বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ

34

প্রদীপ্তি হোসেন

[গত শনিবারের শেষাংশ]

অনেক ঘোরাঘুরি হলো চট্টগ্রাম ও কাপ্তাই। এবার একটু অন্য কোথাও যাওয়া যাক। এবার যাব লাল মাটির দেশ রাঙ্গামাটিতে। শুরু রাঙ্গামাটি ভ্রমণ।
পাহাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ। গাড়ি একটু বাঁকালে ভয়ে যেন গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। পাহাড়ের যে নিচু নিচু জায়গাগুলো আছে, সেখানে অনেক রাবারের গাছ আছে। এই গাছের রস দিয়ে রাবার বানানো হয়। আবার পাহাড়ের গা কেটে করা আছে সিঁড়ি। আর উপরের বাড়ি কী আকর্ষণীয়! গাড়ির জানালা দিয়ে দেখছি দূরের অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়।
গাড়ি থেকে নামলাম রাঙ্গামাটি ক্যান্টনমেন্টের সামনে। আমরা সেই ক্যান্টনমেন্টেই উঠলাম। আমরা যার বাসায় থাকব, তিনি আমার নানুর সাথে চাকরি করতেন। ক্যান্টনমেন্টের পাশেই একটা বড় করে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি রয়েছে। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করলাম। তারপর আমরা একটা সুইমিং পুলে যাই।
সুইমিং পুলটি সেনাবাহিনী পরিচালিত হলিডে পার্কে অবস্থিত। পাহাড় কেটে সুইমিং পুল বানানো হয়েছে। তার চারপাশে পানি। পুলটির দুটি ভাগ, একটা একটু গভীর আর আরেকটা গভীর না। বেশ মজাই লাগল গোসল করতে। আমার খালাতো ভাইকে তো নামানোই গেল না। সে নাকি ভয় পাচ্ছে। সেখান থেকে আমরা একটা মেলায় গেলাম। মেলায় ঘুরলাম। অনেক কিছু কিনলাম ও আচার খেলাম।
পরদিন সকালে আমরা বের হলাম অনেকগুলো জায়গা যাব তাই। যাওয়ার জন্য একটা ট্রলার ভাড়া নেয়া হলো। ট্রলারে সবাই উঠে বসলাম। কোন জায়গাগুলোতে যাব তা যেতে যেতে বলছি। ট্রলার চলতে লাগল কাপ্তাই লেকের ওপর দিয়ে। চারদিক দেখতে কি মনোরম। পাহাড়, পাহাড়ের ওপর গাছ আবার কোথাও কলার বাগান। কোনো জায়গায় দুটো ভাগ হয়ে গেছে। মধ্যখানে ট্রলার, পেছনে তাকালেও পানি সামনে তাকালেও পানি আর দুই পাশে পাহাড়। কথা বলতে বলতেই চলে এলাম একটা ঝর্নার সামনে। বড় বড় পাহাড় আর ঝমঝম করে পড়ছে পানি। কি সুন্দর দৃশ্য! দেখে যেন মন জুড়িয়ে যাই। বেশ কিছু ছোট পাথর পড়ে ছিল পানিতে। আমি একটা টিস্যুতে কয়েকটা পাথর উঠিয়ে নিলাম। পানির ওপর বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম, ছবি তুললাম। একটু সামনে আসতেই দেখলাম চাকমারা ডাব, বাতাবি লেবু, কলা এগুলো তারা তাদের এক ধরনের ঝুড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে। ঝুড়িটা পিঠে ঝোলানো এবং এর মাথার অংশে চ্যাপ্টা দড়ির মতো করে লাগানো। সেই অংশটা তাদের কপালের ওপর রয়েছে।
এবার আমরা আরেকটা ঝর্নার উদ্দেশ্যে চললাম। নাম তার সুবলং ঝর্না। সেখানে যেতে যেতে আমরা বুদ্ধবিহারে একটা বুদ্ধের বড় মূর্তি দেখি। আমাদের ট্রলারের পাশ দিয়ে একটি বিভিন্ন পাহাড়ি ফলের নৌকা গেল। ইতোমধ্যেই আমরা সুবলং ঝর্নার কাছে চলে এলাম। একটু দূর থেকেই পানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেখানে দুটো পাথর পড়ে আছে। ওগুলোর ওপর সবাই ছবি তুলছে। আমি ঝর্নার পানিতে আবার গোসল করলাম। আরো সবাই গোসল করছে। একটু পাহাড়ের গভীর দিকে বেশি পানি পড়ছে। সেখানে সবাই ঢোকার চেষ্টা করছে। আমিও একটু চেষ্টা করেছি।
