মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে জয় পেল বরিশাল

3

দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর আগে ম্যাচে প্রবল উত্তেজনা। কোন বোলারের সামনে কোন ব্যাটসম্যান স্ট্রাইক নেবেন, এর জের ধরে উত্তেজিত হয়ে কেডস ছাড়াই মাঠে ঢুকে গেলেন সাকিব আল হাসান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে খেলা শুরু হতেই দেরি হয়ে গেল বেশ কিছুটা। মাঠের ক্রিকেটে অবশ্য উত্তেজনা তেমন একটা ছড়াল না। সাকিবের বরিশাল জিতে গেল অনায়াসেই। বিপিএলে মঙ্গলবারের প্রথম ম্যাচে রংপুর রাইডার্সকে ৬ উইকেটে হারাল ফরচুন বরিশাল। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে শোয়েব মালিকের দারুণ ফিফটিতে রংপুর ২০ ওভারে তোলে ১৫৮ রান। বরিশাল ম্যাচ জিতে যায় চার বল বাকি রেখে।

বরিশালের রান তাড়ায় ফিফটি করে আসরে প্রথম খেলতে নামা ইব্রাহিম জাদরান। তবে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে দলের জয়ের মূল নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। আঁটসাঁট বোলিংয়ে ২ উইকেট নেওয়ার পর ব্যাট হাতে চারে নেমে তিনি খেলেন ২৯ বলে ৪৩ রানের ইনিংস। রান তাড়ার শুরুতে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা সাকিব ব্যাটিংয়েই নামেননি। গতবারের রানার্স আপ বরিশালের এটি দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথম জয়। রংপুর জিতেছিল তাদের প্রথম ম্যাচে। বরিশালের রান তাড়ার শুরুতেই বাধে বিপত্তি। প্রথম ওভারে বাঁহাতি স্পিনার রাকিবুল হাসানকে বল হাতে দেখে স্ট্রাইকে যান বরিশালের বাঁহাতি ওপেনার চতুরাঙ্গা ডি সিলভা। রংপুর অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান তখন রকিবুলকে সরিয়ে বোলিংয়ে আনেন অফ স্পিনার মেহেদি হাসানকে। এটি দেখে সাকিব ড্রেসিং রুম থেকে বেয়ে ইশারায় স্ট্রাইকে যেতে বলেন ডানহাতি ওপেনার এনামুল হককে। এসব নিয়েই একপর্যায়ে সাকিব ঢুকে যান মাঠে। আম্পায়ারদের সঙ্গে তর্ক করতে দেখা যায় তাকে। একটু পর মাঠ ছেড়ে যান তিনি। দেরিতে খেলা শুরুর পর বাঁহাতি রকিবুলের সামনে স্ট্রাইকে থাকেন বাঁহাতি চতুরাঙ্গাই।

এত কা-ের পর স্ট্রাইক পেয়ে অবশ্য কাজে লাগাতে পারেননি চতুরাঙ্গা। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই ক্যৌাচ দেন তিনি, অল্পের জন্য যা নিতে পারেননি বোলার রকিবুল। তবে চতুর্থ বলেই লঙ্কান এই ক্রিকেটার ধরা পড়েন মিড অফে। আরেক পাশে এনামুল শট খেলতে থাকেন। মেহেদিকে বাউন্ডারি মারেন তিনি, ছক্কা মারেন রকিবুলকে। তবে চতুর্থ ওভারে আবার বিতর্ক। এবার সিকান্দার রাজার বলে এনামুলকে আম্পায়ার এলবিডব্লিউ না দিলে রিভিউ নেয় রংপুর। কয়েক দফা রিপ্লে দেখে টিভি আম্পায়ার আউট দিয়ে দেন এনামুলকে। বিপিএলের এডিআরএস-এ যদিও বল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি নেই। মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে হলে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে টিভি আম্পায়ারকে। কিন্তু এখানে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার উপায় ছিল না কোনোভাবেই। সিদ্ধান্ত ব্যাটসম্যান এনামুলকে দেখা যায় ক্ষিপ্ত হয়ে আম্পায়ারদের সঙ্গে কথা বলতে।

মাঠ ছাড়ার সময় সীমানা দড়ির বিজ্ঞাপনী টবলারে ব্যাট দিয়ে মেরে বসেন তিনি। এরপর অবশ্য বিতর্ক আর তেমন ছড়ায়নি। চারে নেমে মিরাজ দারুণ সব শট খেলে বদলে দেন ম্যাচের গতি। ইব্রাহিম জাদরান তাকে সঙ্গ দেওয়ার ফাঁকে সুযোগ পেলেই খেলেই বড় শট। ৫৮ বলে ৮৪ রানের জুটিতে দলের জয়ের ভিত গড়ে দেন দুজন। রবিউল হকের বলে স্লগ করতে গিয়ে মিরাজের বিদায়ে ভাঙে এই জুটি। ইব্রাহিম দলকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে আউট জন ফিফটি করে। দেশের বাইরে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে অভিষেকে আফগান এই ব্যাটসম্যানের রান ৪১ বলে ৫২। তিনি আউট হওয়ার পরও জয় কিছুটা দূরে ছিল বরিশালে। ইফতিখার আহমেদ ও করিম জানাত নেই পথ পাড়ি দেন সহজেই। ছক্কায় ম্যাচ শেষ করা ইফতিখার অপরাজিত থাকেন ১৮ বলে ২৫ রান করে। জানাত মাঠ ছাড়েন ১৪ বলে অপরাজিত ২১ রান নিয়ে। ম্যাচের প্রথম ভাগের নায়ক ছিলেন শোয়েব মালিক। আগামী মাসেই তার বয়স পূর্ণ হবে ৪১। পেশাদার ক্রিকেট খেলছেন সেই ১৯৯৭ সাল থেকে।

