবং তাঁরাই এই গণহত্যা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা সে সময় জঘন্যতম হত্যাকা-, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে সম্পৃক্ত ছিলেন। এসব অপরাধেই তাঁদের দেশের প্রচলিত আইনে বিচার এবং দ- প্রদান করা হয়। ওই সেশনে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রেনিল বিক্রমসিংহে, ভারতের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নির্মলা সীতারামান ও সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশের জনপ্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশ থেকে তাদের বিনিয়োগ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক দেশ থেকে বিনিয়োগ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়াটা কোনো অংশেই সহজ কাজ নয়। ওই সেশনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ কোনো প্রভাব পড়বে কি নাÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, দূষণকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার জন্যই এ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে উন্নততর এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশ্নের জবাব দেওয়া ছাড়াও এ সময় দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করতে তাঁর সরকারের উদ্যোগে নেওয়া বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার ৪০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতের জন্য দায়ী উন্নত বিশ্বের দেশগুলোকে জলবায়ু ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। এ সময় সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশনের (সার্ক) কার্যকারিতা হারানোর অভিযোগকে উড়িয়ে দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এই আঞ্চলিক জোট খুব ভালোভাবেই সক্রিয় আছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্কের কার্যকারিতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি, আট জাতির এ আঞ্চলিক সংস্থাটি খুব ভালোভাবে সক্রিয় আছে এবং তিনি মনে করেন, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এর মাধ্যমে আরো অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তিনি দারিদ্র্য বিমোচনে সার্কভুক্ত দেশগুলোকে ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদার করতে এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সার্ক এখনো জীবিত। সেশনের শুরুতে গত সার্ক সম্মেলন স্থগিত হওয়া এবং সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গত ৯-১০ নভেম্বর ইসলামাবাদে ১৯তম সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। বাংলাদেশ, ভারতসহ কয়েকটি দেশ সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া এটি স্থগিত হয়ে গিয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একটা সম্মেলন স্থগিত হয়েছে এতে আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। আমি মনে করি সার্কের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়নি। এখনো যথেষ্ট কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সার্ক এখনো জীবিত। এ অঞ্চলের মানুষের কল্যাণে তাদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র আমাদের প্রধান শত্রু। দারিদ্র কিভাবে বিমোচন করা যায়, সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা দরকার। তিনি বলেন, ব্যবসা, কানেকটিভিটি, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। আমরা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি। বিসিআইএম, বিবিআইএন, বিমসটেক আঞ্চলিক ফোরামের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য বৃদ্ধি বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নৌপথসহ বিভিন্ন ধরনের কানেকটিভিটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাফটাকে শক্তিশালী করা হয়েছে। সার্ক স্যাটেলাইট উত্তক্ষেপণের চিন্তা ভাবনা করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে আমেরিকার পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়া থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়া হবে- এ রকম আলোচনা বিষয়ে একজন প্রশ্ন তুললে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কেউ ইচ্ছে করলে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাবে সেটা সম্ভব না, খুব সহজ হবে না। বাংলাদেশের জনশক্তিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সম্পদ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবেলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স ট্রাস্ট ফান্ড, অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কারো জন্য অপেক্ষা না করে আমরা নিজেরাই বাস্তবায়ন শুরু করেছি। কয়লা ভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্টে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে কি না? অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী একজনের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে আমাদের ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। এটা করতে হলে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুতে আমাদের যেতে হবে। পারমানবিক বিদ্যুতসহ বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছি। ডব্লিউইএফের ৪৭তম বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রফেসর ক্লাউস সোয়াবকে ধন্যবাদ জানান। ওই সময় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘ কার্যালয়ে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি শামীম আহসান উপস্থিত ছিলেন।