মুখোশের আড়ালে মুখোশ

93

চার রাস্তার মোড়। দাঁড়িয়ে আছি মোড়ের একপাশে বটগাছের নিচে। হঠাৎ ঘনকালো মেঘ চারপাশ ছেয়ে গেছে আঁধারে। বৃষ্টিও শুরু হলো বড় বড় ফোঁটায়। মাথায় দুএক ফোঁটা পড়তে না পড়তেই দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম একটি দোকানের সামনে। দোকানটি কনফেকশনারির। দাঁড়াতেই দোকানের মালিক ডেকে বলেন ‘আসুন, ভেতরে আসুন। বসুন। বাইরে বৃষ্টিতে ভিজে যাবেন।’ যতক্ষণ বৃষ্টি হলো আমাদের একে অপরের চেনা-জানার নানা কথা সেরে এক কেজি কমলা কিনে সরাসরি বাসায় ফিরে এলাম। সেই থেকে মাঝে মাঝে সকাল-বিকাল যখন ইচ্ছে আমি তাঁর ওখানে একটু যাই, ফল-টল কিছু খাই, কিছু কথা হয় মন খুলে, সখ্যতার বিনিময় অতঃপর আপন আপন পথ মাড়ানো। ছুটে যাই আপন আপন পথের ঠিকানায় যেমন ছুটে যাচ্ছে চোখের সামনে কতো বাস, মাইক্রোবাস, কার, ট্রাক, রিকশা আরও কতো শত সহ¯্র যান। প্রথম পরিচয়েই যে উনি আমাকে খুব কাছের করে নিয়েছিলেন তা তাঁর পরবর্তী বর্ণনায় স্পষ্ট হয়ে উঠে। আর হ্যাঁ আমি ছোট বেলায় আর সকল বাচ্চাদের মতো কোকা-কোলা, পেপসি, সেভেন আপ বা কোন জাঙ্ক ফুডের লোভে মাঝে মাঝে এই রকম কিছু কনফেকশনারির দোকান পরখ করেছি তা তো খুব স্বাভাবিক এবং সাধারণ বৈকি। কিন্তু এখন এই চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে সেই রকম কোন লোভ আর কাজ করে না বললেই চলে। বিভিন্ন রকমের ফলও বিক্রি হয় এই দোকানে যেমন কলা, আঙ্গুর, আপেল, মাল্টা, বেদানা, কমলা, ডাব ইত্যাদি। বসে বসে আমার ও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু আলাপ আলোচনাও হয়। নাম তাঁর আলী হাসান। দীর্ঘ দশ বছর (২০০৭-২০১৭) খ্রিঃ দুবাই-এ বিল্ডিং কন্সট্রাকশনের কাজ করেছেন। কিন্তু দশ বছর কাটিয়েও আয় রোজগারে তেমন ভালো কিছু করতে পারেন নি। দেশে ফিরেই যতটুকু পেরেছেন সেই অর্জিত অর্থ দিয়ে এই কনফেকশনারির দোকানটি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর দুটি পুত্র সন্তান। নূর আলম (১৫) এবং আব্দুল আজিজ (৮)। তা জীবনের চলমান ধারায় এক একজন মানুষ এক এক রকম দুঃখ বা অনুশোচনা পুষে রেখে ঘুরিয়ে চলেছেন জীবনের চাকা। এই আলী হাসানের জীবন যে এতটা গভীর অজ্ঞাত বেদনার ভারে ন্যুব্জ, কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখিতায় তিনি যে এক ঝুনা নাারিকেল তা বাইরে থেকে বোঝার কোন উপায় নেই। সেই একটি বিষয়।