গোসল করার পর আমরা পাশের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে চাকমা আদিবাসী বাজারে গেলাম। তাদের সামনে দোকান ও পেছনে বাড়ি। বাজারটা আমরা ঘুরে দেখলাম। একটা দোকানে আমরা তাদের বুনন করা গামছা কিনলাম। আমি একজন চাকমাকে বলে তাদের বাড়িতে ঢুকে দেখলাম। চাকমারা বাড়িঘর বেশ গুছিয়ে রাখে। তারপর আরেকটা দোকানে গিয়ে আমরা তাদের ঐতিহ্যের জামাকাপড় কিনি। পাশের দোকানে বড় বড় হ্যাট কিনে পাওয়া যাচ্ছে। যাদের দোকানে আমরা জামাকাপড় কিনলাম, ওদের বাড়িটাও দেখেছি। ওখানে আমাদের অনেক পিপাসা পায়। আর নৌকা থেকে আনা পানির বোতলের পানিও শেষ হয়েছে। তখন আমরা চাকমাদের দেয়া ছড়ার পানি খেয়ে পিপাসা মিটায়। বেশ কিছুটা সময় কাটে চাকমাদের সাথে।
আমরা সবাই তাদের ও ঝর্নাটিকে বিদায় জানিয়ে চললাম ঝুলন্ত ব্রিজের উদ্দেশ্যে। দেখতে দেখতে পৌঁছেও গেলাম ঝুলন্ত ব্রিজ। সেখানে গিয়ে দেখি একটা নৌকার পাশে অনেক ভিড়। সেখানে আসলে কী হচ্ছে? সেখানে গিয়ে আমরা দেখি পাহাড়ি আনারস কেটে বিক্রি করছে। নৌকাভর্তি আনারস আর আনারস। বিক্রেতাটি আনারস দিয়ে কোনো কুল পাচ্ছে না। আমরাও সেখানে কয়েকটা আনারস কিনলাম। কি মিষ্টিই না খেতে। আনারস ছাড়াও পাহাড়ের গায়ে কলা, ডাব, বাতাবিলেবুও হয়। আরো কত ফল ও সবজি হয় তা আমরা জানি না। ঝুলন্ত ব্রিজে দাঁড়িয়ে আমরা আনারস খেলাম। অবাক হয়ে আমরা ব্রিজটা দেখলাম। নদীর এ-প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত কাঠ দিয়ে বানানো হয়েছে ব্রিজটি। ব্রিজটিতে দুটি পিলার আছে। আমরা সেখানে ছোটাছুটি করলাম, ছবি তুললাম ও আনারস খেলাম। সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এলো। ঝুলন্ত ব্রিজকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম ক্যান্টনমেন্টে।
সেখানে আমরা তাদের ও রাঙ্গামাটিকে বিদায় দিয়ে ফিরে এলাম খালামনির বাসায় চট্টগ্রামের হালিশহরে। তার পরের দিন আমরা কোথাও যাইনি। পরদিন সকালে বের হলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। আমি তো অনেক উত্তেজিত। আব্বু ও আংকেল টিকেট নিল। আমরা সবাই গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি চলতে লাগল। আমার মনে মনে ভীষণ আনন্দ লাগছিল। গাড়িতে বিভিন্ন ধরনের লোকজন ছিল। গাড়ির ড্রাইভার ও হেলপারটি ছিল চট্টগ্রামের অধিবাসী। দীর্ঘক্ষণের যাত্রায় তারা দুজনেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অনর্গল কথা বলছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দীর্ঘক্ষণের পথযাত্রায় ড্রাইভার ও হেলপারের কোনো কথায় আমরা বুঝতে পারিনি। এরকম করতে করতে আমরা কক্সবাজারের মূল শহরে নামলাম। আব্বু হোটেল ঠিক করল। আমরা সেখানে উঠলাম।
গোসল করে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবারের পর আমরা গেলাম সমুদ্র দেখতে। আমরা রাস্তায় যেতে যেতে একটি ঝর্না দেখতে পেলাম। ঝর্নাটির নাম হিমছড়ি। আমরা অটোরিকশাটিকে সেখানেই দাঁড় করালাম। ঝর্নাটি খুব চিকন, কিন্তু বেশ উঁচু। সেই উঁচু থেকে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। সেথানে দাঁড়িয়ে আমরা ছবি তুললাম। এরপর আমরা চলে গেলাম সি বিচে।
