বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ

54

প্রদীপ্তি হোসেন

পৃথিবীটা বিশাল কিন্তু আমরা একটা নির্দিষ্ট স্থানে জন্ম গ্রহণ করি। আমরা চারপাশের সীমিত পরিবেশ দেখেই অভ্যস্ত। বেড়ে ওঠার সাথে সাথেই আমরা মা-বাবার সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করতে যাই। কিন্তু আমাদের এই বাংলাদেশটা যে কতটা বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর সেটা আমরা না দেখলে ধারণাও করতে পারব না। সৌন্দর্য্য ও বৈচিত্র্য তো আছেই, তাছাড়াও ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান যেখানে গেলে মনে একটা স্বতঃস্ফূর্ত ভাব কাজ করে। সে জায়গাটা হতে পারে প্রাকৃতিক বা ঐতিহাসিক। প্রাকৃতিক স্থানে গেলে মন জুড়িয়ে যাবে এবং ঐতিহাসিক স্থানে গেলে স্মৃতির ভা-ার সমৃদ্ধ হবে।
তেমনই আমার দেখা তিনটি জেলার উল্লেখ করব। সেগুলো হলো- বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজার। যেমন চট্টগ্রামে গেলে সেখানের সমুদ্র, চিড়িয়াখানা, মিনি বাংলাদেশ, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র, মাছবাজার, ফয়েজ লেক ও কর্নফুলি নদী দেখা যাবে। আবার রাঙ্গামাটিতে গেলা দেখা যাবে কাপ্তাই লেক, সুবলং ঝর্না, সুবলং আদিবাসী বাজার, ঝুলন্ত ব্রিজ, বুদ্ধবিহার। আর কক্সবাজারে রয়েছে বিশাল সমুদ্র সৈকত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও বৈচিত্র্যময় চট্টগ্রাম দিয়েই শুরু করি। সকাল ৮টা নাগাদ আমরা চট্টগ্রামের হালিশহরে প্রবেশ করি। সেখানে আমার মেজ খালামনির বাসায় উঠি। সেখানেই থাকি। তারা হালিশহর ক্যান্টনমেন্টে থাকেন। সেদিন আমরা আর কোথাও যাইনি।
আমরা যখন ঘুরতে যাই তখন পূজার ছুটি। চট্টগ্রামে অনেক পূজা হয়। পরদিন বিকেলে আমরা সমুদ্র দেখতে গেলাম। ওখানে একটা পুকুর দেখলাম, সেখানে নাকি রানী রাসমনি গোসল করতেন। কিছু নৌকা দেখলাম, সেগুলো সমুদ্র থেকে দূরে। আসলে দুপুরে জোয়ারের সময় ওখান থেকে পানি থাকে তাই নৌকাগুলো ওখানে।
ফেরার সময় মাছবাজারে গেলাম। সেখানে যে নাম না জানা কত মাছ। যেমন- হাতুড়ি, গরু, পোয়া, ছুরি, রূপচাঁদা, ভেটকি, কোরাল, লইট্টা। আরো কত না মাছ। এগুলোর শুঁটকিও পাওয়া যায়। সামুদ্রিক মাছে প্রচুর আয়োডিন রয়েছে, যা শরীরের জন্য জরুরি। সামুদ্রিক লইট্টা মাছের শুঁটকি ভর্তা ও রূপচাঁদা মাছের দোপেঁয়াজা ভীষণ সুস্বাদু। খেতে পছন্দও করি।
পরদিন সকালে আমরা চিড়িয়াখানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। চিড়িয়াখানায় আমরা পৌঁছে গেছি, আব্বু টিকেট কাটছে ভেতরে ঢোকার জন্য। ও বাবা! ভেতরে ঢুকে দেখি কত পশুপাখি। জেব্রা, ঘোড়া, হরিণ, বানর, বনমহিষ, বাঘ, সিংহ আরো কত কি। অতসব কি আর মনে থাকে। সবগুলোর মধ্যে কুমির, শকুন, বনবিড়াল, শিয়াল, ঈগল ইত্যাদি মনে পড়ছে। আমরা দেখলাম মা বানর একটা চিপসের প্যাকেট নিয়ে দুটো বাচ্চা বানরকে দিল। আর বানর মা বানরের উকুন দেখে দিতে লাগল।
চিড়িয়াখানা দেখা আমাদের শেষ হলো। এবার মিনি বাংলাদেশে দেখার উদ্দেশ্যে গেলাম। সেখানে গেলে বাংলাদেশের পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেখানকার নির্মিত নিদর্শনগুলো দেখলে জ্ঞানভা-ার সমৃদ্ধ হবে। অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারা যায়। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে মনে যত প্রশ্ন, সবগুলোর উত্তর এখানে পাওয়া যাবে।
