বোরহান উদ্দীন : আধুনিক পুঁথির রচয়িতা

5
ইমদাদুল হক মামুন

শিক্ষক পরিবারের সন্তান। নিজেও কলেজ শিক্ষক। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বাউল গ্রামের অধিবাসী। উদ্ভিদবিদ্যায় রাজশাহী কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ছোট থেকেই লেখালেখির সঙ্গে সখ্যতা। কবিতা আর গল্পে তিনি স্বচ্ছন্দ। এখান থেকে পাড়ি দিয়ে উপন্যাসও রচনা করেছেন তিনি। ‘আরশীতে খোঁজো তোমাকে’, ‘বালির বাঁধ’, ‘তাল তমালের মেঠোপথ’, ‘এ-গাঁও ও-গাঁর বাঁকে’ তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। আর উপন্যাস ‘যুগের ¯্রােতে’।
কবি বোরহানের কবিতার মধ্যে আছে নাটকীয়তা। নাটকীয়তা বললে ভুল হবে, আছে নাটকের প্রচ্ছন্ন উপাদান। আবার অন্যভাবে দেখলে মনে হবে, উপন্যাসেরও উপাদান আছে এর মধ্যে। উপন্যাস বা নাটকে যেমন ঘটনা এগিয়ে চলে গল্পের ঢঙে ঢঙে, তেমনি তার কাব্যগ্রন্থ এ-গাঁও ও-গাঁর বাঁকের ঘটনাও এগিয়ে চলছে সেভাবে। কবিতার মধ্যে প্রথমেই চরিত্রের দেখা মেলে; সুরুজ মিয়া। উপন্যাসে যেভাবে দেখা যায়। তার চেহারার বর্ণনা দিয়ে শুরু। তারপর ধীরে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে তার জীবনের কাজকর্ম। একেবারে বরেন্দ্র তথা চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামীণ পরিবেশ, গ্রামীণ পরিবেশের মানুষগুলো, তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, তাদের ভাষা, তাদের আচরণ সবকিছু উঠে এসেছে এর মধ্যে। তবে এ-গাঁও ও-গাঁর বাঁকে কাব্যগ্রন্থে কবি মূলত গ্রামীণ অতীত পরিবেশকে বা বলা অতীতকেই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। শুধু ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন বললে একটু কমই বলা হয়, তিনি একেবারে অতীতকে এনে আধুনিক মানুষকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন।
সুরুজ মিয়া ঢেরাই দড়ি পাকাচ্ছে। তার নাতি ঢেরা চেনে না। কবি সুরুজ মিয়া হয়ে এ প্রজন্ম তথা সুরুজ মিয়ার নাতনি বা নাতিকে ঢেরা চিনিয়ে দিচ্ছে। তার নাতি মাকু চেনে না। সুরুজ মিয়া মাকু চিনিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সময়ে যে প্রাচীন এসব লোকজ যন্ত্র বর্তমানে পাওয়া যায় না, তা তার কবিতায় তিনি বলছেন,
“সুরুজ কহে, তোদের যুগে এ সব খুঁজে পাওয়া বড় দায়!
ভাগ্য ভাল দেখতে পেয়েছিস,
ছ’দশক থেকে সযতনে লুকিয়ে রেখেছি তাই।”