সি বিচে নামতেই দেখি অনেক মানুষের ভিড়। বাচ্চা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ। চোখ মেলে দেখি বিশাল সমুদ্র। আমি যেমন দৃষ্টিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম সমুদ্রের দিকে। সমুদ্রের সামনে অদূরে দেখা যাচ্ছে টকটকে লাল সূর্য। যখন আমরা বিচে গেলাম, তখন ছিল সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত। সূর্যটি আসতে আসতে ডুবে গেল। যখন সূর্যটা ডুবে গেল ঠিক, তখন মনে হলো এই বুঝি সূর্যটা ঝপাৎ করে সমুদ্রে পড়ে গেল। সেখানে আমরা ছবি তুললাম। ছোটাছুটি করলাম। বালিতে পড়ে থাকা শামুক কুড়ালাম। সন্ধ্যা হয়ে গেল। সেখান থেকে আমরা বাজারে গেলাম। সেখানে বিভিন্ন মনোহরী ও জামাকাপড় কিনলাম। তারপর আমরা আবার সমুদ্রের ধারে গেলাম। নির্জন রাত হলেও সেখানে অনেক ভিড়। এত ভিড় ও কোলাহলের মধ্যেও সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। এই গর্জন শুনে মনে যেমন ভালো লাগছে, আবার বেশ ভয়ও করছে। রাতের খাবারের পর আমরা হোটেলে ফিরলাম।
সারাদিন আমরা যে মনোরম দৃশ্য উপভোগ করলাম তা নিয়ে গল্প করলাম। খুব সকালেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি হোটেলের বেলকনিতে দাঁড়াতেই সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেলাম। একটা শীতল হাওয়া আমার গায়ে এসে লাগল। মনে হলো আমার গায়ে গলে মন ভরিয়ে দিল। আমরা ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা খেলাম। তারপর ছুটে গেলাম সমুদ্রের তীরে। তখন সকাল আটটা। পরিবেশটা সুন্দর ও শান্ত। পাশেই যে দোকানগুলো বসেছে আমরা সেখানে গেলাম। দেখলাম কত কিছু সুন্দর সুন্দর জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। আমরা সেখানে বিভন্ন ধরনের শামুক ও ঝিনুকের মালা, খোপা, চুড়ি, কানের দুল আমাদের ও আত্মীয়স্বজনদের উপহার দেয়ার জন্য কিনলাম।
তাছাড়া আমরা সেখানে স্যান্ডেল, শামুকের গায়ে নাম খোদাই করা চাবির রিং আচার ও চকলেট কিনলাম। আব্বু আমাকে চাকমাদের একটি ছাতা কিনে দিল। আমি সেখান থেকে লাল ছাতাটা নিলাম। কেনকাটা করতে করতে প্রায় ১১টা বেজে গেল। আমরা তখন সমুদ্রের ধারে অনেক মানুষের ভিড় দেখতে পেলাম। সকলে গোসল করছে সমুদ্রে। কেউ বা স্পিডবোটে উঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কত মজাই না করছে। আমরা বেশ কিছু জিনিস কিনেছি। এর জন্য আমরা বেড ভাড়া করলাম। সেখানে জিনিসগুলোসহ আমার নানি ওখানে বসে থাকল। আমরা নামলাম সমুদ্রে। কিন্তু আমরা খালাতো ভাই, সে তো নামলই না। আমি ও আমার আম্মু-আব্বু আমরা তিনজনে হাঁটু পর্যন্ত পানিতে যাই। আর যেতেই একটা বড় ঢেউ আসে এবং সেই পানিতে আমি ছিটকে পড়ে যাই। এটা আমার রোমাঞ্চ হয়ে থাকবে।
আমাদের বঙ্গোপসাগর অনেকটাই নিরাপদ। এজন্য সারা বিশ্বের বিভিন্ন পর্যটক আসে এই কক্সবাজারে। কারণ এখানে কোনো ভয়ঙ্কর প্রাণী নেই। আবার অপর দিকে সুন্দর ঢাল থাকায় ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা কম। এরপর আমি ভয়ে পানিতে আর নামতেই পারলাম না। দুপুর ১২টার পরে জোয়ার বাড়তে থাকে। এর জন্য আমরা হোটেলে চলে গেলাম। সবাই গোসল করে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া করলাম।
প্রস্তুতি নিলাম বাড়ি ফেরার জন্য। ছুটিও শেষ হয়ে এলো। দেখতে দেখতে কেটে গেল ১২টা দিন। স্বপ্নের মতো কেটে গেল দিনগুলো। বাড়ি ফিরে আসার পরও আমি বেশ কয়েকদিন শুধু ওই জায়গাগুলোরই স্বপ্ন দেখি ও সবার সাথে গল্প করি। বাংলাদেশ যে কত সুন্দর ও দর্শনীয় তা ভ্রমণের মাধ্যমে বোঝা যাবে।

প্রদীপ্তি হোসেন : শিক্ষার্থী, ৪র্থ শ্রেণি, নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