এবার ভেতরে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ল সংসদ ভবন। জাতীয় সংসদ ভবনের ডিজাইনার কে? তাঁর নাম হলো লুই আইকান। পাশে একটা বেশ উঁচু বিল্ডিং আছে। সেখানে আমরা টিকেট কেটে বিল্ডিংটির উপরে উঠলাম। চারদিকে কাচ আর আমরা লিফটে করে উঠছি। একটু তো ভয় হবেই। উপরে উঠে দেখি একটা হোটেল। আর তার উপরে দেখি চারপাশে শক্ত নেট দিয়ে ঘেরা। বিল্ডিংটা ২৪ তলার মতো উঁচু। সেখান থেকে সারা চিটাগাংটা দেখা যাচ্ছে। একদিকে সমুদ্র, একদিকে উঁচু বিল্ডিং আর আরেকদিকে সবুজে ঘেরা বনভূমি।
মিনি বাংলাদেশে আরো আছে- আহসান মঞ্জিল, বড়কুঠি, ছোটকুঠি, স্মৃতিসৌধ, সোনামসজিদ, কান্তজির মন্দির, ষাটগম্বুজ মসজিদ, লালকেল্লা, কার্জন হল ইত্যাদির মডেল। মূলত এই নিদর্শন বা প্রতিকৃতিগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত আছে। কিন্তু মিনি বাংলাদেশে এসব বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো মডেল হিসেবে নির্মিত রয়েছে। যাতে করে পুরো বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।
পর দিন সকালবেলা আবারো আমরা রওনা হলাম কাপ্তাই পানি বিদ্যুতের উদ্দেশ্যে। সেখানে আমার বাবার এক বন্ধু প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম সরকার চাকরি করতেন। তাঁর মাধ্যমে ভেতরে ঢুকলাম। বেশ ভালো লাগল। একদিকে কর্ণফুলি নদী, পাশে উঁচু উঁচু সব পাহাড় সবুজ গাছপালা আরো কত কী। একটা সেতুর ওপর গেলাম। সেতুর একপাশে বাঁধ দিয়ে পানি আটকানো আছে। আর একদিকে বিশাল কর্ণফুলি নদী। আরেক জায়গায় দেখলাম সৌরবিদ্যুৎ তৈরির কি যেন কাজ চলছে।
এরপর আব্বুর বন্ধু আমাদের আরেকটা জায়গায় নিয়ে গেল। সে জায়গাটা ছিল নৌবাহিনী পার্ক। সেখানে ঢুকতেই একটা উঁচুতে স্লিপার আর দোলনা আছে। পাশেই নৌবাহিনীর একটা বিশাল নৌকার প্রতিকৃতি। সেখানে উঠে আমরা সবাই ছবি তুললাম। এবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে তৈরি পানির উপরে বয়ে চলা ব্রিজ। ব্রিজের ওপর দিয়ে চলতে চলতে উপরে উঠলাম। দেখলাম পাহাড়। পাহাড়ের মধ্যে রয়েছে রাস্তা। ওঠার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। মাঝে মাঝে বসার জন্য ছাউনি। চারদিকে বিভিন্ন ফুল-ফলের গাছ-গাছালি। দেখতে কত সুন্দর। এরকম করে একপা দুপা করে হাঁটতে হাঁটতে একটা জায়গায় এসে দেখি পাহাড়ের পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে নদীর ওপর চরের মতো জেগে উঠেছে। গাছপালা হয়ে আছে আর পাশ দিয়ে একটা নৌকা চলছে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে পাঁয়ে হেঁটে সেখানে যাওয়া যাবে বা হাতেই পানিগুলো ধরা যাবে। কিছু রাস্তা বেশ সরু। আঁকাবাঁকা মেঠোপথের পাশে ফুটে আছে নানান রঙের ফুল। একদিক দিয়ে পাহাড়ে উঠলাম অন্যদিক দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে মূল স্থানে ফিরে এলাম। পার্কের পাশেই দেখছি পাহাড়ি বিভিন্ন ফল নিয়ে পাহাড়ি লোকেরা বিক্রি করছে। আমরা সেখানে পাহাড়ি কলা খেলাম ও আনারস কিনলাম। তারপর আমাদের সেখানের ভ্রমণ শেষ হলো।

বাকি অংশ পরে……..

প্রদীপ্তি হোসেন : শিক্ষার্থী, ৪র্থ শ্রেণি, নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