শুধু তিনি বলেই ক্ষান্ত হননি, এই লোকজ যন্ত্র কতদিন আগে ব্যবহৃত হতো তাও তিনি বলেছেন। লোকজ ক্রীড়াগুলো যেগুলো আজ আর দেখা যায় না বা এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা খেলে না সেসব লোকজ ক্রীড়ার কথাও বলতে দেখা যায় সুরুজ মিয়ার কাছে। যেমন, ঘুড়ি উড়ানো, বউচি, গোল্লাছুট, কানামাছি প্রভৃতি খেলার কথা। বর্ষাকালে সে সময়ের মানুষের হাতে যখন কাজ থাকত না তখন বসে বসে মাছধরা জাল বুনত। সুরুজ মিয়া যেন সে কালের একজন প্রতিনিধি; যে ছন্দে ছন্দে সে সময়ের চিত্রকে কাছে টেনে এনেছেন।
আগের প্রজন্ম একসাথে বসে গল্প করত, মোড়লের দলিজায় বসে পুঁথি শুনত, হুকা টানত, বাইরে রিমঝিম বৃষ্টি হতো; কী এক অপূর্ব দৃশ্য। এ পরিবেশই যেন এক মহাকাব্য! সে মহাকাব্যে কবি বোরহান আমাদের নিয়ে গেছেন অপূর্ব কাব্যশীলতায়!
কবি বোরহান উদ্দীনের এ-গাঁও ও-গাঁর বাঁকে কাব্যগ্রন্থটি পড়তে গেলে আরেকবার মনে হয়, এ যেন সোনাভানের পুঁথির মতো সুরুজ মিয়ার পুঁথি। আর তাতে রয়েছে শিমুল-নুরির প্রেম। পুঁথির উপাদানও এর মধ্যে পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হচ্ছে, আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে তিনি ধারাবাহিকভাবে কবিতার ছন্দে তুলে এনেছেন। বলা যায়, আধুনিক যুগে এ ধরনের কাজ সাধারণত দেখা যায় না। সে ক্ষেত্রে কবি বোরহান উদ্দীনের এ-গাঁও ও-গাঁর বাঁকে কাব্যগ্রন্থটি ব্যতিক্রম।
এখানে দেখা গেছে, আগের সময়ে কোনো ধরনের সার প্রয়োগ ছাড়াই নদী-খাল-বিল বা পুকুরের মাছ পাওয়া যেত। সেসব মাছের যে স্বাদ ছিল তা এখন অনুপস্থিত। কাহিনীর শ্রোতা শিমুল আর নুরিকে এসব শোনাচ্ছে কথক সুরুজ মিয়া। সে সময় মাঠজুড়ে ফসল থাকত, বাহারি রকমের ফসল। আবার যান বলতে গরুর গাড়িই ছিল সে সময়ের একমাত্র সম্বল। গাড়িতে করে গোটা গ্রামজুড়ে হাটে যাওয়া। গাড়িগুলোর মধ্যে আবার প্রতিযোগিতাও হতো। যে জিততে পারত, তার জন্য থাকত রুই মাছের মুড়ো। চাষাবাদেও একে অন্যকে সাহায্য করত বিনা দ্বিধায়। অভাবীকেও শর্ত ছাড়াই দিত পয়সাকড়ি আর খাবার। হাট শেষে ফিরে আসার মধ্যেও ছিল প্রাণবন্ত এবং দিলখোলা আনন্দঘন মুহূর্ত। গ্রামের মেয়েদের নকশিকাঁথা সেলাই। তারই অজুহাতে একসাথে বসে গ্রামের যুবতী থেকে শুরু করে বৃদ্ধারাও একসাথে বসে গল্পে মজে ওঠে। গ্রামের ছোটখাটো বিষয়ও কবি এড়িয়ে যাননি তার কাব্যগ্রন্থে।
লোকপ্রযুক্তি একসময় গ্রামে খুবই ব্যবহার হতো। নকশি শিকা গ্রামের খাবারকে বিড়াল আর ইঁদুর থেকে রক্ষা করত, সে কথাও উঠে এসেছে এ পুঁথিকাব্যে। গ্রামের মেয়েরা একসাথে বসে কেউ কাঁথা আর কেউ শিকা তৈরি করত। এ সময় বসে বসে নিজের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সুখ-দুঃখের কাহিনী শেয়ার করত একে অন্যের সাথে। একে অন্যের সুখ-দুঃখের সাথীও হতো তারা। গ্রামের মেয়েদের প্রায়ই কম বয়সে বিয়ে হয়ে যেত; সে অভিজ্ঞতাও তারা শেয়ার করত। তারা শুধু নকশিকাঁথা সেলাই করার সময় না, ধান ভানার সময়ও তারা যে গল্পে মেতে উঠত আর সে সময়টাও যে তারা উপভোগ করত তাও উঠে এসেছে লেখকের লেখায়।
প্রাচীন লোকপ্রযুক্তির অন্যতম একটা ধান ভাঙ্গানোর যন্ত্র- ঢেঁকি। এটা এ সময় দেখার কোনো সুযোগই নাই। কিন্তু কবির চোখে যেন এ প্রজন্ম দেখল সেই প্রাচীন মেয়েদের পরিশ্রমে তিল তিল করে ধানকে চাল করার দৃশ্য! এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, সে সময়ের সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা আলকাপ আর যাত্রাপালার কথা যেমন বোরহান উদ্দীনের পুঁথিতে উঠে এসেছে, ঠিক তেমনি এসেছে সে সময়ের পল্লীগীতি আর ভাটিয়ালির গানের কথা। এসেছে নগেন সরকারের কথা। সেই প্রাচীনকালের প্রেম যেন ভর করেছে শিমুল আর নুরির প্রেমের মধ্যে। মাঠে চাষরত কৃষকের কৃষানির প্রতি টান; খাবার দেবার ছলে কৃষকের সাথে পুলক সাক্ষাৎ! হেমন্তের সোনালী ধান কাটা উৎসব, সাথে ফেরিওয়ালাদের আনাগোনাÑ সবকিছু যেন ছবির মতো ভেসে উঠেছে বোরহান উদ্দীনের পুঁথিকাব্যে।
আসলে মো. বোরহান উদ্দীনের এ-গাঁও ও-গাঁর বাঁকে কাব্যগ্রন্থটিকে একটি আধুনিক পুঁথিকাব্য বলা যায়। অবশ্য কাব্যোপন্যাসও বলা যায়। কারণ এর মধ্যে উভয় উপাদানই লক্ষ করা যায়। আধুনিক কবিতা যেখানে দুর্বোধ্যের জালে জাড়িয়ে আছে, সেদিক থেকে বোরহান উদ্দীনের এ কাব্যগ্রন্থটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। হয়তো এ সময়ে এসে এ ধরনের পুঁথিকাব্য রচনাকে অনেকে হাস্যকর মনে করবেন, কিন্তু তার এ ফরম একেবারে নতুন, এটা বলা যায়। আবার প্রাচীন সময়কে তিনি চমৎকারভাবে আধুনিককালে উপস্থাপন করেছেন, তাও একটা নতুন স্বাদ এনে দিয়েছে। এখানেই বোরহান উদ্দীনের সার্থকতা।

ড. ইমদাদুল হক মামুন : লেখক ও গবেষক এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের ইন্সট্রাক্টর