এক.
তাঁর বড় ছেলে নূর আলম জন্মের সময় যে ভাবেই হোক মাথায় অর্থাৎ ব্রেইনে আঘাতপ্রাপ্ত হলে শরীরে খিচুনি শুরু হয়। আর এই জন্য তাঁর নার্সদের উপর খুব আক্ষেপ। তাঁর ধারণা মা ও শিশু কেন্দ্রের নার্সদের অসচেতনতা অথবা অমনোযোগিতার কারণেই তাঁর সন্তানের এই অপূরণীয় ক্ষতি। জীবনে প্রথম সন্তান একটি পরিবারে একটি নতুন আলোর প্রদীপ। আর এই প্রথম ইস্যুতেই যে তাঁকে অসীম আঁধারের ঘূর্ণিপাকে ফেলে দেবে তা কি কখনো ভেবেছিলেন? পরে অনেক চিকিৎসা করেও কোন ফল হয়নি। ১৫ (পনের) বছরের ছেলেটি আজও কথা বলতে পারে না, হাঁটতেও পারে না। এমনকি তাকে খাইয়েও দিতে হয়। আর এসব করেন ওর মা। তাই বাইরে রাত কাটানো দূরে থাক ওকে চোখে চোখে রাখতে কারো সাথে ভালো করে দুদ- কথা বলারও সময় হয়না ছেলের মায়ের। একটু বেরুলে সময় ধরে ফিরে আসতে হয়। ছেলের জন্য মায়ের জীবনটাও প্রতিবন্ধী মতো হয়ে পড়েছে। একটু বাইরে ঘোরাফেরা বা দুএক দিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া একটু মানসিক প্রশান্তির যে অবকাশ যাপন তা আর কখনো ওর মায়ের জীবনে হলো না। ‘এই জীবন থেকে জীবনের ওপারেই যেন শান্তি’। ‘মাঝে মাঝে ওর মায়ের মুখ থেকে বেরিয়ে আসলে আমি অবাক নয়নে সেই মাস্ক পরা নার্সকে দেখতে পাই যেন আমার সামনে দৈত্যের মতো হো হো করে হেসে হেসে ধেয়ে আসছে আর আমি কোথায় যেন দূর অজানায় দৌড়ে পালাচ্ছি, শুধু পালাচ্ছি কিন্তু সে যাত্রায় না আছে মৃত্যু না আছে বাঁচার মতো এক ফোটা মরীচিকার ঠিকানা।’
তারপর থেকে কিছুদিন আর সে দোকানে আমার যাওয়া হয় না। চলতে ফিরতে মাঝে মাঝে তাঁর সাথে আমার দেখা হয়। দেখা হয় চোখে চোখে যদিও সেকরম কোন কথা হয়না। কয়েকদিন আগে মাল্টা ফল কিনতে গেলে দেখি আলী হাসানের ছোট ছেলেটি বসে আছে ওর বাবার চেয়ারে। আমি তাকে মাল্টার হালি বা কেজির দাম জিজ্ঞেস করলে সে বলে সে বিক্রয় মূল্য জানে না। ফিরে এসে সামনের দোকান থেকে কিনলাম এক কেজি মাল্টা। তারপর দিন যায় দিন আসে। করোনা মহামারিতে সারা পৃথিবী জর্জরিত। তাই সেরকম বাইরে বের হওয়া হয় না। আবার একেবারে ঘরে বসেও তো থাকা যায় না। গতকাল সন্ধ্যার আগ দিয়ে বাইরে একটু হাঁটার মন চাইলে বের হলাম। অনেক দিন যাওয়া হয়নি তাই আলী হাসানের দোকানে একটু ঢু দেয়া যাক বলে মনটা চেয়ে বসলো। যেতেই আমাকে চেয়ারটা ঝেড়ে মুছে বসতে দিলেন। সামনে প্লাস্টিকের বড় ব্যাগে টোস্ট বিস্কট। আমি একটি বিস্কুট খেয়ে একগ্লাস জল খেলাম। একশত বিশ টাকা কেজি টোস্ট বিস্কুট। খেতে ভালোই লাগল। আধা কেজি বিস্কুট বাসার জন্য নিলাম। খেতে খেতে উনি আমাকে ঘটনাটি বলতে লাগলেন।

