মে দিবস এবং আমাদের শ্রমজীবি মানুষ

119

gourbangla logoআমাদের শ্রমজীবি মানুষগুলোর জীবনে কোনো শুক্র-শনি নেই। দিনরাত নেই। নেই আরাম-বিরাম। কোন মে দিবস নেই। ঠেলার চাকা ঘোরে, রিকশার চাকা ঘোরে। ঘাম ঝড়ে ঝড়ে মাটিতে পরে। এসব শ্রমিকরাই যানবাহনের চাকা সচল রাখে, দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরায় আর এসব শ্রমজীবী মানুষের জীবনের চাকাই আজ জগদ্দল পাথরের মতো স্থির। তা কিছুতেই সচল হয়নি; হচ্ছে না, বোধ করি সহসা হবেও না। আর এ অবস্থায় কোন মুখে মে দিনের শুভেচ্ছা জানাই তাঁদের?
১ মে। এ তারিখটার সাথে শ্রমিকদেও একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। দিনটি শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। দিনটি আনত্মর্জাতিক শ্রমিক দিবস নামেও পরিচিত। বেশকিছু দেশে মে মাসের প্রথম দিনটিকে লেবার ডে হিসাবে পালন করে। এদিনটি আমাদের দেশেও সরকারিভাবে ছুটির দিন। জাতিসংঘও এ দিনটিকে অনুমোদন করে। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তারা সময বেঁধে দেয় ১৮৮৬ সালের ১লা মে। কিন্তু কারখানা মালিকগণ এ দাবী মেনে নিল না। ১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রমদিনের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকের ওপর গুলি চালানো হলে ১১ জন শহীদ হয়। শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকারী প্রায় সব রাষ্ট্রগুলোতে দিনটিকে সরকারিভাবে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মজার বিষয় যে দেশে এই মে দিবসের সৃষ্টি, যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে শ্রমিকরা একতরফা দিনটিকে পালন করলেও সরকারিভাবে নাকি মে দিবস পালিত হয় না ! ওখানে যে দিনটিকে লেবার ডে হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় তা হচ্ছে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার। কানাডাও দিনটি পালন করে না। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের জাতীয় দিবসগুলো আলাদাভাবে উদযাপিত হলেও একমাত্র মে দিবসটিই পৃথিবীর প্রায় সব দেশে সরকারিভাবে পালন করে থাকে।
আমরা শুধু ‘মে দিবস’ পালন করি; মিছিল করি; জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেই; শ্রমিকদের আশ্বাস দেই। এসব বক্তৃতা বিবৃতির কতটুকু প্রতিফলন ঘটে। এসব মনে হয়না ‘মে দিবস’ এর উদ্দেশ্য ছিল! যাদের জন্য মে দিবস তারাই যদি সুফল ভোগ না করলো তাহলে দিবস পালনে স্বার্থকতা কোথায়? মে দিবস এলেই আমাদের দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, আমলা, শ্রমিক সংগঠন, শিল্পপতি, গামেন্টস মালিক সবাই মে দিবসে শ্রমিকদেরকে উদ্দেশ্য করে সুন্দর সুন্দর বক্তব্য দিয়ে থাকেন। কিন’ মে দিবস পার হয়ে গেলে শ্রমিকদের প্রতি তাদের কর্তব্য ও এ দিনে তাদের প্রদেয় আপ্ত বাণী বেমালুম ভুলে যান। এ তথ্য আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য। মূলতঃ কথিত সব দিবস পালন তাই শুধুই আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব এবং এ কারণেই তা ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থহীন বটে। কারণ দিবস পালনের মাধ্যমে উক্ত দিনে সংবেদনশীল হয়ে বাকি ৩৬৪ দিন গাফিল থাকার কথাই প্রকারান্তে প্রতিভাত হয়।
