ভারতকে উড়িয়ে ফাইনালে ইংল্যান্ড

4

মাঠে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ১১ জন, কিন্তু গ্যালারিতে আরও প্রায় ৪০ হাজার! ম্যাচ শুরুর বেশ আগে থেকেই অ্যাডিলেইড ওভালের চারপাশে ভারতের জার্সি আর ভারতের স্লোগান ছাড়া আর কিছু নেই। গোটা এলাকা ভারতীয়দের দখলে। গ্যালারি থেকেও তারা সমর্থন দিয়ে গেলেন কণ্ঠের জোর দিয়ে। কিন্তু অ্যালেক্স হেলস ও জস বাটলার যেন অন্য ভূবনের বাসিন্দা! পারিপার্শ্বিকতাকে পাত্তাই দিলেন না দুজন। স্কিল ও স্নায়ুর চ্যালেঞ্জে ভারতকে ¯্রফে উড়িয়ে ইংল্যান্ড পা রাখল ফাইনালে। ম্যাচের আগের বাস্তবতায় শক্তি-সামর্থ্য আর ফর্মের দিক থেকে দুই দলকে আলাদা করা ছিল কঠিন। কিন্তু মাঠের ক্রিকেটে লড়াই জমলই না।

বিশেষ করে ইংল্যান্ডের রান তাড়ায়। ভারতীয় বোলিং নিয়ে ছেলেখেলা করে ১৬৯ রানের চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্যকে মামুলি বানিয়ে ছাড়লেন বাটলার ও হেলস। ১০ উইকেটের জয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা জুটি গড়ে খেলা শেষ করে দিলেন তারা ২৪ বল বাকি রেখেই। ১৯৯২ ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক দিন ধরে যে আলোচনা, সেটিও বাস্তবে রূপ পেয়ে গেল। সেবার খাদের কিনারায় থাকা পাকিস্তান ঘুরে দাঁড়িয়ে সেমি-ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে পেয়েছিল ইংল্যান্ডকে। সেই ম্যাচের মতো এবারও মেলবোর্নের মহামঞ্চে ট্রফির লড়াইয়ে মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান। ম্যাচের মাঝবিরতিতেও ধারণা করা যায়নি, এরকম একতরফা ম্যাচ হতে পারে। বিরাট কোহলির পরিশীলিত ফিফটির সঙ্গে হার্দিক পান্ডিয়ার ঝড়ো ফিফটিতে ১৬৮ রানের পুঁজি পায় ভারত। এই মাঠের ইতিহাস আর এই বিশ্বকাপের বাস্তবতায় ইংল্যান্ডের লক্ষ্য ছিল যথেষ্টই কঠিন। কিন্তু বাটলার ও হেলস এ দিন উপহার দিলেন যেন ভিনগ্রহের ব্যাটিং।

টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং তার চূড়ান্ত বিধ্বংসী আর কার্যকর রূপ নিয়ে ফুটে উঠল দুজনের ব্যাটে। তাদের থামাবার পথ জানা ছিল না অসহায় ভারতীয়দের। ৭ ছক্কায় ৪৭ বলে ৮৬ রানে অপরাজিত হেলস, ৯ চার ও ৩ ছক্কায় ৪৯ বলে ৮০ রানে অপরাজিত বাটলার। ¯্রফে ১৬ ওভারে দুজনের ১৭০ রানের অবিচ্ছিন্ন বন্ধন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সব আসর মিলিয়ে সব উইকেটেই সেরা জুটি। ইংল্যান্ডের ফাইনালে ওঠার পাশাপাশি হেলসের প্রায়শ্চিত্ত পর্বও আরেকধাপ এগিয়ে গেল পূর্ণতার দিকে। শৃঙ্খলাজনিত কারণে সাড়ে তিন বছর জাতীয় দলের বাইরে রাখা হয়েছিল তাকে। এই টুর্নামেন্টেও দেখা হতো না, যদি জনি বেয়ারস্টো অমন ভুতুড়ে চোট না পেতেন। অনেক যন্ত্রণাময় প্রতীক্ষার প্রহর পেরিয়ে হঠাৎ পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে এখন তিনিই আবার ইংলিশদের নায়ক। আগের দুই ম্যাচেও তিনি ছিলেন সফল। ইংল্যান্ডের রান তাড়া অবশ্য শুরু হয় বাটলারের একটি ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ চুকানোর পালা দিয়ে। এই ম্যাচের আগে ভুবনেশ্বর কুমারের ৩২ বল খেলে ¯্রফে ৩০ রান নিতে ৫ বার আউট হন তিনি। এই দুর্বলতা নিয়ে ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নও কর হয় তাকে। বাটলার জবাবটা মুখে দিয়েছিলেন, দিলেন ২২ গজেও।