এখনও যে তিনি দারুণ কার্যকর, পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান তা প্রমাণ করেন আরেকবার। শুরুতে রনি তালুকদারের ঝড়ো ইনিংসের পর এক পাশ থেকে উইকেট পড়ে গেলেও আরেক পাশ থেকে রংপুরকে এগিয়ে নেন মালিক। ৫ চার ও ২ ছক্কায় ৩৬ বলে করেন তিনি ৫৪। ম্যাচের শুরুটাই হয় প্রথম বলে বরিশালের সাফল্য আর রংপুরের হোঁচট দিয়ে। সাকিবের ঝুলিয়ে দেওয়া বল পিচ করে সোজা এগিয়ে মোহাম্মদ নাঈম শেখের ব্যাট ছুঁয়ে আশ্রয় নিয়ে কিপারের গ্লাভসে। পরে ওভারে পাল্টা আক্রমণ করেন রনি তালুকদার। দুটি বাউন্ডারি মারেন তিনি সৈয়দ খালেদ আহমেদকে। এরপর এই ধারা চলতেই থাকে। এক প্রান্তে রান তুলতে থাকেন রনি। আরেক প্রান্তে পড়তে থাকে উইকেট। ইবাদত হোসেনের অনেক বাইরের বল স্টাম্পে টেনে আনেন শেখ মেহেদি হাসান (৭ বলে ৬)। চতুরাঙ্গা ডি সিলভার দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে যান সিকান্দার রাজা (৭ বলে ২)। রনির আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে তবু পাওয়ার প্লেতে রান ওঠে ৪৮। দল তিন উইকেট হারালেও দমে যাননি রনি। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের পথেই ছুটতে থাকেন তিনি। চতুরাঙ্গার বলে দুর্দান্ত সুইপে ছক্কার পর বাউন্ডারি মারেন আরেকটি। টানা দুটি বাউন্ডারি মারেন ইবাদতকে। তবে সম্ভাবনাময় ইনিংসটাকে বেশি দূর আর নিতে পারেননি তিনি।

চতুরাঙ্গার জোরের ওপর করা ডেলিভারি তার ব্যাপ-প্যাডের ফাঁক গলে ছোবল দেয় স্টাম্পে। আগের ম্যাচে ৩১ বলে ৬৭ রান করা ব্যাটসম্যান এবার করেন ২৬ বলে ৪০। মালিক এরপর জমে যান উইকেটে। চতুরাঙ্গার বলে বাউন্ডারির পর বিশাল ছক্কা মারেন তিনি মেহেদী হাসান মিরাজকে। কিন্তু তাকে সঙ্গ দিতে পারেননি নুরুল হাসান সোহান, বেনি হাওয়েল ও আজমতউল্লাহ ওমারজাই। বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে আসেন তিনজনই। ১১৭ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে তখন অল্পতেই গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রংপুর। মালিককে তখন ভরসা জোগান রবিউণ হক। ৯ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামা পেসার আগলে রাখেন এক প্রান্ত। মালিক বাড়াতে থাকেন রান। শেষের আগের ওভারে করিম জানাতকে টানা দুটি বাউন্ডারি মারেন মালিক। শেষ ওভারে কামরুল ইসলাম রাব্বির চলে ছক্কায় পঞ্চাশে পা রাখেন ৩৫ বলে। ২০ ওভারের ক্রিকেটে তার ৭৩তম ফিফটি এটি। শেষ বলে রবিউলের ছক্কায় শেষ হয় ইনিংস। এই পেসার অপরাজিত থাকেন ১৮ রানে। রানটাকে তখন বেশ চ্যালেঞ্জিংই মনে হচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত উত্তেজনার রেশ থাকল কেবল ক্রিকেটের বাইরে, ব্যাট-বলে লড়াই খুব একটা হলো না।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
রংপুর রাইডার্স: ২০ ওভারে ১৫৮/৭ (নাঈম ০, রনি ৪০, মেহেদি ৬, রাজা ২, মালিক ৫৬*, সোহান ১২, হাওয়েল ৫, ওমারজাই ১, রবিউল ১৮* ; সাকিব ৪-০-১৯-১, খালেদ ১-০-৯-০, ইবাদত ২-০-২২-১, চতুরাঙ্গা ৪-০-৩০-২, মিরাজ ৪-০-২১-২, জানাত ৩-০-২৪-১, কামরুল ২-০-২১-০)।
ফরচুন বরিশাল: ১৯.২ ওভারে ১৬২/৪ (চতুরাঙ্গা ১, এনামুল ১৫, ইব্রাহিম ৫২, মিরাজ ৪৩, ইফতিখার ২৫*, জানাত ২১*; রকিবুল ৪-০-২৪-১, মেহেদি ৩.২-০-২৩-০, রাজা ২-০-১৪-২, হাসান ৩-০-৩১-০, ওমারজাই ১-০-১৩-০, হাওয়েল ৩-০-৩১-০, রবিউল ৩-০-২৫-১)।
ফল: ফরচুন বরিশাল ৬ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: মেহেদী হাসান মিরাজ।