শ্রমিকদের নিয়ে তামাশা চলছে দেশে-দেশে, যুগ যুগ ধরে। এদেশে শ্রমজীবি মানুষের মৃত্যুর মাতম ফিরে আসে বারবারই। সাভারের রানা প্লাজার ঘটনাটি দেশবাসীর জন্য সবচেয়ে বড় ট্রাজিডি। ক’টা মানুষ সুখ শান্তির লালশার স্বিকার এসব শ্রমিকরা। পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তর ট্রাজেডি হলেও আমাদের এ ব্যপারে বোধউদয় হয়নি এখনো। হলে নিহত এবং আহত শ্রমিকদের পরিবার তাদের নেয্য পাওনা ঠিক সময়ই পেয়ে যাবার কথা। রানাপ্লাজা দুর্ঘটনার ৪ বছর পার হলেও শ্রমিকরা এখনও দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে কেন? একজন শ্রমিক মরলো কি বাঁচলো তাতে মালিক বা সরকারের যেন কিছুই আসে যায় না। তাদের মূল্য কেবল এই কারণে যে, তারা শ্রমশক্তির যোগানদাতা। শ্রমিকের ঘামঝড়া কষ্টে মালিকের অর্থের পাহাড় গড়া। নুন্যতম শ্রমিকদের কথা ভাবে না মালিকরা। তা নাহলে সাভারে যা ঘটেছে তাতো গার্মেন্টস মালিকদের সৃষ্ট ফলই। সাভার বাজার স্ট্যান্ডে অবস্থিত রানা প্লাজা বিল্ডিং ধসে পড়ে শত-শত গার্মেন্ট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে আশুলিয়ার স্পেকট্রাম ও তেজগাঁর ফিনিঙ কারখানা এরকমভাবে ধসে পড়ে। তাছাড়া, অসংখ্য কারখানায় আগুনে পুড়ে সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গত নভেম্বরে আশুলিয়ায় তাজরিন গার্মেন্টসে এবং আদাবরে স্মার্ট গার্মেন্টসে দেড় শতাধিক শ্রমিক আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। এতো মানুষের মৃত্যু! সাভারের ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি হত্যাকান্ড। ্তুসতর্কতা ও বাধা নিষেধ অমান্য করে কেবলমাত্র মুনাফার লোভে এই কারখানাগুলো চালু রাখা বড় ধরণের অপরাধ। সেই হিসাবে এই মালিক পড়্গ প্রশাসনের সঙ্গে মিলে এই হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছে।
শ্রমিকরা অমানবিক পরিশ্রম করলেও মজুরি মিলত নগণ্য। শ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করত; ড়্গত্রে বিশেষ তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পরত। সেই বৃত্ত থেকেই ১৮৮৬ সালের ১ মে শ্রমিকরা বেরিয়ে আসতে চেয়ে ছিল। তারা ঐ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সে অধিকার প্রতিষ্ঠিতও করতে পেরেছিল। শ্রমিক মজুরদের অধিকার আদায়ের যে আন্দোলন হয়েছিল তাতে শ্রমিকদের উপর কৃত অত্যাচার এবং শ্রমিকদের আতœত্যাগ এর বিনিময়ে প্রতীকি প্রতিবাদ হিসেবে পালিত হয় দিনটি। শুধু বাংলাদেশ নয় বরং গোটা বিশ্ব পালন করে এ দিনটি। কিন’ কথা এখানেই শেষ হয়ে যায় না। মে দিবস যাদের আতœত্যাগ এর ফসল সেই শ্রমিকরা পাচ্ছে কতটুকু? দিনটি তে সব স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত বন্ধ থাকে বটে কিন’ যারা এনে দিল এই ফসল তাদের ঘরে কতটুকুইবা সুফল পাচ্ছে! আমাদের শ্রমজীবি মানুষগুলো কি এই দিনটিতে একটুও স্বসিত্ম পাচ্ছে। তারা কি শ্রম ছাড়া থাকতে পারছে? আজও এ দিনটিতেও শ্রমিকরা কাজ করছে অর্থ উপার্জনের জন্য। জীবিকা তাড়নায় তারা ছুটছে। কারণ মে দিবসের এই একটি দিন বসে থাকলে এর মাসুল গুনতে হবে তাকেই। আমরা যারা মে দিবসে ঘরে আরাম করে ছুটি কাটাই কিংবা টিভি তে মে দিবসের নাটক সিনেমা দেখি তারা কি এই শ্রমিকদের কষ্টের কথা ভাবি এতটুকুও। একজন রিঙা চালকের প্রাত্যহিক আয় যদি হয় ৩০০ টাকা, তাহলে এই একটি দিন আরাম করে ছুটি কাটানো মানে তার জীবন থেকে ৩০০ টাকার বিসর্জন। তাই ওদের ঘরে বসে দিনটিতে আরামআয়েশের ফুসরৎ কৈ ?