সেই ভুবনেশ্বরকেই প্রথম ওভারে তিন দফায় বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে ইংলিশ অধিনায়ক শুরু করেন ইনিংস। এরপর চার-ছক্কার ¯্রােত বয়ে যেতে থাকে ওভার থেকে ওভারে। ডানহাতি পেসার, বাঁহাতি পেসার, বাঁহাতি স্পিনার, অফ স্পিনার, ভারতীয় অধিনায়ক চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু সীমানা থেকে বল কুড়িয়ে আনার ছুটোছুটি চলতেই থাকে তাদের ফিল্ডারদের। পাওয়ার প্লেতে আসে ৬৩ রান। ১০.১ বলেই ১০০। হেলস ফিফটিতে পৌঁছে যান ২৮ বলে, বাটলার ৩৬ বলে। দুজনের উদ্বোধনী জুটিতেই ম্যাচের ভাগ্য গড়া হয়ে যায়। তবে দলকে পথে রেখেই শেষ করেননি দুজন, উইকেটে থেকেই জয়ের উল্লাসকে সঙ্গী করে মাঠ ছেড়েছেন হাসিমুখে। ম্যাচের শুরুতে টস ভাগ্যকেও পাশে পায় ইংল্যান্ড। ম্যাচের প্রথম বলেই লোকেশ রাহুলের বাউন্ডারিতে শুরু করে ভারত। তবে দ্বিতীয় ওভারে বাড়তি বাউন্সের দারুণ এক ডেলিভারিতে রাহুলকে ফেরান ক্রিস ওকস। ফর্মে থাকা বিরাট কোহলি উইকেটে যাওয়ার পরপরই ওকসকে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলেন চোখধাঁধানো এক লফটেড শটে। তবে তিনি বা রোহিত শর্মা, দ্রুত রানের দাবি মেটাতে পারেননি কেউই।

পাওয়ার প্লেতে কেবল ১ উইকেট হারালেও তাই রান আসে মোটে ৩৮। ধুঁকতে থাকা রোহিত শেষ পর্যন্ত ২৭ রান করে আউট হন ২৮ বলে। দলের রান রেটের তখন বেহাল দশা। সময়ের আলোচিত ব্যাটসম্যান সূর্যকুমার যাদব উইকেটে গিয়ে চেষ্টা করেন গতি বাড়ানোর। বেন স্টোকসকে চার-ছক্কা মারেন তিনি টানা। তবে আদিল রশিদের স্পিনে ১৪ রানেই থামে তার অভিযান। ১০ ওভারে মোটে ৬২ রান তুলতে পারা ভারত লড়ার মতো পুঁজি পায় মূলত কোহলি ও পান্ডিয়ার জুটিতে। ৪০ বলে ৬১ রান যোগ করেন দুজন। ৪০ বলে ৫০ রানের ইনিংসের পথে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে কোহলি স্পর্শ করেন ৪ হাজার টি-টোয়েন্টি রান। ১৫ ওভার শেষে পান্ডিয়ার রান ছিল ১২ বলে ৯। পরে উত্তাল হয়ে ওঠে তার ব্যাট। শেষ ৫ ওভারে ভারত তোলে ৬২ রান। ততে পান্ডিয়া একই করেন ২১ বলে ৫৪! ভারতের আশাও তাতে জেগে ওঠে। কিন্তু বাটলার ও হেলসের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন! টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের মাস্টারক্লাস মেলে ধরে তারা বিধ্বস্ত করলেন ভারতকে। মোহাম্মদ শামিকে ছক্কায় উড়িয়ে যখন ম্যাচ শেষ করলেন বাটলার, শুধু দলের ফাইনালে ওঠাই নয়, সাড়ে ৭ বছরের এক হিসাবও চুকালেন তিনি। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে এই মাঠেই বাংলাদেশের কাছে হেরে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। ওই হারের পরই নিজেদের খেলার ধরন ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলে তারা ইংলিশ ক্রিকেটে বয়ে আনে সাফল্যের ¯্রােত। এবার দাপুটে এই জয়ে সেই দুঃস্বপ্ন মাটিচাপা দিয়ে বাটলারের দল আরেকবার মেলে ধরল ইংলিশ ক্রিকেটের নতুন দিনের বিজ্ঞাপন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত: ২০ ওভারে ১৬৮/৬ (রাহুল ৫, রোহিত ২৭, কোহলি ৫০, সূর্যকুমার ১৪, পান্ডিয়া ৬৩, পান্ত ৬, অশ্বিন ০*; স্টোকস ২-০-১৮-০, ওকস ৩-০-২৪-১, কারান ৪-০-৪২-০, রশিদ ৪-০-২০-১, লিভিংস্টোন ৩-০-২১-০, জর্ডান ৪-০-৪৩-৩)
ইংল্যান্ড: ১৬ ওভারে ১৭০/০ (বাটলার ৮০*, হেলস ৮৬*; ভুবনেশ্বর ২-০-২৫-০, আর্শদিপ ২-০-১৫-০, আকসার ৪-০-৩০-০, শামি ৩-০-৩৯-০, অশ্বিন ২-০-২৭-০, পান্ডিয়া ৩-০-৩৪-০)
ফল: ইংল্যান্ড ১০ উইকেটে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: অ্যালেক্স হেলস