দুই.
একদিন মটরসাইকেলে করে হঠাৎ এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালো আমার দোকনের সামনে। করোনার সময়। মুখে মাস্ক পরা। ‘কি খবর কেমন আছ? আমাকে চিনতে পারছ না? ও মাস্ক পরে আছি তাই বুঝি?’ এই বলে অর্ধেকটা মাস্ক খুলে আবার সে মাস্ক পরে নিলো। আমি বললাম ‘সমস্যা নেই বলেন, কি নেবেন?’ ‘আরে আমার নাম বারি। আমি অমুক কলেজের লেকচারার। তুমি ভালো আছ তো?’ ‘জ্বি ভাই, আমি তো ভালোই আছি এই যেমন দেখছেন।’ এই কথা বলছি আর অন্যান্য কাস্টমারদের সওদা দিয়ে যাচ্ছি।
‘এই শোন আমাকে এক প্যাকেট গোল্ডলিফ দাও তো।’ যেই বলা আমি এক প্যাকেট গোল্ডলিফ সিগারেট তাকে বের করে দিলাম। ‘ঠিক আছে তোমাকে পরে বিল শোধ করে দেবো।’ ‘বলেই লোকটি মটরসাইকেল নিয়ে চলে গেল। সেই যে গেল আর ফিরে আসে না এখন পর্যন্ত।’
‘আমি কিন্তু শুরু থেকেই আপনাকে ভেবে নিয়ে তার সাথে কথা বলছি। আর আপনাকে ভেবেই সিগারেটের প্যাকেটটি তাকে ধরিয়ে দিয়েছি। যেহেতু অর্ধেক মুখোশ পরিহিত তাই তাকে আমি সবটুকু চিনতে পারিনি। আজকের বাজারে এক প্যাকেট গোল্ডলিফের দাম ২০০/= (দুইশত টাকা)। আসলে টাকার অংকে মানুষের বিচার হয় না।’
আমার ভেতর তখন থেকে কেম যেন করছে যেমন কিছু হাত থেকে কিছু খসে পড়ার মতো। এই ধরুন একটা কাঁচের গ্লাস হাত থেকে খসে পড়ে গেলো আর অমনি ভেঙ্গে গেলো।’
‘তাই বুঝি? আপনি কি আমাকে কখনো এইভাবে সিগারেট খেতে দেখেছেন? আর আপনাকে তো আমি কখনো তুমি ডাকি না। সব সময় আপনি বলেই সম্বোধন করি।’ পরক্ষণে ও বললো ‘জ্বি, ঠিক আছে। আপনাকে আমি লক্ষ্য করেছি। সে আপনি না। অনেক দিন আপনি আমার দোকানে আসেন নি, কিন্তু আসা যাওয়ার পথের ধারে যতটুকু দেখেছি সে ব্যক্তি আপনি না।’
কথাটি শুনে একদিকে যেমন ভালো লাগল অন্য দিকে ঠিক অন্য রকম একটা কষ্ট আমার বুকের ভেতর ঢেউ খেয়ে গেলো। বিদেশ ফেরত এই লোকটি এখন নিজ শহরে একটা দোকান নিয়ে বসেছেন সংসারের হিল্লা হিসাবে। সেই কষ্টার্জিত অর্থের এই ব্যবসা তাঁর। এখন প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের কষ্ট যে সেই প্রতারককে কখন কোন যন্ত্রণায় ফেলে দেয় তা কে জানে? কেননা প্রকৃতির উপঢৌকন হয় খুব নির্মল নয় বড়ই নির্মম। আরো কতো দীর্ঘশ্বাসের ঘাত-প্রতিঘাত যে সে গুণে যাচ্ছে তার খবর কে রাখে?

মাহবুব জন : কবি ও লেখক। সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) ঃ হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।