মে দিবস সার্থক করতে সরকার এবং আমাদের সচেতন হতে হবে। তবেই সার্থকতা আসবে মে দিবসে। যারা জনগণকে নানাভাবে সেবা দেন এবং যারা সভ্যতা নির্মাণের কারিগর তারাই শ্রমিক। যেমন যারা কল-কারখানায়, ড়্গেেত খামারে, ঘর গৃহস’ালীতে, রাজমিস্ত্রির অধীনে বা ঘরামীর কাজ করেন, যানবাহন চালান তারাই শ্রমিক। এছাড়াও কুলির কাজ যারা করেন তারাও শ্রমিক। শ্রমিকরা সর্বাপেড়্গা কঠিন শ্রমের কাজ করে থাকেন অথচ সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার তারাই হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। পৃথিবী থেকে ভৌগলিক সাম্রাজ্যবাদ উঠে গেলেও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ উঠে যায়নি। বরং আরও পাকাপোক্তভাবে জেঁকে বসেছে। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ বলতে আমরা বুঝাতে চাচ্ছি মানবতার ঘৃণ্য অভিশাপ সমসত্ম- রকম শোষণ ও বঞ্চনার হাতিয়ার পুঁজিবাদকে। আইএলও শ্রমিকদের কাজ, পারিশ্রমিক ও সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে এবং বাংলাদেশ সেই নীতিমালার ৩১টি ধারা মেনে চলার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছে। যদিও সেই সব নীতিমালার কোনটিই প্রকৃতপড়্গে শতভাগ বাসত্মবের মুখ দেখেনি। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি আইএলও (ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন) নীতিমালা অনুযায়ী যে কোন দেশে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে শিশুর একটি উলেখযোগ্য অংশ জীবিকার জন্য কঠিন শ্রমে নিয়োজিত থাকছে। তাদের কাজের ধরণ হচ্ছে রাজমিস্ত্রির অধীনে কাজ করা, ইট ও পাথর ভাংগা, শিশুরা কাজ করছে বেসরকারি দোকানপাট ও কল-কারখানাগুলোতে। তাদের পারিশ্রমিক উলেস্নখ করার মত কিছু নয়। অনেক ড়্গেেত্র শিশুরা কোন পারিশ্রমিকই পায়না।
বাস্তবে যা দেখছি, এ সমাজে শ্রমিকদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না। বাংলাদেশে তারা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক রূপে ৪২ বছর ধরে দিন কাটাচ্ছে। এভাবে চলে না। চলতে দেওয়া যায় না। আমরা যারা শ্রমিকদের কাজে লাগাই; যাদের শ্রমে অর্থের পাহাড় গড়ি তাদেরকে শ্রমিক স্বার্থ নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা যারা মালিক তাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। শ্রমিকদের ভাই, বোন কিংবা সন্তান ভাবতে শিখতে হবে। এদের প্রতিদিনকার শ্রমের মাত্রা এবং শ্রমের সঠিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে সময়মত। সর্বোপরি তাদের জন্য তৈরি করে দিতে হবে নিরাপদ কর্মস্থল। যেখানে অন্তত তাজিন ফ্যাসন কিংবা সাভারের রানা প্লাজার মত শ্রমিকদের জীবন দিতে হবে না। আর এটাই এবারের মহান মে দিবসে’র প্রত্যাশা আমাদের।
(লেখক- মীর আব্দুল আলীম, কলামিস্ট, গবেষক ও সম্পাদক- নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম।)